পাওনা না পেলে বিপিএল নয়

আপডেট : ২৩ এপ্রিল ২০১৪, ২২:০৪
ঢাকা লিগের মৌসুম হারানোতে হতাশ ক্রিকেটাররা দেবব্রত পালও এই কথাটার পুনরাবৃত্তি করে বললেন, ‘একদিকে বলা হচ্ছে, জাতীয় দলে যে সব জায়গায় দুর্বলতা আছে, সে সব জায়গায় পারফরমারদের আনা হবে। এখন লিগ না হলে আপনি পারফরমার পাবেন কোথায়? আর জাতীয় দলের খেলোয়াড়দেরই সেরাটা পেতে গেলে, তাদেরও তো আপনাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে রাখতে হবে। একটা মৌসুম কম খেলা হলে, সেই লড়াইয়ের উত্তাপটাও কী কমে যায় না?’ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড মনে করতে পারে যে, মৌসুম বলে ক্রিকেটে কিছু নেই। কিন্তু ক্রিকেটাররা বোঝেন, এই কথার অর্থটা কী, যন্ত্রণা কী। এই কথা বলে আসলে যে ২০১২-১৩ মৌসুমের ঢাকা প্রিমিয়ার লিগটাকে গায়েবই করে দেয়া হচ্ছে, সেটা বুঝতে আর কারো বাকি নেই। আর এই গায়েব হওয়া নিয়েই দারুণ হতাশা প্রকাশ করছেন ক্রিকেটাররা। দেশের সিনিয়র ক্রিকেটাররা বলছেন, এর ফলে আর্থিকভাবে সব ক্রিকেটার যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হলেন, তেমনই দেশের ক্রিকেটও দারুণ ক্ষতিগ্রস্ত হলো। তবে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে দেখা গেল, ক্রিকেটারদের এই হতাশার চেয়েও বেশি ক্ষোভ বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) নিয়ে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) নিজেই বিপিএলের দ্বিতীয় আসরে খেলোয়াড়দের পাওনার জামিনদার হয়েছিল। কিন্তু সেই দ্বিতীয় বিপিএল শেষ হওয়ার ১৬ মাস পার হয়ে যাওয়ার পরও খেলোয়াড়রা পুরো পাওনা না পাওয়ায় তাদের ক্ষোভ ও হতাশার শেষ নেই। এই হতাশা থেকে দেশের ক্রিকেটারদের সংগঠন ‘কোয়াব’ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, গত আসরের পাওনা না পেলে তৃতীয় আসরে দেশের কোনো ক্রিকেটার অংশ নেবেন না। তেমনটাই অন্তত জানালেন কোয়াবের সাধারণ সম্পাদক দেবব্রত পাল, ‘বিসিবি নিজেই জামিনদার হয়েছিল যে, ফ্রাঞ্চাইজিগুলো সময়মতো অর্থ পরিশোধ না করলে তারা পরিশোধ করে দেবে। সেটা হয়নি। এখনও অনেক খেলোয়াড় পুরো পাওনা পায়নি। আমরা কোয়াব থেকে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এই পুরো পাওনা পরিশোধ না করা হলে তৃতীয় আসরে আমাদের কোনো ক্রিকেটার অংশ নেবে না।’ বিপিএলের অর্থটা দেশের শীর্ষ ক্রিকেটারদের ক্ষোভের কারণ হলেও ঢাকা লিগের ব্যাপারটা তরুণ ও আলোর বাইরে থাকা ক্রিকেটারদের মূল দুশ্চিন্তার ব্যাপার। বোর্ডের চুক্তির বাইরের ক্রিকেটাররা মূলত বিপিএল বা অন্য কোনো উত্স থেকে আয়ের সুযোগ পান না। ফলে তাদের সারা বছরের আয়ের একমাত্র ভরসা থাকে এই ঢাকা লিগ। এই লিগকে মাথায় রেখে এইসব তরুণ ক্রিকেটার ধারদেনা করে হলেও টিকে থাকেন। আর এই ক্রিকেটারদেরই দারুণভাবে বঞ্চিত করছে একটি মৌসুম হারিয়ে ফেলার সিদ্ধান্তটি। মূলত এই সমস্যা শুরু হয়েছে ২০১৩ সালের মার্চ মাসের দিকে। ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ২০১২-১৩ মৌসুমের খেলা হওয়ার কথা ছিল তখনই। কিন্তু সেটা হয়নি নির্বাচন, ভেন্যু; নানা রকম অক্রিকেটীয় ব্যস্ততার কারণে। পরে পেছাতে পেছাতে ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে এসে ওই ২০১২-১৩ নাম দিয়েই লিগ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেও অর্থনৈতিকভাবে বড় ধাক্কার সামনে পড়েন ক্রিকেটাররা। এমনিতে ক্রিকেটারদের মেধা ও সম্ভাবনা অনুযায়ী দলগুলো মুক্ত ভাবে কিনে নেয়, এটাই রেওয়াজ ছিল। কিন্তু গতবার নিলামের আদলে ‘প্লেয়ার বাই চয়েস’ ব্যবস্থায় দলবদল হয়। ফলে সিংহভাগ খেলোয়াড় তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী টাকা পাননি। এই ধাক্কা সামাল দিতে তখনই সিসিডিএম বলেছিল, ২০১৪ সালে দুটি লিগ আয়োজন করে এইসব সংকট মেটানো হবে। সে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হচ্ছে না; বলাই বাহুল্য। ফলে জাতীয় চুক্তির বাইরে থাকা ক্রিকেটারদের জীবন-জীবিকায় প্রভাব পড়ছে, তাতে আর সন্দেহ নেই। এই প্রসঙ্গে জাতীয় দলের সাবেক তারকা ও দেশের সিনিয়র ক্রিকেটার তুষার ইমরান বলছিলেন, ‘এখন বোর্ডে বেশ কয়েক জন সাবেক ক্রিকেটার আছেন। তারা নিজেরাই জানেন যে, এই ঢাকা লিগের আয়ের ওপর ক্রিকেটাররা কতোটা নির্ভরশীল। তারা যখন খেলেছেন, তখন তো এই লিগ ছাড়া বাড়তি কোনো আয় ছিল না। ফলে তারা এই সমস্যাটা বুঝতে পারছেন; এটুকুই বলবো। আমরা আশা করেছিলাম, আমাদের এই সিনিয়ররা অন্তত ক্রিকেটারদের দিকটা দেখবেন।’ তবে তুষার বলছেন, টাকার চেয়ে ক্রিকেটীয় ক্ষতিটাও কম হয়নি। তিনি ব্যাখ্যা করেই বললেন, ‘দেখুন, আমাদের যারা উঠতি ক্রিকেটার বা যারা ফেরার লড়াইয়ে আছেন, তাদের এই প্রিমিয়ার লিগ ছাড়া কোথাও নিজেদের প্রমাণের সুযোগ নেই। এখন সূচি থেকে নির্ধারিত একটা লিগ যদি না হয়, তাহলে তো সেই প্রমাণের সুযোগটা, লড়াইয়ের সুযোগটাই কমিয়ে দেয়া হলো।’ দেবব্রত পালও এই কথাটার পুনরাবৃত্তি করে বললেন, ‘একদিকে বলা হচ্ছে, জাতীয় দলে যে সব জায়গায় দুর্বলতা আছে, সে সব জায়গায় পারফরমারদের আনা হবে। এখন লিগ না হলে আপনি পারফরমার পাবেন কোথায়? আর জাতীয় দলের খেলোয়াড়দেরই সেরাটা পেতে গেলে, তাদেরও তো আপনাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে রাখতে হবে। একটা মৌসুম কম খেলা হলে, সেই লড়াইয়ের উত্তাপটাও কী কমে যায় না?’ দেবব্রত, তুষারদের প্রতিটা কথায় একমত না হয়ে উপায় নেই। কিন্তু সমস্যা হলো, এখন বোর্ডে যারা আছেন, সেই সব সাবেক ক্রিকেটার বা দেশসেরা কর্মকর্তারাও তো এসব বোঝেন। যারা সব বোঝেন, তাদের বোঝাবেন কি করে?