বাংলাদেশজুড়েই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অসংখ্য প্রাকৃতিক আর মনুষ্যনির্মিত দর্শনীয় স্থান। মূলত এই স্থানগুলোর কথা মাথায় রেখেই প্রতি শুক্রবারের আয়োজনে থাকছে একটি করে দর্শনীয় স্থানের বিবরণ। আর আজ এতে প্রকাশিত হলো চাঁপাইনবাবগঞ্জের দিনাজপুরের রামসাগর জাতীয় উদ্যান-এর কথা।
রামসাগর জাতীয় উদ্যান বাংলাদেশের দিনাজপুর জেলার আউলিয়াপুর ইউনিয়নের তাজপুর গ্রামে অবস্থিত একটি জাতীয় উদ্যান। এটি দিনাজপুর সদর থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে রামসাগর দিঘিকে ঘিরে অবস্থিত। ১৯৬০ সালে রামসাগর বাংলাদেশের বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে আনা হয় এবং ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল এটিকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। রামসাগর উদ্যানের প্রধান আকর্ষণ হলো বিশাল রামসাগর দিঘি। দীঘিটি উত্তর দক্ষিণ লম্বা এবং এর জলভাগের দৈর্ঘ্য ১০৩১ মিটার, প্রস্থ ৩৬৪ মিটার ও গভীরতা ৯ মিটার। দক্ষিণ দিকের চেয়ে উত্তর দিকের গভীরতা বেশি। দীঘির প্রধান পাকা ঘাট পশ্চিম পাড়ের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত এবং ঘাটটির দৈর্ঘ্য ১৫০ ফুট ও প্রস্থ ৬০ ফুট। এ ছাড়া উত্তর ও দক্ষিণ দিকেও তুলনামূলক ছোট দু’টি ঘাট রয়েছে। এই দীঘিটি ঠিক কবে বা কীভাবে খনন করা হয়েছিল তা নিয়ে প্রচলিত আছে নানা লোককথা। কথিত আছে, ১৭৫০ খ্রিস্টাব্দে প্রচণ্ড এক খরা দেখা দিলে পানির অভাবে মৃতপ্রায় প্রজাদের বাঁচাতে দয়ালু রাজা প্রাণনাথ স্বপ্নে আদেশ পেয়ে একটি পুকুর খনন করেন। কিন্তু সেই পুকুর থেকে পানি না ওঠায় একসময় রাজা স্বপ্নে দৈববাণী পেলেন যে, তার একমাত্র ছেলে রামকে দীঘিতে বলি দিলে পানি উঠবে। স্বপ্নাদিষ্ট রাজা, দীঘির মাঝখানে একটি ছোট মন্দির নির্মাণ করেন। তারপর এক ভোরে যুবরাজ রামনাথকে নিয়ে হাতির পিঠে চড়ে যাত্রা শুরু করলেন সেই দীঘির দিকে। দীঘির পাড়ে পৌঁছে যুবরাজ রাম সিঁড়ি ধরে নেমে গেলেন মন্দিরে। সঙ্গে সঙ্গে দীঘির তলা থেকে অঝোর ধারায় পানি উঠতে লাগল। চোখের পলকে যুবরাজ রামনাথসহ পানিতে ভরে গেল বিশাল দীঘি। এ ছাড়া ঐতিহাসিকদের গবেষণায়প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী রাজা রামনাথ পলাশীর যুদ্ধের আগে (১৭৫০-১৭৫৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে) এই রামসাগর দিঘি খনন করেছিলেন এবং তারই নামে দীঘিটির নাম রাখা হয় রামসাগর। এ ছাড়া দিঘিটি খনন করতে সে সময়ের হিসেবে প্রায় ৩০,০০০ টাকা ও ১৫,০০,০০০ শ্রমিকের প্রয়োজন হয়েছিল বলেও জানা যায়। এক সময় এই দীঘির চারদিকে বেশ কয়েকটি উঁচু টিলা ছিল বলে জানা গেলেও বর্তমানে শুধুমাত্র উত্তর-পূর্ব কোণের একটি উঁচু পাহাড়ই চোখে পড়ে। এ ছাড়া বর্তমানে দীঘিকে ঘিরে থাকা এই জাতীয় উদ্যানে হাঁটার জন্য ইট বিছানো পথ ও দীঘির পাশে বসার জায়গা ছাড়াও রয়েছে বেশ কয়েকটি পিকনিক স্পট ও একটি ছোট চিড়িয়াখানা।
