শ্যামলছায়ায় ঢাকা গ্রামের কাঁচা রাস্তার পাশে ছোট্ট একটি টিনশেড ঘর। এ্যাঙ্গেলের খুঁটিতে ঘরের সামনে টাঙানো সাইনবোর্ড। টিনশেড ও চারপাশে টিনের বেড়ায় ঘেরা ঘরটির ভেতরে কোন জ্ঞানপিপাসু ঢুকলে অবাক না হয়ে উপায় নেই। লাইব্রেরিতে গিয়ে দেখা যায় ঘরভর্তি পাঠক, অথচ পিনপতন নীরবতা। লম্বা টেবিলে সারিবদ্ধভাবে বসে বই পড়ছেন বেশ কয়জন। কেউবা চোখ বুলিয়ে নিচ্ছেন দৈনিক পত্রিকার পাতায়। এ দৃশ্য মাতৃভাষা পাবলিক লাইব্রেরির। বইয়ে ঠাসা বেশ কয়েকটি আলমারি। আলমারির অভাবে দেখলাম অনেক বই বস্তাবন্দি ও টেবিলের ওপর গাদা করা। বর্তমান ঘরের যে অবস্থা একটু কালবৈখাশী ঝড় হলেই দুর্লভ সংগ্রহ নষ্ট হয়ে যাবে আর লণ্ডভণ্ড হবে টুটুলের স্বপ্ন।
উদ্যমী তরুণ এম. কে. টুটুুলের একক প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে এই লাইব্রেরি। অজপাড়া গাঁয়ের মানুষ এখন লাইব্রেরির কল্যাণে বই পড়তে পারেন। চোখ বুলাতে পারেন অনেকগুলো দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকায়। কথা প্রসঙ্গে তিনি জানান, বায়ান্ন তার চেতনা, একাত্তর তার প্রেরণা। মা মানুষ মুক্তিযুদ্ধ তার প্রিয়। তাই তো তার প্রতিষ্ঠিত লাইব্রেরির নাম রেখেছেন মাতৃভাষা পাবলিক লাইব্রেরি। স্বল্প পরিসরে হলেও সেখানে আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে লাইব্রেরিটি। ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার অজপাড়াগাঁ কালুহুদায় ২০০১ সালে এম. কে. টুটুল নামের মুক্তমনের অধিকারী, পরোপকারী ও সমাজ সচেতন তরুণের নিরলস প্রচেষ্টায় আধুনিক সুযোগবঞ্চিত এমন নিভৃত পল্লীতে গড়ে তোলেন লাইব্রেরিটি। মাতৃভাষা পাবলিক লাইব্রেরি বদলে দিয়েছে এসব এলাকার শিক্ষা, কৃষি ও সামাজিক পরিবেশ। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তক ও ফরম পূরণের অর্থ সরবরাহ ও জামানত কিংবা চাঁদা ছাড়া এ লাইব্রেরিতে বই ও পত্রিকা পড়ার সুযোগ সবার জন্য উন্মুক্ত।
এলাকার সবার মধ্যে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার পাশাপাশি লাইব্রেরির উদ্যোগে নিয়মিত গরীব মানুষের বসতবাড়িতে বৃক্ষরোপণ, জাতীয় দিবস পালন, কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছে। এছাড়াও গণসচেতনতা সৃষ্টি করতে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টের মাধ্যমে বাল্যবিবাহ, মাদক, যৌতুক, ইভটিজিংয়ের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানো হয়। আর এ কাজকে আরো গতিশীল করতে সম্প্রতি লাইব্রেরিতে কেনা হয়েছে একটি হ্যান্ডমাইক। এসব কারণে কালুহুদাসহ আশ-পাশের সব গ্রামের জ্ঞানপিপাসু মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ব্যতিক্রমী এ লাইব্রেরির কার্যক্রম।
লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠাতা এম. কে. টুটুল বলেন, মামা শহীদ সাংবাদিক শামছুর রহমান কেবলের লেখা ‘ধূসর সীমান্ত’সহ মাত্র ৫০টি বই নিয়ে লাইব্রেরির যাত্রা শুরু করি। এখন বইয়ের সংখ্যা ৩ হাজার ৭৫০।
