পঁচিশে মার্চ রাতে ঢাকার ফকিরাপুল থেকে নানান ঝক্কিঝামেলার পরে ১১টা ১৫ মিনিটের গাড়ি ছেড়েছে রাত ১টা ৩০ মিনিটে, তার উপর আবার ডাবলিং টিকেটের যন্ত্রণা। সিটে বসা নিয়ে যাত্রীদের মাঝে হুলস্থূল বেঁধে গেল। কাচপুর গিয়ে গাড়ি পুরোই ব্রেক। পরিস্থিতি অনুমান করে বুঝতে পারলাম সারা রাতও ঘটনার কুলকিনারা হবে না, বরং ত্রিমুখী সংঘর্ষ হওয়ার বিপুল আশঙ্কা রয়েছে। অবশেষে দে-ছুটের কারিশমায় বিক্ষুব্ধ এক পরিবেশ থেকে যাত্রীদের মাঝে আনন্দঘন ও সৌহার্দপূর্ণ অবস্থা তৈরি হলো। একসময় মনে হলো পুরো বাসের যাত্রীরাই দে-ছুটের পরিবারের সদস্য। পরের দিন বেলা ১২টা ২৫ মিনিটে বান্দরবান পৌঁছাই। জোহরের নামাজ আদায় করেই চান্দের গাড়িতে চড়ে ছুটি রুমার উদ্দেশ্যে, সেখানে পৌঁছে দুপুরের আহার সারতে বিকাল হয়ে এলো। ফলে ওইদিন রুমাতেই রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নিই। তাই বিকেলটা সাঙ্গু নদীতে ইঞ্জিন নৌকায় চেপে ছুটলাম রিজুক জলপ্রপাতের পথে। সাঙ্গুর দু’কূলের দৃশ্য দেখে আটচল্লিশটি বসন্ত পার করে আসা সাইফুল ভাই যেন সতের বছরের দুরন্ত কিশোর হয়ে গেলেন! প্রপাতের পাশে বেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে আলো-আঁধারিতে ফিরে এলাম রুমা বাজারে। পরের দিন দুর্গম পথ পারি দিয়ে যেতে হবে বগালেকের প্রান্তরে, তাই গাইডকে নিয়ে প্রয়োজনীয় রসদ কিনলাম। রাতের খাবার শেষে সোজা রিসোর্টে।
সবাই সকাল সকাল প্রস্তুত। কিন্তু জসিম ও কচি ভাই ১৭ কিমি হাঁটতে হবে জেনে শারীরিক অসুস্থতার ভান করে বেঁকে বসল। এক জনের হার্ট, আরেক জনের লিভার। আমি ওদের কাহিনী বুঝতে পেরেও না বুঝার ভান করে তাল মিলিয়ে বললাম, ঠিক আছে তোমরা গাড়িতেই যাও। হঠাত্ কচি ভাই কী যেন ভেবে হেঁটেই যেতে রাজি হলো। আর টাইগার জসিম এবার নতুন বাহানা তুলে বিড়ালের মতো লেজ গুটিয়ে ঢাকার পথে রওয়ানা হলো। আর্মি ক্যাম্পে নাম, ঠিকানা, এন্ট্রি করে দুর্গম ঝিরিপথে হাইকিং শুরু। অরণ্য আর অগণিত ঝিরি মাড়িয়ে দুর্বার গতিতে ছুটে চলছি। কয়েক মাস পূর্বে দেহের ওজন ছিল ৯৯ কেজি, ডায়েট করার পর এখন হয়েছে ১০৩ কেজি—তাতে কি! সঙ্গে আছে মোতাহের। চারপাশে পাহাড় আর ঘন অরণ্য, তার মাঝ দিয়ে দে-ছুট দল মনের আনন্দে হেঁটে চলেছে। দেহ মনে কোনো ক্লান্তি আসেনি, আসেনি কোনো ভাবনা। অথচ ঢাকায় মাত্র কয়েক গজ হাঁটলেই ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা, আর সেখানে চৈত্রের ভর দুপুরেও মাইলের পর মাইল হাইকিং করে চলেছে। নৈঃশব্দের গভীর অরণ্যের পথে হেঁটে চলা কতটা যে রোমাঞ্চকর অনুভূতির তা শুধু অনুভবই করা যাবে। দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় একসময় মনে হবে নাম না জানা সুর তুলে ডেকে যাওয়া বনের পাখিও দে-ছুট দে-ছুট স্লোগান দিচ্ছে। প্রায় চার ঘণ্টা হাঁটার পর প্রকৃতির এক অদ্ভুত সৃষ্টি আবিষ্কার করি। রুমা খালের পাশে উঁচু টিলা এমন সুন্দরভাবে আপন মহিমায় সেজেগুজে আছে যা কি না উন্নত বিশ্বের পর্যটন মন্ত্রণালয়ের বানানো পর্যটন-শৈলীকেও হার মানায়। অথচ আমরা প্রকৃতির দানকে রেখেছি অবহেলায়। সর্বসম্মতি ক্রমে জায়গাটির নাম দিয়ে দিলাম ‘দে-ছুট-ডেন্স-পয়েন্ট’! বেশ কিছুক্ষণ সময় নেচে ও শীতল জলে দাপাদাপি, লাফালাফি করে আবারও হাঁটা শুরু, এবারের পথটা যেন আরও রোমাঞ্চকর, আরও বেশি হূদয়ে গেঁথে থাকার মতো অনুভূতির। দু’ পাশের পাহাড় খাড়া হয়ে যেন দিগন্তের সঙ্গে দোস্তি পেতেছে। বিশাল আকৃতির গাছগুলো যেন প্রহরী হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। চারপাশে অজস্র ছড়িয়ে থাকা পাথরের মধ্যে বেশ কিছু পাথরের আকৃতি অদ্ভুত। দেখলে মনে হবে মানুষরূপী হায়েনাদের কবল থেকে বাঁচার জন্য বড় পাথরের মাঝে ছোট্ট পাথরটি লুকাতে চাচ্ছে। সত্যিই সৃষ্টিকর্তার অপার রহস্য।
পায়ের নিচে বড় বড় পাথর আর মাথার উপর চান্দি ফাটা রোদের তাপ, কিন্তু কেন যেন শীতের সকালের সোনা মাখা রোদের মতোই লেগেছে। একটা সময় পথের মায়ায় মনে চেয়েছিল হারিয়ে যাই অজানায়! কিন্তু পেটের তাড়নায় তা আর হলো না। পাহাড়ের কূলঘেষা উম্বং পাড়া ম. ইউ কারবারির ঘরে নুডলস খেয়ে আপাতত ক্ষুধা মিটালাম। এরই মাঝে উপস্থিত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকজনের সাথে কিঞ্চিত ভাব জমিয়ে কিছু তথ্য জেনে নিয়েছি। সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আবারও বন্ধুর পথে ছুটে চলা। প্রায় সাড়ে আট ঘণ্টা হাঁটার পর পড়ন্ত বিকেলে নারিশ্বা ঝরনা মুখে এসে থামি। কি অদ্ভুত! কত সুন্দর তার রূপ। খড়ায় চৌচির হয়ে যাওয়া মৌসুমেও রিমঝিম শব্দ তুলছে পানির অবিরাম ধারা। ঝরনা মুখে প্রাকৃতিকভাবেই বেসিন তৈরি হয়েছে। আহ্ পানি কি ঠাণ্ডা! সেই পানিতে অজু করতেই মনের মাঝে এক অপার্থিব শান্তি দোলা দিয়ে গেল।
যোগাযোগ :ঢাকার গাবতলী ও ফকিরাপুল থেকে বিভিন্ন পরিবহনে বাস সার্ভিসে বান্দরবান। ভাড়া নন এসি ৬২০ টাকা, এসি ৭৫০ টাকা। বান্দরবান শহর থেকে রুমা বাজার চাঁদের গাড়ি/বাস/জিপে যাওয়া যাবে বগালেক। ভাড়া ২০০ টাকা থেকে চার হাজার টাকা। রুমা বাজারে রাত কাটাতে চাইলে বিভিন্ন রিসোট/কটেজ/হোটেল ও বোর্ডিং আছে, ভাড়া ৫০ টাকা হতে ১২০০ টাকা পর্যন্ত। গাইড দিনপ্রতি ৫০০ টাকা নেবে। বগালেকে খাবার জনপ্রতি ১০০ টাকা থাকা মাথাপিছু ১২০ টাকা। ফেরার সময় বগালেক থেকে জিপে চাঁদের গাড়িতে ভাড়া নেবে তিন হাজার টাকা।
