প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশে গুপ্তহত্যা, গুম ও চোরাগোপ্তা হামলার জন্য বিএনপি যে দায়ী তাতে কোন সন্দেহ নেই। কারণ সম্প্রতি বিএনপির এক নেতা চোরাগোপ্তা আন্দোলনের হুমকি দিয়ে বলেছেন, চোরাগোপ্তা আন্দোলন করে নাকি সরকারের পতন ঘটাবেন। যাদের চুরি করার অভ্যাস, চোর চোর মন, যারা হত্যা ও চোরাগোপ্তা হামলার রাজনীতিতে বিশ্বাসী এবং হত্যা, ক্যু ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে তাদের ব্যাপারে দেশবাসীকে সজাগ ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
গত বৃহস্পতিবার বিকালে গাজীপুরের ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজ মাঠে জাতীয় শ্রমিক লীগ আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। বিএনপি নেত্রীকে অপরাজনীতির পথ পরিহার করে স্বাভাবিক রাজনীতি করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে অংশ না নিয়ে যে ভুল করেছেন তার খেসারত এদেশের জনগণ কেন দেবে? যাদের পরামর্শে আন্দোলন করেছেন, নির্বাচনে আসেননি সেই প্রভুর কাছে যান। শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া আমেরিকার কাছে চিঠি পাঠিয়েছিলেন জিএসপি সুবিধা বাতিল করার জন্য। তার চিঠিতেই জিএসপি সুবিধা বন্ধ হয়েছে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বানচাল করতে খালেদা জিয়া বিদেশিদের কাছে ধরনা দিয়েছিলেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী হাসতে হাসতে বলেন, ‘নালিশ করে বালিশ পায়, ভাঙা জুতার বাড়ি খায়। বিদেশিদের কাছ থেকে তিনি বালিশ পেয়েছেন। আর বাংলাদেশের জনগণ নির্বাচন করে ভাঙা জুতার বাড়ি দিয়েছেন।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি নেত্রী বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন না। উনি তো বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাননি। ওনার হূদয়ে কি আছে? ওনার হূদয়ে আছে, দেলে আছে পেয়ারে পাকিস্তান। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, কেউ খাবে, কেউ খাবে না তা হবে না। তিনি বলেন, কিছু জনগোষ্ঠী আরাম-আয়েশে গা ভাসিয়ে চলবে। আর বৃহত্ জনগোষ্ঠী না খেয়ে থাকবে। বাংলাদেশে এই বৈষম্য চলবে না। বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ এবং মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক করার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, গরীব বাবা-মায়ের সন্তানদের পড়াশোনার দায়িত্ব আমরা নিয়েছি। আওয়ামী লীগ সরকার নিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ যখন সরকার গঠন করে শ্রমজীবী মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়। বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়। কৃষকরা ১০ টাকায় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে পারেন। তিনি বলেন, তারা (বিএনপি) ক্ষমতায় আসার আগে বলেন, বন্ধ কলকারখানা চালু করবেন। কিন্তু করেন তার উল্টো। আদমজীর মতো বৃহত্ পাটকল বন্ধ করে দেন তারা। ক্ষমতায় এসে খুলনা, চট্টগ্রাম, সিরাজগঞ্জ ও গাজীপুরের বিভিন্ন কলকারখানা বন্ধ করে দেন। হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে বন্ধ কলকারখানা চালু করে। বিজেএমসির ২৩টি এবং বিটিএমসির আটটি বন্ধ কল-কারখানা চালু করা হয়েছে। শ্রমিকদের কল্যাণে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপির আমলে শ্রমিকরা ন্যায্য দাবি জানাতে গিয়ে গুলি খেয়েছেন। ১৭ জন শ্রমিককে হত্যা করা হয়েছে। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার হাতে রক্তের দাগ লেগে আছে।
লাখো শ্রমিকের অংশগ্রহণে জনসভাটি রীতিমতো জনসমুদ্রে রূপ নেয়। দুপুর দুইটার মধ্যেই ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজ মাঠ ও আশপাশের এলাকা লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। সকাল থেকেই হাজার হাজার মানুষ খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে জনসভাস্থলে আসতে থাকে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিকাল সাড়ে চারটার দিকে জনসভাস্থলে পৌঁছালে লাখ লাখ মানুষ হাত নেড়ে, শ্লোগান দিয়ে তাকে স্বাগত জানায়। প্রধানমন্ত্রীও হাত নেড়ে তাদের অভিবাদন গ্রহণ করেন।
শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ শ্রমিকদের সেবক। তার সরকার গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বাড়িয়েছে। চাকরির বয়সসীমা ৫৭ বছর থেকে ৬০ বছর বাড়িয়েছে। বিএনপি সরকারের আমলে একজন দিনমজুর যে টাকা কামাই করতেন তা দিয়ে এক কেজি চালও ক্রয় করা যেত না উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন একজন শ্রমিক যা আয় করেন তা দিয়ে ১২ কেজি চাল কিনতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা বাংলাদেশকে ২০২১ সালের মধ্যে উন্নত সমৃদ্ধ দেশ হিসাবে গড়ে তুলবো। ক্ষুধা দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আসুন, সবাই এক সাথে কাজ করি। পরাজিত শক্তি যাতে মানুষের ভাগ্য নিয়ে আর ছিনিমিনি খেলতে না পারে সে ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করি।
প্রধানমন্ত্রী গাজীপুরে শ্রমিকদের ডরমেটরি, আবাসন ব্যবস্থা, বস্তিবাসীদের জন্য ফ্ল্যাট তৈরি এবং গ্রামে ফিরতে আগ হী বস্তিবাসীদের পুনর্বাসনের ঘোষণা দেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে বাংলাদেশ জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস আর দুর্নীতির দেশ হিসাবে পরিচিত ছিল। সেই ভাবমূর্তি পরিবর্তন করে আজ বিশ্বে বাংলাদেশ একটা উন্নয়নের রোল মডেল, সম্ভাবনাময় দেশ, এগিয়ে যাওয়ার দেশ।
জাতীয় শ্রমিক লীগের সভাপতি মো. শুকুর মাহমুদের সভাপতিত্বে জনসভায় আরো বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আওয়ামী লীগের শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হাবিবুর রহমান সিরাজ, মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি, স্থানীয় সংসদ সদস্য জাহিদ আহসান, সিমিন হোসেন রিমি, গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজমত উল্লাহ খান প্রমুখ।
