বেড়ানো : ঝটিকা অভিযান

আপডেট : ০৫ মে ২০১৪, ১৯:৪৪
রকেট স্টিমারে ভ্রমণের প্রতিনিয়ত শখ ছিল আমার। অবশেষে চলে এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। বিশেষ কারণে দুই দিনের জন্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। ঠিক তার আগের দিন অস্ট্রিচ জাহাজের প্রধান ইঞ্জিন কর্মকর্তা লোকমান হোসেন আমার বিজনেস ফার্মে এসে হাজির। কথা প্রসঙ্গে ভদ্রলোক অফার করে ফেললেন আগামীকাল বেলা ৩টা ৩০ মিনিটে বাদামতলি থেকে জাহাজ ছাড়বে, চলুন ঘুরে আসবেন। মোক্ষম সময়ে উপযুক্ত প্রস্তাব হাতছাড়া করতে ইচ্ছে হলো না। রাতের মধ্যেই দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের একজনকে সঙ্গী করে নিলাম। পরের দিন সে যথাসময়ে এসে হাজির, আমিও সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটের মধ্যে সদরঘাট টার্মিনাল থেকে অস্ট্রিচ নামক জাহাজে চড়লাম। শৈশবের বহু স্মৃতি এই জাহাজকে ঘিরে। ফার্স্ট ক্লাস এসি কেবিন ৫নং আমাদের জন্য বুকিং করা হয়েছে। কেবিনের ডেকোরেশন বেশ চমত্কার। জাহাজ ছাড়ল ৬টা ৪০ মিনিটে। নির্ধারিত সময় থেকে দশ মিনিট লেট, পরে জানতে পেরেছি ১০ মিনিট দেরিতে ছাড়ার কারণের মহানায়ক আমি। খানিকটা অপরাধী মনে হয়েছে নিজেকে। রকেট স্টিমার হুইসেল ছেড়ে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে চাঁদপুর ঘাটের দিকে। আমি পুরোনো স্মৃতি হাতড়ে বেড়াই। মনে পড়ে শৈশবে ডুব সাঁতারে অংশ নেওয়া অনেক বন্ধুদের কথা। রাত্রের ডিনার শেষে ইঞ্জিন কর্মকর্তার কেবিনে গিয়ে বসলাম। বিভিন্ন আলাপচারিতার মধ্যে আমরা আমাদের ভ্রমণ সূচি ঠিক করে নিলাম। প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত ছিল অস্ট্রিচ জাহাজেই যাব, আবার এই জাহাজেই ফিরব। অর্থাত্ জাহাজেই সময় কাটাব। কিন্তু বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদ ও হযরত খানজাহান আলী (র.) মাজার সাথে যাওয়া বন্ধুর জিয়ারত করা হয়নি তাই সিদ্ধান্ত তড়িত্ গতিতে পাল্টালাম। উড়োজাহাজের চেয়ে লক্ষগুণ আরামদায়ক নৌ জাহাজে একটা ফ্রেশ ঘুম দিয়ে পরের দিন সকাল দশটায় হুলার হাট নেমে পড়লাম। তবে ভ্রমণপিপাসুদের উদ্দেশে একটি কথা না লিখলেই নয়—কাউখালী বন্দরে ভিড়ার আগে গাবখান চ্যানেল যখন জাহাজ ক্রস করে তখন যেকোনো নিরস ব্যক্তিও দু’পাশের প্রকৃতি দেখে বেশ উত্ফুল্ল হবে। মনে হবে অবারিত সবুজের মায়াজালে আবদ্ধ হয়ে জাহাজ এগিয়ে যাচ্ছে কোনো এক ভূ-স্বর্গের পানে। হুলার হাট নেমে তিন চাকার বাহনে পিরোজপুর শহরে। উদ্দেশ্য নদীমাতৃক শহর পিরোজপুর কিছুটা সময় ঘুরব। পিরোজপুরের ডাব আর ঘোল পান করে দুপুর পৌনে একটার দিকে মটর বাইকে ছুটলাম ঐতিহাসিক শহর বাগেরহাটের দিকে। সুনসান নীরবতায় ভর দুপুরে পিচঢালা পথে গাছের ছায়া সঙ্গী করে মটর বাইক ছুটে চলছে। হঠাত্ চোখে পড়ল রসের হাঁড়ি, অমনি বাইক ব্রেক। জিজ্ঞাসা করতেই বলল তালের রস। রসওয়ালা আর যায় কোথায়! এক এক করে সাবাড় করে নিলাম কয়েক গ্লাস। এ যেন মেঘ না চাইতে বৃষ্টি। তার কারণ খেজুর রসের পরে এবার তালের রসের অভিযানে বের হওয়ার কথা ছিল। বাইক ছুটছে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই বাগেরহাট এসে হাজির। খেয়েদেয়ে চলে গেলাম হযরত খানজাহান আলী (র.)-এর মাজার প্রাঙ্গণে। জোহরের নামাজ শেষে জিয়ারত করা হলো। দিঘির পুরোনো কুমির কালাপাহাড় মারা গেছে কয়েক বছর হলো। নতুন করে অবমুক্ত করা হয়েছে হিংস্র কুমির। এবার যাচ্ছি ঐতিহাসিক ষাট গম্বুজ মসজিদ। অল্প দূরত্বের। তাই কিছুক্ষণের মধ্যে পৌঁছে গেলাম। মসজিদটি পুরোনো আদল ঠিক রেখেই সংস্কার করা হয়েছে। মসজিদটির পিলার আছে ষাটটি। গম্বুজ আছে একাশিটি। দেয়ালের পলেস্তারের পুরুত্ব দুই পাশে আট ফিট ছয় ইঞ্চি। হযরত খানজাহান আলী (র.) মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আনুমানিক ১৪৪০ খ্রিস্টাব্দে। গুম্বুজ একাশিটি হলেও ষাটটি পিলারের কারণে মসজিদটি ষাট গুম্বুজ মসজিদ নামেই সর্বাধিক পরিচিত। মসজিদের পাশেই রয়েছে জাদুঘর ও বিশাল দিঘি। জাদুঘরে রয়েছে কুমির কালাপাহাড়ের মমিসহ প্রত্নতাত্ত্বিক যুগের অনেক ঐতিহাসিক নিদর্শন। যা কিনা ভ্রমণ-পিপাসুদের জ্ঞান ভাণ্ডার আরও সমৃদ্ধ করবে। হাতে এখনও অনেক সময়, সিদ্ধান্ত পাল্টালাম, বরিশাল গিয়ে আর স্টিমার ধরব না। খুলনা হয়ে ট্রেনে ঢাকা চলে যাব। রাত ৮টা ২০ মিনিটের ট্রেন সুন্দরবন এক্সপ্রেসের ফার্স্ট ক্লাস এসি চেয়ারের টিকিট বুকিং করা হলো। আমরা গিয়ে টিকেট তুলে নিলাম। টিকেট মাস্টার জানিয়ে দিল রাত দশটায় ট্রেন ছাড়বে। মটর বাইকের ভাড়া মিটিয়ে আমরা আকাশকে নিয়ে খুলনা শহরের এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ালাম। এক সময় ৮টা ২০ মিনিটের ট্রেন পরের দিন অর্থাত্ রাত ১টা ১০ মিনিটে ঢাকার উদ্দেশে ছাড়ল।