সক্রিয় অনলাইন প্রতারণার ফাঁদ
ইউসুফ আহমেদ তুহিন
বাংলাদেশ ব্যাংকের নাম এবং রেজিস্ট্রার অফ জয়েন্ট স্টকের নাম ব্যবহার করে চলছে অনলাইন প্রতারণা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় www.tiwbd.com ওয়েবসাইটের কথা। এই সাইটে গেলেই যে কেউ মনে করবে একটি বিশ্বস্ত সাইট। কেননা সাইটের শুরুতেই লেখা রয়েছে—We are Reg. From. Bangladesh Bank. Reg. No: BBFE.7855656। এরপর দেখা যাবে এটি একটি লিমিটেড কোম্পানি। এ ছাড়াও কলাবাগানের একটি নির্দিষ্ট ঠিকানাও দেওয়া আছে। আর ডলার রেটও তুলনামূলকভাবে খুবই সস্তা। এই সাইটে দেওয়া নম্বরে ফোন করে অফিসে যেতে চাইলেই অফিস থেকে বলা হয় অফিস কুমিল্লায় স্থানান্তরিত হয়েছে।
এমনই প্রতারণার এক ভুক্তভোগী তানভীর আহমেদ। নিউজিল্যান্ড পড়তে যাওয়ার কথা তার। অনলাইনে পেমেন্টের উপায় খুঁজে না পেয়ে তিনি যোগাযোগ করেন The Independent Web Ltd.-এর সিইও পরিচয়ধারী মাসুদ আহমেদের সাথে। তার সাথে যোগাযোগ করে ১৩৫ ডলারের সমপরিমাণ টাকা বিকাশের মাধ্যমে দেওয়ার পর মাসুদ আহমেদ ফোন রিসিভ করা বন্ধ করে দেন। পরবর্তীকালে চেক করে তানভীর দেখতে পান ওই নামে কোনো কোম্পনি জয়েন্ট স্টকে নেই।
তানভীরের মতো অসংখ্য লোক নিয়মিত প্রতারণার স্বীকার হচ্ছে এই চক্রের হাতে। শুধু ওয়েবসাইটে নয়, ফেসবুকেও এই চক্র সমানভাবে সক্রিয়। সাধারণ ফেসবুক ব্যবহারকারী থেকে শুরু করে ফ্রিল্যান্সাররাও প্রতারিত হচ্ছেন এই চক্রের মাধ্যমে। চক্রটি মূলত ফেসবুক পেজের মাধ্যমে কম দামে ডলার বিক্রির আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে। তাদের বিজ্ঞাপনের ভাষা থাকে এমন—‘চিটার বাটপার দূরে থাকুন। এই পৃথিবী কিছু না। পরকালে বিশ্বাস করুন। বহুদিন থেকে সুনামের সাথে ডলার বিক্রয় করে থাকি, বহুবার মানুষকে বিশ্বাস করে প্রতারিত হয়েছি। তাই আগে টাকা পাঠান। হাজী মাসুদ হাসান, ফোন: ০১৮৩৬******।’
এরপর খুব কম দামে পেপ্যাল, পেইজা, ইসক্রিল, পারফেক্ট মানি, পেয়নিয়ার, নেটলার, ওয়েব মানির দাম দেওয়া থাকে। এসব ফেসবুক অ্যাকাউন্টে বন্ধুত্বের অনুরোধ পাঠানোর সাথে সাথেই তা অ্যাকসেপ্ট করা হয়। ফেসবুকে থাকে দাড়িসহ একজন হাজীর ছবি। ঠিকানা চাইলে সাথে সাথে দেওয়া হয় ‘মো. মাসুদ হাসান মহসিন, মার্কেটিং অফিসার, ব্যাংক
এশিয়া লি., নারায়ণগঞ্জ ব্রাঞ্চ, ব্রাঞ্চ কোড:০৪৮, ঠিকানা: জাহান প্লাজা (১ম ফ্লোর), ২০ সিরাজউদ্দোল্লা রোড,ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ।’
এই তথ্যে বিশ্বাস করে যদি কেউ ডলার চায়, তাকে এই অ্যাকাউন্টে প্রদত্ত মোবাইল নম্বরে বিকাশ করতে বলা হয়। যদি কেউ নারায়ণগঞ্জ গিয়ে দেখা করে টাকা দিতে চায়, তাহলে বলা হয় ওইদিন তিনি কুমিল্লায় রয়েছেন, তাই বিকাশ করতে হবে। যে ডলার কিনবে, তার হয়তো ওইদিনই জরুরি কোনো কাজে ডলার প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে ৫০০ ডলারের মূল্য বাবদ ৩৫,০০০ টাকা বিকাশ করে পাঠিয়ে দিলে সাথে সাথে ফেসবুক আইডিতে আনফ্রেন্ড করে দেওয়া হয়। ফোন করলে ফোনও রিসিভ কর হয় না। খুব বেশি ফোন দিলে নম্বরটিই বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে টাকা পাঠানো ব্যক্তির আর যোগাযোগের কোনো উপায় থাকে না।
এরপর দেখা যায় অন্য নাম, পরিচয় ও ঠিকানায় নতুন আইডি খোলা হয়েছে। এবারে হয়তো তার নাম হজরত আলী আহমেদ, পরিচয় মার্কেটিং অ্যান্ড ডিপোজিট ডিপার্টমেন্ট, এইচএসবিসি ব্যাংক। এবার ফেসবুক ব্যানারে লেখা থাকবে—‘মৃত্যুর সময় শেষ কথা হবে, লা-ইলা-হা-ইল্লাল্লাহ’। আবার একই বিজ্ঞাপন দেওয়া হবে নির্দিষ্ট গ্রুপে। তবে নম্বর বদলে যাবে। এভাবে বারবার নাম, ঠিকানা, পরিচয় আর মোবাইল নম্বর বদলে চলবে প্রতারণা।
অনলাইনে ফ্রি ফরেক্স শেখানো হয় বলেও চলছে প্রতারণার ফাঁদ। ফরেক্সের ফাঁদে পড়লেও একইভাবে টাকা নেওয়া হবে। ফেসবুকে ট্রাস্টেড ডলার বাজার বাই সেল গ্রুপ করে আরেকটা মোবাইল নম্বর ব্যবহার করা হয়। এবারের নম্বর ০১৭৮৩******। গ্রুপ এ্যাডমিনের নম্বরে ফোন দেওয়া হলে সেও ভেরিফাই করে দেবে। উপরের সব নম্বর একই ব্যক্তির। ফেসবুক আইডিও একই ব্যক্তির। ডলারের দাম উল্লেখ করে ফেসবুকে ব্যক্তিগত ছবি, ঠিকানা, ফোন নম্বর সবই দিয়ে ডলার ক্রেতাদের আকৃষ্ট করে এরা। তবে সরাসরি নয়, ডলারের দাম বিকাশ কিংবা অন্য কোনো উপায়ে পাঠানোর জন্য গ্রাহকদের অনুরোধ করে চক্রটি।
এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে ঘটনা যাচাইয়ে এ প্রতিবেদক ডলার কেনার জন্য বিকাশ করে প্রতারণার শিকার হন। সাধারণত এভাবে ডলার বিক্রি দণ্ডণীয় হলেও ফেসবুকে এ ধরনের ডলার প্রতারণার ঘটনা বাড়ছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক সতর্কতামূলক একাধিক বিজ্ঞাপন দিলেও মানুষ সতর্ক হচ্ছে না।
ফরেক্স ব্যবসা বাংলাদেশের আইনে দণ্ডণীয় হলেও ফরেক্সের কথা বলেও হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। প্রত্যেক প্রতারকের মাসে কমপক্ষে আয় ২ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত। আর এদের পাল্লায় পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ।
আইনি ব্যবস্থা গ্রহণে দীর্ঘসূত্রিতা এবং অর্থ খরচের ভয়ে অনেকেই এই বিষয়গুলোতে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করেন না। এ ধরনের প্রতারণা রোধে ব্যবহারকারীদের সচেতনতার পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকারের সাইবার ক্রাইম বিভাগকে কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে বলে মন্তব্য তথ্যপ্রযুক্তির সাথে সংশ্লিষ্টদের।
প্রতারণামূলক কয়েকটি ফেসবুক পেজ—
on.fb.me/1kODiFT, on.fb.me/1gKF8mm
on.fb.me/1r8EsvR, on.fb.me/1gYrgbG
প্রতারিত এক ব্যক্তির বিশ্লেষণ রয়েছে এই লিংকে—http://tinyurl.com/oho4gtg
