আবার আসবেন জার্গেনসেন!

আপডেট : ০৭ মে ২০১৪, ২২:১০
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজ চলছিলো তখন। আর দশ দিনের মতোই অনুশীলনে প্রাণাতিপাত করছিলেন খেলোয়াড়রা। আর বাউন্ডারির বাইরে একটু ছায়া খুঁজে তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করছিলেন সংবাদকর্মীরা—অনুশীলন শেষে কোনো খেলোয়াড় হয়তো কথা বলতে আসবেন! বেশিরভাগ দিনই এমন অপেক্ষায় ফল মিললেও সেদিন কেন যেন দলের হয়ে কোনো খেলোয়াড় এগিয়ে আসছিলেন না। শূন্য হাতেই ফিরতে হবে ধরে নিয়ে মাঠ ছাড়ার উপক্রম শুরু হয়ে গিয়েছিলো। ঠিক তখনই তিনি হেঁটে এলেন। মুখে একটু লজ্জা, একটু বিব্রত একটা ভাব মেশানো হাসি ফুটিয়ে বললেন, ‘ছেলেরা খুব ক্লান্ত তো। ওরা আজ কেউ এলো না। আমি কথা বললে চলবে?’ এই হলেন শেন জার্গেনসেন! ‘হেড কোচ’ বললে যেমন রাশভারী, গুমোট একটা মুখ মাথায় ভেসে আসে; তার সঙ্গে এই অস্ট্রেলিয় সাবেক পেস বোলারকে আপনি কিছুতেই মেলাতে পারবেন না। রাস্তা-ঘাটে যে অবস্থায়ই দেখা হোক, আগ বাড়িয়ে তিনি কুশল বিনিময় করবেন। কথা বলতে চাইলে এক গাল হাসি নিয়ে এগিয়ে আসবেন। কথায় কথায় ‘মেট’ বলে বুঝিয়ে দেবেন; তিনি বিশেষ কেউ নন, তিনি এই বাংলাদেশ দলেরই একজন মাত্র। সেই বাংলাদেশ দলের ‘বন্ধু’ শেন জার্গেনসেনের মুখ থেকে গত কিছুদিনই চেনা হাসিটা একটু যেন দূরে সরে গেছে, মুখে আর সেই মায়াবী হাসিটা খেলা করছে না। গতকাল শেষবারের মতো প্রিয় মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়াম থেকে বেরোনোর সময় অকপটেই বললেন, চাকরি ছাড়া নিয়ে এতোটুকু আফসোস না থাকলেও এই দেশ, এই স্টেডিয়াম আর এই শিষ্যদের ছেড়ে যেতে বড়ই কষ্ট হচ্ছে তার। ২০১১ সালে এসেছিলেন প্রথম এই নগরীতে। দেখতে দেখতে তিন বছর কেটে গেল। দলের প্রতিটি খেলোয়াড়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছে, এই দেশের সঙ্গেও একটা বন্ধন তৈরি হয়েছে। সেটাকেই ছিন্ন করতে কষ্ট হচ্ছে বললেন জার্গেনসেন, ‘অবশ্যই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটটা সবচেয়ে বেশি মিস করবো। এই বাংলাদেশের জীবন, এখানকার সমর্থকদেরও মিস করবো। সবচেয়ে বেশি মিস করবো নিশ্চয়ই ক্রিকেটারদের। সবার সঙ্গেই আমার বন্ধুর মতো সম্পর্ক ছিল। বিশেষ করে মুশফিক, তামিম, মাশরাফিকে বড় মিস করবো। মাশরাফি যেভাবে ড্রেসিংরুম মাতিয়ে রাখতো...’। বোঝাই গেল আবেগ গ্রাস করেছে এই দীর্ঘদেহী মানুষটিকে। বিমানের টিকিট পাওয়ার ওপর নির্ভর করছে, আজই নাকি আগামীকাল বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যাবেন। তবে এটুকু নিশ্চিত যে, খুব অস্বাভাবিক কিছু না ঘটলে স্টেডিয়াম চত্বরে আর আসা হবে না। এই চত্বরে শেষ চক্করের আবেগটা নিজেই বললেন, ‘অনেককে বিদায় বলতে এসেছিলাম। মাঠটাকে আপাতত সম্ভবত শেষবার দেখে ফেললাম। বলা যায় বিদায়ই নিয়ে ফেলছি। সত্যি বলতে হয়, খুবই নার্ভাস লাগছে। এমন অভিজ্ঞতা আমার এর আগে কখনো হয়নি। সব ঝামেলা চুকে যাওয়ায় নিজেকে নির্ভার লাগছে। সেই সঙ্গে ঢাকা থেকে শেষবারের মতো বিমানে উঠবো, ভাবলেই কেমন যেন লাগছে।’ এই শেষ সময়ে পাওয়া, না পাওয়ারও অনেক হিসাব মেলাচ্ছেন জার্গেনসেন। নিজেই ভেবেচিন্তে বললেন, বাংলাদেশ অভিযানে সেরা পাওয়া তার ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডে ও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজ ড্র করা টেস্ট জয়। তবে ‘সেরা পাওয়াটা বারবার বলছেন, খেলোয়াড়দের কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসা। বিদায়ের সময় উত্তরসূরী কে হতে পারেন, তা নিয়েও প্রশ্ন করা হল তাকে। জার্গেনসেন কোনো অনুমান করতে চাইলেন না। শুধু বললেন, ‘যেই আসুন, তার জন্য অনেক বড় একটা সুযোগ। তরুণ এই দলটা নিয়ে অনেকদূর যাওয়া সম্ভব। এই ছেলেরা যে সমর্থন দরকার, নতুন কোচকে দেবে। নতুন কোচের জন্য এটা বড় একটা সুযোগ।’ ছেলেদের নিয়ে তার চিন্তার যে শেষ নেই, ভালোবাসার অন্ত নেই; তা বুঝতে মনস্তত্ববিদ হতে হয় না। বারবার বললেন, ওরা যেন ভালো থাকে, ভারতের বিপক্ষে খেলার আগে যেন ভালো বিশ্রাম পায়। ওদের যেন দেখেশুনে রাখা হয়। এসব কথা শুনে আপনার মনে হতে পারে, জার্গেনসেন দেহটাই নিয়ে যাচ্ছেন; মনটা পড়ে থাকছে ঢাকায়। অস্বীকার করলেন না জার্গেনসেন। স্পষ্ট করে বলে দিলেন, আবার একদিন এই বাংলাদেশে ফিরে আসার স্বপ্ন বুকে নিয়েই তিনি ঢাকা ছাড়ছেন, ‘‘আমি কখনোই ‘নেভার’ বলি না। আমার যদি সুযোগ হয়, সবকিছু যদি ঠিক থাকে; ভবিষ্যতে আবার আমি বাংলাদেশে ফিরে আসতে চাই।”