আল্লাহ তায়ালা মানুষকে নিজ সুরতে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহপাকের হাতেই রয়েছে মানুষের রিজিক, সম্মান, ধন-সম্পদ, জীবন-মৃত্যু, রোগ-শোক ও দূর্ভাগ্য-সৌভাগ্য ইত্যাদি। আর পিতামাতার ওসিলাতেই মানুষ এ সুন্দর পৃথিবীতে আগমন করে। মাতাপিতাই সবচেয়ে আপনজন। সন্তানের জন্য তাদের ত্যাগের অন্ত নেই। সন্তান যখন জন্মলাভ করে তখন সে কতোই না অসহায় থাকে। তখন পিতামাতাই সন্তানের সকল প্রয়োজন মিটিয়ে পরম আদর যত্নে লালন পালন করেন। সন্তানকে মানুষের মত মানুষ করার জন্য শিশুকাল থেকে মায়ের কষ্টের শেষ নেই। স্কুলে দিয়ে বারান্দায় বসে থাকা, রোদ-বৃষ্টিতে টিউটর-কোচিং সেন্টারে ছোটা, অসুখ হলে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া এবং রাত জেগে পাশে বসে থাকা এমনকি আল্লাহর দরবারে তার আরোগ্য কামনা করে চোখের পানি ফেলা, নিজে না খেয়ে সন্তানের মুখে ভালো খাবারটি তুলে দেওয়া কিংবা তার পছন্দের জিনিসটি কিনে দেওয়াসহ শত ভাবনার শেষ থাকে না সন্তানের জন্য মায়ের। আল্লাহতায়ালার ইবাদতের পরই পিতামাতার প্রতি সন্তানের দায়িত্ব ও কর্তব্য সবচেয়ে বেশি। সুসন্তান আল্লাহর কাছ থেকে প্রার্থনা করে চেয়ে নিতে হয়। যখন সন্তান মায়ের পেটে আসে তখন ধার্মিক ও খোদাভীরু মা যেনো আল্লাহর কাছে নেক সন্তান লাভের জন্য চোখের পানি ফেলেন। আল্লাহর দরবারে কাঁদলে আল্লাহপাক নেক ও চাঁদের মত সন্দুর পুত্র বা কন্যা দান করেন। আল্লাহ যাকে দয়া করে উত্তম সন্তান দান করেন, যৌবনে সে অবশ্যই পিতামাতার একান্ত অনুগত ও আল্লাহর সৈনিক বান্দায় পরিণত হয়। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.) যেদিন তাঁর নিজ মাতার রওজা জিয়ারত করেছেন সেদিন আল্লাহপাকের সব ফেরেস্তারাও খুশি হয়েছেন। বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.) মায়ের শিয়রে সারারাত পানি হাতে দাঁড়িয়েছিলেন। হযরত বড়পীর (রহ.) তাঁর মাতাকে অধিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসতেন। মায়ের হুকুমের বাইরে চলতেন না। জগতের সকল বুজুর্গানেদ্বীন, বিশ্ববিখ্যাত অলীগণ, নেক্কার বাদশাহগণ, নবী-রাসুলগণ, মোমিন বান্দাগণ পিতামাতার প্রতি সম্মান দেখিয়েছেন এবং অর্থ কষ্ট লাঘব করেছেন। যে পিতামাতা সন্তানকে অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করেন, সে পিতামাতা যখন বার্ধক্যে উপনিত হন তখন সন্তানের উচিত তাদের বেশি বেশি খোঁজ খবর নেওয়া। তারা যখন বৃদ্ধ হয়ে যান, দুর্বল হয়ে পড়েন, উপার্জন করতে পারেন না, তখন তাদের মন ছোট হয়ে যায়। একটা প্রয়োজনের জিনিস, শখের বস্তু কিংবা ঔষধ-সামগ্রীর কথা সন্তানকে বলতে ভয় পান বা শরম পান। কারও সন্তান কোটি কোটি টাকার মালিক, অথচ পিতামাতার বাড়তি চাওয়াগুলোর দাম খুব একটা বেশি নয়। তাই যখন পিতামাতা সন্তানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন তখন যেন জগতের সব সন্তান তাদের প্রতি অধিক লক্ষ রাখে, তাদেরকে কষ্ট না দেয়। কুরআন পাকে এরশাদ হয়েছে, “এবং পিতামাতার সাথে সৌজন্যমূলক আচরণ করবে। যদি তাদের একজন কিংবা উভয়ই তোমার সামনে বার্ধক্যে উপনীত হন, তবে তুমি তাদের প্রতি “উহ!” শব্দটিও উচ্চারণ করো না। তাদের সাথে ধমকের সুরে কথা বলবে না। বরং তাদের সাথে সম্মানসূচক ভাষায় কথা বলবে। তাদের জন্য দয়া পরবশ হয়ে বিনয়ের বাহু অবনমিত করো। তাদের সেবায় আত্মনিয়োগ করো এবং বলো, ‘হে আল্লাহ, আমার পিতামাতা শৈশবে যেমন স্নেহ-মমতা দিয়ে আমাকে লালন পালন করেছিলেন, আপনি তাদের প্রতি তেমনি সদয় হউন” (সূরা বনী ইসরাঈল :২৩-২৫)। পিতামাতার প্রতি এমন কোমল ব্যবহার করতে হবে যাতে তারা সন্তুষ্ট হয়। কেননা, পিতামাতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি। আল্লাহ বলেন, “এবং পিতামাতার সাথে তাঁদেরউত্তম আচরণ করো” (সূরা আন নিসা : ৩৬)। পিতামাতার অবাধ্যতা গুনার কাজ। এটি আল্লাহপাক ক্ষমা করেন না। এজন্য তাকে ইহ্ ও পরকাল দু’জায়গাতেই পরিণাম ভোগ করতে হবে। এ সম্পর্কে নবী করিম (স.) বলেন, “আল্লাহতায়ালা তাঁর ইচ্ছা মতো বান্দার সকল গুনা মাফ করে দেন। কিন্তু পিতামাতার অবাধ্যতার গুনা মাফ করেন না বরং এই গুনাগারকে পার্থিব জীবনে মৃত্যুর পূর্বেই শাস্তি দিয়ে থাকেন।” সন্তানের ওপর পিতামাতা উভয়েরই হক আছে। তবে পিতার চেয়ে মাতার হক বেশি। একদা এক ব্যক্তি নবী করিম (স.) এর দরবারে এসে আরজ করল, হে আল্লাহর রসূল (স.) ! আমার মা-বাবা উভয় জীবিত আছেন, আমি তাদের খেদমত করতে চাই। তবে কার হক আগে আদায় করব? নবীজি উত্তরে বললেন- “তোমার মাতার।” লোকটি আবার জিজ্ঞেস করল, “তারপর?” নবীজি বলেনে, “তোমার মাতার।” তৃতীয় বার একই প্রশ্ন করলে নবীজি উত্তরে বললেন, “তোমার মাতার।” চতুর্থ বার একই প্রশ্ন করলে নবীজি উত্তরে বললেন, “তোমার পিতার” (বুখারি শরীফ)। মা যখন বৃদ্ধ হয়ে যান তখন তিনি ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও শহরে বাস করা সন্তানের সংসারে জ্বালাতন হবে ভেবে অহরহ আসেন না। অনেক ক্ষেত্রে পুত্রবধুদের গলগ্রহ হতে চান না। তাই সন্তানের উচিত মাকে বেতনের মত করে মাসিকহারে টাকা দেওয়া, পুরনো ছিড়ে যাওয়া জায়নামাজটা পাল্টে দেওয়া, বারমাসের ফল-ফলাদি, ঔষধ-পথ্য, দামি শাড়ি, নামাজের জন্য আরামদায়ক কাপড়, গ্রামে সম্মানজনক জীবন যাপনের জন্য সুব্যবস্থা করা। কেননা, এগুলো হল মমতাময়ী মাতার হক। তবেই মায়ের দোয়ায় আল্লাহপাক সন্তানের জীবনের আয়-উন্নতি ব্যাপকহারে বর্ধিত করবেন। আর পরকালেও রাখবেন সুখে শান্তিতে। নবী করিম (স.) বলেছেন, “মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত।” মাকে খুশি করতে পারলে আল্লাহ ও নবীজি খুশী হবেন।
