ইসলামী ব ই প রি চি তি

আপডেট : ০৮ মে ২০১৪, ১৮:২৯
ইবনে তোফোয়েলের ‘হাঈ ইবনে ইয়াকজান’ :পরম সত্তার অনুসন্ধান মোহাম্মদ আব্দুল হালিম কাজী আখতারউদ্দিন অনূদিত গ্রন্থ ইবনে তোফায়েলের হাঈ ইবনে ইয়াকজান। মূল গ্রন্থটি আরবিতে রচিত। সাইমন ওকলে এটির ইংরেজি অনূবাদ করেছেন ‘ দি ইমপ্রুভমেন্ট অফ হিউম্যান রিজন: এগজিবিটেড ইন দ্য লাইফ অফ হাঈ ইবন ইয়াকজান ’ নামে— আর কাজী সাহেব এরই বাংলা তরজমা করে সূধী পরিমন্ডলে বিশ্ব বিখ্যাত মুসলিম দার্শনিক ইবনে তোফায়েলের চিন্তা চেতনা, জ্ঞান-মেধা অনুধাবন করার সুযোগ করে দিয়েছেন। প্রসিদ্ধ দার্শনিক রম্যোপন্যাস (Celebrated philosophical romance) গ্রন্থ ‘হাঈ ইবনে ইয়াকজান’ এর প্রণেতা হিসেবে ইবনে তোফায়েল সুখ্যাতি অর্জন করেন। এ গ্রন্থটি ল্যাটিন ও হিব্রুসহ ইউরোপের বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ভারত উপমহাদেশে এর উর্দু অনূবাদ হয়েছে। এর বাংলা ভাষায় অনূবাদ সম্ভবত এই প্রথম। কাজী সাহেব দুরূহ কাজটি করে বাংলাভাষাভাষীদেরকে ইবনে তোফায়েল ও তাঁর বিখ্যাত উপন্যাসকে সম্যকভাবে জানা ও বুঝার অপূর্ব সুযোগ করে দিয়েছেন। শুধু তাই নয় বহুপূর্বের বিখ্যাত মুসলিম দার্শনিকদের যে বৃহত্ অবদান তা আবারও স্বীকৃত হয়েছে। সংক্ষিপ্তভাবে হাঈ ইবনে ইয়াকজানের প্রকৃতি অনুধাবন থেকে আধ্যাত্মিক পর্যায়ে পৌঁছার সোপানগুলো নুিরুপ:পিতামাতাহীন এক মানব শিশু নাম তার হাই। নিরক্ষীয় অঞ্চলের নিকটে গ্রীষ্ম-মন্ডলীয় এক নির্জন দ্বীপে এর জন্ম। একটি হরিণী তাকে সেখানে লালন-পালন করে। এই হরিণীটিই হ্ছে তার জীবনের প্রথম শিক্ষাগুরু। হরিণীটির দুগ্ধপানে শিশুটি পশুদের সাথে থেকে ক্রমশ বেড়ে উঠে এবং তাদের ভাষা ও শিক্ষা লাভ করে। এক পর্যায়ে সে একটি যষ্টি বা লাঠির সন্ধান পায়। পরে সে এ লাঠির কার্যকারিতা ও হাতের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারে। লাঠি ও হাতের গুরুত্ব অনুধাবন করার পর সে এবারে নিজেকে শিকারীরূপে আত্মপ্রকাশ ঘটায়। এর মধ্যে স্তন্যপায়ী হরিণীটির মৃত্যু ঘটে। হাই ধারাল প্রস্তর খন্ডের দ্বারা হরিণীটির দেহ বিচ্ছিন্ন করতে থাকে। দেহ বিচ্ছিন্ন করতে করতে সে এই ধারণায় উপনীত হয় যে, হূদয় হচ্ছে সমগ্র দৈহিক অঙ্গের কেন্দ্র এবং জীবন বা প্রাণের মূলভিত্তি। হরিণীটির শব ব্যবচ্ছেদের মাধ্যমে কালক্রমে সে এ ধারণা লাভ করে যে নিশ্চয়ই এমন এক অদৃশ্য শক্তি আছে যা মৃত্যুর পর প্রাণিদেহ ত্যাগ করে চলে যায়। হরিণীর দেহ ক্রমশ শুকাতে থাকে। দাঁড়কাকের নিকট হাই এ ধারণাও লাভ করতে পারে কিভাবে একে মৃত্তিকায় পুঁতে রাখতে হয়। আকষ্মিকভাবে সে আবিষ্কার করে যে, শুষ্ক ডালের ঘর্ষণের ফলে মৃত গাছে আগুন জ্বলে ওঠে। সে অগ্নিকে স্বীয় বাসস্থানে নিয়ে আসে এবং প্রজ্জ্বলন করে রাখে। এই আবিষ্কার প্রাণীর মধ্যে অদাহ্য অগ্নি বা তাপ সম্পর্কে তাকে চিন্তা করতে উদ্বুদ্ধ করে। তার দক্ষতা আরো বৃদ্ধি পায়। সে নিজেকে চর্ম দ্বারা আবৃত করে। পশম ও শন ব্যবহার করতে শেখে এবং সূচশিল্পের দক্ষতা অর্জন করে। পুচ্ছবিশিষ্ট প্রাণী অবলোকনে সে অবহিত হয়, কেমন করে গৃহ নির্মাণ করা চলে। তার নিজস্ব শিকারের জন্য সে শিকারী পশুকে প্রশিক্ষণ দেয়। সে পাখির ডিম ও পশুর শিং-ব্যবহারিক গুরুত্ব অনুধাবন করে। সে দ্বীপের জীবজানোয়ার, এর উদ্ভিদ, খনিজ পদার্থ এবং এর পরিবেশগত ঘটনাবলীকে পর্যবেক্ষণ করে জ্ঞানের সর্বোচ্চ মাত্রায় উপনীত হয় যা সাধারণত প্রাকৃতিক বিজ্ঞানীদের কর্তৃকই অর্জিত হয়ে থাকে। এইভাবে হাই প্রকৃতি থেকে বিজ্ঞানে, বিজ্ঞান থেকে দর্শনে প্রবেশ করে এবং পরিণামে মরমিবাদে উপনীত হয়। প্রাকৃতিক ঘটনাবলীর বিচিত্রতা দেখে বিস্ময়াভিভূত হয় এবং সকল প্রকার বৈচিত্রের মধ্যে এক ঐক্য বা সংগতি লাভে প্রয়াশ চালায় এবং পরিশেষে সমগ্র জগতের মধ্যে এক সর্বব্যাপী ঐক্যের আত্মসন্ধানে সে নিজেকে ব্যাপৃত রাখে। প্রকৃতির স্বভাব পাঠে সে প্রতিটি স্তরে জড় ও আধ্যাত্মিক আকারের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করতে সমর্থ হয় এবং এই থেকে সব বস্তুর কারণ হিসেবে ‘ সে এক বিশুদ্ধ ও অপরিবর্তনীয় আকারের অস্তিত্ব অনুভব করে। ’ এই জগত্ পরিকল্পনার পশ্চাতে সে এক পরমসত্তার ক্রিয়া অবলোকন করে। সূক্ষ পর্যবেক্ষণ ও গভীর চিন্তার মাধ্যমে হাই এবার প্রকৃতির মধ্যে প্রকাশিত পরম সত্তাকে জানার দুর্বার অভিলাষ করে। তাঁর নিকট এ প্রতীত হয় যে আল্লাহ্র ইচ্ছার স্বাতন্ত্র্য রয়েছে। তিনি পরমজ্ঞানী ও করুণাময়। এই পর্যায়ে হাই এখন তার স্বীয় আত্মাকে জানার দিকে অগ্রসর হয়: আত্মিক শক্তি হলো সেই মাধ্যম যার দ্বারা জ্ঞান, এমনকি আল্লাহ্র গুণাবলি সম্পর্কেও অবহিত হওয়া যায়। এই স্তরে সে এটা অনুধাবন করতে সক্ষম হয় যে, সে এমন এক রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত যা পশুরাজ্য থেকে উন্নততর এবং সে সেই শক্তি সদৃশ (অশরহ) যা স্বর্গীয় মন্ডলকে নিয়ন্ত্রণ করে। এই দৃষ্টিকোণ থেকেই সে বিবেচনা করে যে, তার দেহ হচ্ছে শুধু এই জগতের অর্ন্তগত, তার আত্মা বা শক্তি যা তার মধ্যে সর্বোচ্চ গুণ তা স্বর্গীয় মন্ডলের অর্ন্তভূক্ত। আমরা গ্রন্থটির বহুল প্রচার প্রত্যাশা করছি।