বিরাট রাজার গড় বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থান। গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় রাজাহার ইউনিয়নে অবস্থিত এই প্রত্নস্থানটির বেশ কয়েকটি ঢিবি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসাবে সরকারের তালিকায় নথিভুক্ত আছে। কিন্তু কাগজে-কলমে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হলেও এখন এ ঢিবিগুলো ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। আর বিরাট রাজার গড়ের বিস্তৃত সীমানা ইতোমধ্যেই দখলদারদের দখলে চলে গেছে বলে জানা গেছে।
সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের একটি গবেষক দল এখানে জরিপ পরিচালনা করেন। জরিপে তারা দুটি ঢিবি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় দেখতে পান বলে জানিয়েছেন। স্থানীয় লোকজন মাটি খুঁড়ে নিয়ে যাওয়ার কারণে খ্রিঃ ১০ম-১১শ শতকে নির্মিত দুটি ব্রাহ্মণ্য মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের অবশেষ অংশটুকুও নিশ্চিহ্ন হবার মুখে। দুটি ঢিবির ইট নির্মিত স্থাপত্য-কাঠামোর অবশেষ উন্মোচিত ও ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় দৃশ্যমান হয়ে পড়েছে।
জরিপ দলের পক্ষে অধ্যাপক স্বাধীন সেন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক (রাজশাহী অঞ্চল) বরাবর প্রত্ননিদর্শনগুলো সংরক্ষণের ব্যবস্থা জরুরি ভিত্তিতে গ্রহণের লিখিত আবেদন জানিয়েছেন। অধ্যাপক স্বাধীন সেন বলেন,‘একটি স্থাপত্য কাঠামোর নবরথ মন্দিরের গর্ভগৃহের রথ অভিক্ষেপ (ধাপবিশিষ্ট দেয়াল) বহির্গাত্র উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে। মানুষজন ইট খুলে নিয়ে যাওয়ায় এই অভিক্ষেপগুলোর একটি পাশ ধ্বংস হয়ে গেছে। অন্য আরেকটি ঢিবিতে মাটি ও ইট খুলে নিয়ে যাওয়ার কারণে আরেকটি ব্রাহ্মণ্য মন্দিরের মণ্ডপের একপাশের দেয়াল উন্মুক্ত হয়ে কাত হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে বৃহত্তর তৃতীয় ঢিবিটির বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মাটি ও ইট তুলে নিয়ে যাওয়ার কারণে মাটির নিচে চাপাপড়া স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ আংশিকভাবে উন্মোচিত হয়ে পড়েছে।’
তবে রাজা বিরাট এলাকায় কি পরিমাণ জায়গা রয়েছে, উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ে সেই হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় লোকজন জানায়, রাজা বিরাট এলাকায় অন্তত ৫০ একর জমি থাকতে পারে। এলাকায় স্থাপিত মদনমোহন জিউ বিগ্রহ মন্দিরের সেবায়েত দীলিপ চক্রবর্তী বলেন, ‘রাজা বিরাটের ১৭ একর ২১ শতক জমি নিয়ে হাইকোর্টে মামলা বিচারাধীন আছে। বর্তমানে মন্দিরের দখলে আছে পাঁচ একর জায়গা। সেখানে হাট বসিয়ে প্রণামী আদায় করে মন্দিরের কাজ চালানো হয়। এই সম্পত্তি দেবোত্তর সম্পত্তি হিসাবে নিম্ন আদালতের রায় পেলেও রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল হয়েছে।’
রাজাহার ইউনিয়নের সাবেক সদস্য আলতাফ হোসেন বলেন, ‘রাজা বিরাটের বিস্তীর্ণ এলাকায় অবস্থিত বিভিন্ন অট্টালিকা ও স্থাপনাগুলোর বেশির ভাগ সময়ের বিবর্তনে মাটির নিচে চাপা পড়েছে। একসময় মাটির নিচ থেকে দেব-দেবীর মূর্তি খোদাই করা পাথরও উদ্ধার হয়েছে। সেগুলোর বেশির ভাগ মহাস্থান জাদুঘরে রাখা আছে। ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় এটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের আওতায় এনে সংরক্ষণ করা হলে এটি ঐতিহাসিক নিদর্শন কেন্দ্র হিসাবে গড়ে উঠবে।’
গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রামকৃষ্ণ বর্মন বলেন, ‘এই প্রত্নস্থানটির বেদখল জায়গা বিষয়ে পর্যালোচনা ও জরিপ করে উদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
