বিসিএলে তাইজুল
প্রতিপক্ষ পারফরম্যান্স
দক্ষিণাঞ্চল ৪/৯৭
পূর্বাঞ্চল ৭/৭১
পূর্বাঞ্চল ৫/৫১
মধ্যাঞ্চল ৬/৮৮
মধ্যাঞ্চল ৫/৮৯
দক্ষিণাঞ্চল ৮/৮৬
মোট: ৬ ইনিংস, ৩৫ উইকেট
শরীরের দু’পাশে দু’হাত পাখির ডানার মতো ছড়িয়ে দিয়ে মাঠ ছাড়ছিলেন। পেছন থেকে এক আম্পায়ার ডাক দিয়ে বলটা হাতে দিলেন। এবার বোলারদের চিরায়ত ভঙ্গিতে বলটা উঁচু করে ধরে এগিয়ে আসতে থাকলেন বাউন্ডারির দিকে। কিন্তু সতীর্থরা এটাকেও মনে হয় যথেষ্ঠ মনে করলেন না। দু’জন মিলে কাঁধে তুলে নিলেন তাকে।
সতীর্থদের কাঁধে চড়েই ইতিহাস গড়ে ফেলার মতো এক ভঙ্গিতে মাঠ ছাড়লেন বাহাতি স্পিনার তাইজুল ইসলাম!
না, ক্রিকেটীয় অর্থে এমন কোনো ইতিহাস হয়নি। এর চেয়ে ভালো বোলিং পারফরম্যান্স এই বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটই অনেকবার দেখেছে। এর চেয়ে বেশি ধারাবাহিকতা বিশ্বের অনেক প্রথম শ্রেণীর টুর্নামেন্টেই দেখা যায়। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় যে ধারাবাহিকভাবে ত্রাসের পর ত্রাস তৈরি করে চলেছেন তাইজুল, তাতে এই সম্মানটা তিনি পেতেই পারেন।
কী করেছেন তাইজুল? একেবারে নির্জলা পরিসংখ্যানে বললে, এবারের বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগে গতকাল পর্যন্ত ৬টি ইনিংসে বল করে তুলে নিয়েছে ৩৫টি উইকেট! মানে ইনিংসপ্রতি গড়ে ৫টারও ঢের বেশি উইকেট। গতকাল ৮৬ রান নিয়ে তুলে নিয়েছেন ক্যারিয়ার সেরা ৮ উইকেট। ৮ উইকেট ক্যারিয়ারে এই প্রথম পেলেও ৫-৬ উইকেট নেয়াটা একেবারেই অভ্যাসে পরিণত করে ফেলেছেন তাইজুল। শুধু একটা তথ্য জানলেই এই চলমান তাইজুল-যুগটা সম্পর্কে ধারণা পাবেন—বিসিএলে গতকাল পর্যন্ত ৬ ইনিংসে মাত্র একবারই ৫ উইকেট পাননি; লিগের প্রথম ম্যাচে দক্ষিণাঞ্চলের বিপক্ষে সেই ইনিংসটায় পেয়েছিলেন ৪ উইকেট!
স্বভাবতই এমন পারফরম্যান্সের পর তাইজুলের কাছে একটা বড় জিজ্ঞাসা ছিল—এই অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতার রহস্যটা কী?
৩৮-৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের প্রখর তাপে ৩১ ওভার বোলিং করে আসার ধকলেই তাইজুল রহস্য নিয়ে খুব একটা মাথা আর ঘামাতে পারছিলেন না। মাত্র ২টি ওভারের বিরতি দিয়ে দুই স্পেলে করে ফেলেছেন ৩১ ওভারের দীর্ঘ এই বোলিং। সেই ক্লান্তি নিয়েই কোনোক্রমে বললেন, ‘রহস্য বলে তেমন কিছু নেই। আমি শুধু মনোযোগ দিয়ে আমার কাজটা করে যাওয়ার চেষ্টা করেছি, জায়গা মতো বলটা ফেলতে চেয়েছি।’
এই ভয়ঙ্কর ক্লান্তিটা হয়তো এখন থেকেই আর সব বাংলাদেশী স্পিনারদের মতো তাইজুলেরও নিয়তিতে পরিণত হয়ে গেল। তাইজুল নিজেই স্বীকার করলেন, একটা পর্যায়ে খুবই কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু উইকেটের পর উইকেট সে কষ্ট টের পেতে দেয়নি, ‘একটা সময় একটু খারাপ লাগছিল। উইকেট পাচ্ছিলাম তো খারাপ লাগার ঐ অনুভূতিটা আসছিল না।’
এটা খুবই সত্যি কথা। এমন প্রাপ্তিতে মানুষ তীব্র কষ্ট ভুলেই যেতে পারে। আর তাইজুলের প্রাপ্তি তো ধারাবাহিকভাবে চলছেই। বিসিএলে এই নিয়ে টানা ৫ ম্যাচে ৫ বা ততোধিক উইকেট, জাতীয় লিগ মিলিয়ে এই নিয়ে টানা ৪ প্রথম শ্রেণীর ম্যাচে ৫ বা ততোধিক উইকেট। সবমিলিয়ে সময়টা যে দারুণ উপভোগ করছেন, সেটা অস্বীকার করলেন না এই তরুণ স্পিনার, ‘এতো ভালো করবো ভাবিনি কখনো। সময়টা ভালো যাচ্ছে। অবশ্যই আমি খুব উপভোগ করছি। সেই সঙ্গে চেষ্টা করছি, এই সময়টা যেন ধরে রাখতে পারি। সেজন্য দলের সিনিয়ররা, কোচ-অধিনায়ক; সবাই সহযোগিতা করছেন।’ তাইজুলের নিজের স্বার্থেই সেই ভালো সময়টা ধরে রাখা জরুরী। যে পারফরম্যান্স করছেন, তাতে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নজর কাড়াটা হয়তো কঠিন না। কিন্তু সর্বোচ্চ পর্যায়ে, মানে জাতীয় দলে নিজেকে দেখতে চাইলে অনেক বড় লড়াই করতে হবে তাকে। সাকিব আল হাসান, আব্দুর রাজ্জাক, ইলিয়াস সানি; জাতীয় দলে ও আশেপাশে ঝাঁকে ঝাঁকে সফল বাঁহাতি স্পিনাররা ত্রাস তৈরি করে যাচ্ছেন। এর মধ্যে আরেকজন বাঁহাতি স্পিনার হিসেবে জায়গা করে নেয়াটা মুখের কথা নয়।
তবে তাইজুলের বোলিং যতই রহস্যময় হোক, মুখের কথার মতো জীবন-দর্শনও খুব সরল, ‘আমি এসব ফাইট নিয়ে ভাবি না। নিজের কাজটা করে যেতে পারলেই হলো।’
সেটা করে যেতে পারলে ‘ফাইট’ এমনিতেই জিতে যাবেন, তাইজুল।
