সাজেক ভ্যালিতে ভ্রমণে যাওয়ার জন্য পত্রিকায় পাঠকদের উদ্বুদ্ধ করা হয়েছিল। তখন থেকেই সেখানে ভ্রমণে যাওয়ার সুপ্ত বাসনা মনে মনে পুষেছিল দে-ছুটের দল। রাঙামাটির দুর্গম অঞ্চলে সাজেক ভ্যালির অবস্থান এবং সেই সঙ্গে কীভাবে কোন সময় সেখানে যাওয়ার উপযুক্ত তার পূর্ব ধারণা ছিল না। পরিচিত ভ্রমণপিপাসুদের কাছ থেকে খোঁজ নিতে শুরু করলাম। অপেক্ষার পালা শেষ হলো। যাই হোক, আমরা সাতজন এখন সম্পূর্ণ প্রস্তুত। হোটেল, বাস টিকেট বুকিং করা হলো। ইতোমধ্যে তিনজন পিছু টান দিল, কিন্তু আমি অবিচল, প্রয়োজনে আমি একাই যাব। এখন আমরা চার জন। ঠিক যাওয়ার আগের দিন, আরেক বন্ধু বাঁধ সেধে বসল এই অজুহাতে যে, পাবর্ত্য অঞ্চলে সেনা সদস্যদের ওপর শান্তি চুক্তি বিরোধী আদিবাসীদের আক্রমণ হয়েছে। সে আমাদের তিনজনকে খুব বুঝাতে লাগল সেখানে না যাওয়ার জন্য। যাক আমরা তিনজন নাছোড়বান্দা—জাভেদ, মোস্তাক ও জুবায়ের, নির্দিষ্ট দিন সাজেক ভ্যালির উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। খাগড়াছড়ি পৌঁছে পর্যটন হোটেলে এক রাত থেকে পরের দিন সকালে চাঁদের গাড়িতে চড়ে সাজেকের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। অনেকগুলো আর্মি চেকপোস্ট, পুলিশ চেকপোস্ট পার হয়ে যেতে হয়। বাঘাইছড়ি আর্মি চেকপোস্টে সেনা সদস্যরা আমাদের যেতেই দিতে চাচ্ছেন না। তারা বলছেন, দেখুন আপনারা যার রেফারেন্সেই আসুন না কেন, বাস্তব পরিস্থিতি হচ্ছে আমরা এখানে আছি, সুতরাং আপনাদের সেখানে যেতে দিতে পারি না। কারণ সাজেক ভ্যালি এতই দুর্গম এবং গভীর অরণ্য যে, আপনারা অপহূত হলে আমাদের প্রচুর কষ্ট হবে উদ্ধার অভিযানে। অনেক সময় পাহাড় থেকে বন্য হাতির দল নেমে আসে। তাদের অনেক করে অনুরোধ করার পর আমাদের
যাওয়ার অনুমতি মিলল। এমনইভাবে প্রতিটি ক্যাম্পে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। শেষমেশ চেকপোষ্ট পার হয়ে আমাদের চাঁদের গাড়ি ছুটল পাহাড়ি পথে। তখন শুধু প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য চোখে পড়তে শুরু করল। দুই পাশে গভীর অরণ্য, মাঝে পাহাড়কাটা আঁকাবাঁকা পথ। গাড়ি কখনও উপরের দিকে উঠছে, কখনও নিচের দিকে। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে এই বুঝি আকাশ ছুঁতে চলেছি। কোনো জনমানবের চিহ্ন নেই। আমরা কোনো ভয় পাচ্ছি না, বরং আনন্দে গাড়ির ভেতর থেকে বের হয়ে ছাদে চড়ে বসলাম। অবাক হয়ে শুধু সাজেক যাওয়ার পথের রূপ দেখছি। অনেকক্ষণ গাড়ি চলার পর আদিবাসী যুবকদের দেখছি বড় বড় দা নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। পরনে আধুনিক পোশাক, তাদের দা হাতে দেখে আমরা কিছুটা ভয় পেয়েছি বৈকি। চাঁদের গাড়ি সাজেকে রুই লুই পাড়াতে ঢুকতেই ছয়-সাতজনের একদল আদিবাসী কাঁধে বন্দুক নিয়ে আমাদের গাড়ি থামাল। বন্ধু মোস্তাক প্রায় প্রস্তুতি নিল লাফ দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার। ওকে ঠেকালাম। মোস্তাক ভারাক্রান্ত মনে বলে উঠল, ‘আমার বুঝি আর বিয়ের পিঁড়িতে বসা হবে না।’ তাদের সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পারলাম তারা আদিবাসী প্রধান অর্থাত্ হেডম্যানের লোকজন। যাওয়ার সময় জনৈক ক্যাপ্টেন তাদের মধ্যে একজনের নাম বলে দিয়েছিলেন। সেই ভদ্রলোককে তাদের মাঝে পাওয়া গেল। তিনি আমাদের নিয়ে গেলেন সাজেক ইউনিয়নের বিউপি বিজিবি ক্যাম্পে। সুবেদার সাহেব তো আশ্চর্য হয়ে গেলেন—আমরা এত দুঃসাহস পেলাম কী করে এখানে আসার! সেই ঢাকা থেকে এসেছি জেনে তারা আমাদের আপ্যায়ন করলেন। কথা প্রসঙ্গে জানতে পারলাম বাংলাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন হচ্ছে সাজেক ভ্যালি। ক্যাম্প থেকে কিছুটা ভিতরে কমলক নামে একটি এলাকা আছে খুবই সুন্দর। আমরা বিজিবি সদস্যদের কাছে আবদার করলাম সেখানে যাওয়ার জন্য, তারা প্রথমে বারণ করে, পরে জোরালো অনুরোধের জোরে অনুমতি দিলেন। তারা সশস্ত্র অবস্থায় আমাদের সঙ্গে গেলেন। সেখানে গিয়ে প্রাকৃতিক এমন এক রূপ আমরা আবিষ্কার করলাম, যে রূপ আর কোথাও দেখিনি, দুঃখের বিষয় ছবি তোলায় বিজিবির নিষেধাজ্ঞা আছে তাই ছবি তুলতে পারিনি। এখানে প্রচুর কমলা বাগান। আদিবাসীরা তাদের লেখাপড়া ও বাজার সদাই ভারতের মিজোরামে গিয়ে করে থাকে। কমলক রাঙামাটি জেলার সবচেয়ে উঁচু পাহাড় সিপ্পুতে অবস্থিত। সেখানকার আদিবাসীরা পাঙ্কু সম্প্রদায়, অধিকাংশ শিক্ষিত এবং পোশাকে আধুনিক। কমলকের আদিবাসী তনা মেম্বার আমাদের খুব আপ্যায়ন করলেন। বিজিবির আপত্তির কারণে সেদিনই ফিরতে হয়েছিল। পরিশেষে বলতে হয় ভারতের দার্জিলিং থেকে যদি কাঞ্চনজঙ্গা দেখা না যেত তাহলে বাংলাদেশের সাজেক ভ্যালি কোনো অংশে সৌন্দর্যের দিক থেকে কম হতো না। সাজেক ভ্যালি রাঙামাটির অন্তর্গত হলেও ভ্রমণপিপাসুদের জন্য খাগড়াছড়ি দিয়ে যাওয়াই সহজ। দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের দল প্রায় দশ বছর আগে গিয়েছিল। বর্তমানে সেখানে বেড়াতে যাওয়াটা অনেকটা সহজই হওয়ার কথা। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ইতোমধ্যে পর্যটকদের সাজেকের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য পর্যটন এলাকা হিসাবে অবকাঠামো নির্মাণ শুরু করেছেন। খাগড়াছড়িতে রাত যাপন করার জন্য বেশ কয়েকটি আবাসিক হোটেল রয়েছে, তবে পর্যটন মোটেলে রাত যাপন মনে থাকবে বহুদিন।
যোগাযোগ :ঢাকা থেকে এস আলম, শান্তি অথবা সৌদিয়া পরিবহনে খাগড়াছড়ি, সেখান থেকে চাঁদের গাড়িতে সরাসরি সাজেক ভ্যালি যাওয়া যায়। চাঁদের গাড়ি রিজার্ভ নেওয়াটাই উত্তম। যাওয়া-আসার ভাড়া নেবে চার হাজার টাকা।
ছবি সামির মালিক
