মাকে যেমন মনে পড়ে প্রথম স্কুলটিকেও মনে পড়ে

আপডেট : ১৩ মে ২০১৪, ১৯:৪৭
সে সময় এত পাঠ্যবইয়ের বোঝা বহন করতে হয়নি রবীন্দ্র গোপ, পরিচালক বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন, ঢাকা প্রথম স্কুল। অবশ্যই মনে পড়ে। সেতো মাকে ভালোবাসার মতো। মাকে যেমন মনে পড়ে প্রথম স্কুলটিকে ও মনে পড়ে। অরুয়াইল প্রাথমিক বিদ্যালয় এখনও স্কুলটি আছে। তবে আমাদের সময় ছিল দু’চালা টিনের ঘর এখন বিল্ডিং। সবুজ শস্য মাঠের শেষ প্রান্তে খোলা হাওয়ায় স্কুলটি আমাদের মতো শিশুদের পেয়ে যেন নেচে গেয়ে উঠতো। কী যে প্রাণের স্পর্শ। আমার দাদার হাত ধরে গিয়েছিলাম। তিনিও সেই স্কুলেরই ছাত্র ছিলেন। চতুর্থ শ্রেণীতে পড়তেন তিনি। এখন তিনি ডাক্তার। হাফপেন্ট আর হাফ শার্ট পরেই গিয়েছিলাম। কিন্তু স্কুলের কাছাকাছিই ছিল গ্রামের সীমানা খাল। বেশ খরস্রোতা খাল। তীব্রবেগে বর্ষার জল যাচ্ছে মেঘনা নদী থেকে তিতাসের দিকে। আর কখনো কখনো জেলেদের জালে ধরা পড়ছে বড় বড় রুই কাতল। অবাক হয়ে দেখলাম-এক জেলের জালে ধরা পড়লো রূপালি ইলিশ। এক দু’বার সামান্য লাফ দিয়েই নির্জীব হয়ে পড়লো। ইলিশ দেখতে গিয়ে এক বাঁশের সাঁকো থেকে ধপাস করে পড়লাম। দাদাও ঝাঁপিয়ে পড়লেন। ভাগ্যিস সাঁতার জানা ছিল। তবু জলের তীব্র স্রোতে বেশ কিছু দূরে গিয়ে ভেসে উঠলাম। ইতোমধ্যে খালের দুপারে ভিড় জমিয়েছিল স্কুলের ছাত্রছাত্রী আর শিক্ষকগণ। হারিয়ে ছিলাম মাটির শ্লেট, পেন্সিল আর বাল্যশিক্ষা বই, আদর্শলিপি। আজও মনে পড়ে পেছনে ফেলে আসা সে দিনের কথা। টিনের চালা ঘরে। বৃষ্টির দিনে ঝমঝম-বৃষ্টি। একদিন বিকেলে ঝমঝম বৃষ্টি নামছে। অঙ্কের শিক্ষক অঙ্ক করাচ্ছেন-ব্ল্যাকবোর্ডে, লেখে দিচ্ছেন আর আমিতো ঘুমিয়ে পড়লাম। সেদিনের বেতের আঘাতের কথা মনে হলে আজও পিঠে মোচড় দেয়। সে সময় এত পাঠ্যবইয়ের বোঝা বহন করতে হয়নি। লেখাপড়ার পাশাপাশি অবারিত মাঠে ছিল খেলা আর খেলা। মূলত সকাল সন্ধ্যাই পড়ার সময়। ঠাকুরমার গল্প শুনতে শুনতেইতো গল্পের বই আর কবিতা মুখস্থ হয়ে যেত। মনে পড়ে নন্দলাল স্যারের কথা। কি যে মজা করে সাহিত্য পড়াতেন। বিশেষ করে কবিতা। ভুলতে পারিনা আজও। সেই থেকেই কবিতা মগজ দখল করেছে। স্যারের কাছে পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি ও শিখেছিলাম। এখনও সপ্তাহে একবার নখ কাটার সময় স্যারকে মনে পড়ে। নখ লম্বা হলে নখে বেত দিয়ে চাপ দিতেন। চিত্কার না করা পর্যন্ত ছাড়তেন না। আনন্দেরতো শেষ নেই। কোথায় শালিকে বাচ্চা দিয়েছে। ওর বাচ্চা এনে পোষতে হবে। সবুজ ধান ক্ষেত থেকে সবুজ গঙ্গাফড়িং ধরে এনে খাওয়ানো। বকের ছা পোষা। ছোট বড়শি দিয়ে টাকি মাছ পুটিমাছ ধরে এনে খাওয়ানো। এ যে স্বর্গীয় আনন্দ। একবার গাছের খোড়ল থেকে শালিকের বাচ্চা আনতে গিয়ে গোখরো সাপের লেজ ধরে টান দিয়েছিলাম। তারপর চিত্কার দিয়ে গাছ থেকে লাফিয়ে পড়ে বেঁচে যাই। ও সবতো মধুর আনন্দ বিনোদন। তখনতো আর রেডিও টেলিভিশন ছিলো না ঘরে ঘরে। তবে বিকেল হলেই মাঠে জমতো ফুটবল খেলা। এ গ্রামে ও গ্রাম মিলে জম জমাট খেলা হতো। সুসজ্জিত মাঠে ঢাক ঢোল বাজিয়ে খেলা। যে দল জয়ী হতো ওরা পুরস্কার পেতো। কতইনা আনন্দ। সন্ধ্যায় বসতো যাত্রাপালা। ওই আনন্দই এখনো স্মৃতির মনে আনন্দ দোলা দিয়ে যায়। স্কুলে না গেলে বন্ধুদের না দেখলে মন ভালো লাগতো না। আর পড়াশোনায় মা বাবার কোনই চাপ ছিল না। এ যেন জীবনেরই অংশ। অনেক সাথি ছিলো। আজ অনেকেই হারিয়ে গেছে। গ্রামের শিক্ষক হয়ে আছে এখনো- তপন, বেনী মাধব, কাশেম, রণজিত্, জগত্বন্ধু ওরা এখনো গ্রামে অবারিত সবুজ শ্যামলের পরশ মাখে। আনন্দকে কাছে পায়। জীবনের জটিলতা তাদের ঘায়েল করতে পারেনা।