বর্তমান সময়ে এখন অনেকেই ক্লাউড স্টোরেজের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। ব্যবসায়িক কাজের জন্যও অনেকেই ব্যবহার করছেন বিভিন্ন ধরনের ক্লাউড স্টোরেজ। তবে ব্যবসার কাজের জন্য প্রতিটি ক্লাউড স্টোরেজেই প্রয়োজন হয় বিশেষ ধরনের এনক্রিপশন সুবিধা, যাতে করে এই ক্লাউড স্টোরেজ ব্যবসার জন্য সর্বোচ্চ নিরাপত্তা এবং নির্ভরযোগ্যতা বজায় রাখতে পারে। গ্রাহক পর্যায়ে ক্লাউড স্টোরেজের সীমাবদ্ধতাও ব্যবসায়ের জন্য উপযোগী নয়। ব্যবসার কাজের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ সেরা কয়েকটি ক্লাউড স্টোরেজের কথা এই লেখায় তুলে ধরেছেন মোজাহেদুল ইসলাম
বক্স ডটকম
গ্রাহক পর্যায়ে খুব বেশি জনপ্রিয় না হলেও দীর্ঘদিন ধরেই ক্লাউড স্টোরেজের সেবা প্রদান করে আসছে বক্স ডটকম। গ্রাহক পর্যায়ে এটি বিনামূল্যে ১০ গিগাবাইট স্টোরেজ প্রদান করে আসলেও ব্যবসায়ের প্রয়োজনে অর্থের বিনিময়ে প্রয়োজনীয় যেকোনো পরিমাণের ক্লাউড স্টোরেজ ব্যবহার করা যায় এই প্ল্যাটফর্মে। ২০১৪ সালের শুরুর দিককার তথ্য অনুযায়ী ৩৪ হাজারেরও বেশি ব্যবসায়িক গ্রাহক রয়েছে বক্স ডটকমে। ব্যবসায়িক প্রয়োজনে বক্স ডটকমের যেসব প্যাকেজ রয়েছে তার মধ্যে প্রাথমিক প্যাকেজে ন্যূনতম ৩ জন ব্যবহারকারী ১ হাজার গিগাবাইট ক্লাউড স্টোরেজ ব্যবহার করতে পারবেন মাসে ১৫ ডলার খরচ করে। খরচের দিক থেকে বক্স ডটকম তাই অনেকটাই সাশ্রয়ী। উইন্ডোজ ফোন এবং ন্যাটিভ উইন্ডোজ ৮ অ্যাপ্লিকেশনে বক্স ডটকম অনেক বেশি কার্যকরী। এর আরেকটি বড় সুবিধা হলো এতে মাইক্রোসফটের অফিস ফাইল নিয়ে কাজ করার জন্য রয়েছে বিশেষ অ্যাড-ইনস। অফিস ২০০৭, অফিস ২০১০ এবং অফিস ২০১৩-এর প্রতিটি সংস্করণের জন্যই রয়েছে এই অ্যাড-ইনস যেগুলো ব্যবহার করে ক্লাউডে অবস্থান করে খুব সহজেই যেকোনো অফিস ফাইল খোলা, সম্পাদনা ও সংরক্ষণ করা যায়। বক্স ডটকমে সংরক্ষিত ফাইল নিরাপদ রাখার সব ধরনের প্রযুক্তিই রয়েছে বলে এটি নির্ভরযোগ্য একটি সেবা হিসেবেই সুপরিচিত। বক্স ডটকমের ওয়েব ঠিকানা www.box.com।
কপি ডটকম
ক্লাউড সেবার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে নতুন একটি সেবা কপি ডটকম। কপি ডটকমের মূল কোম্পানি মূলত এন্টারপ্রাইজ সিকিউরিটি এবং স্প্যাম ফিল্টারিংয়ের মতো কাজ করে থাকে। যে কারণে কপি ডটকমের ক্লাউড সেবায় তথ্যের নিরাপত্তা এবং নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন নেই। ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য কপি ডটকমে বিনামূল্যে ব্যবহার করা যায় ১৫ গিগাবাইট অনলাইন স্টোরেজ, যাতে একক ফাইলের আকৃতির কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। অর্থের বিনিময়ে কপি ডটকমে ২৫০ গিগাবাইট থেকে শুরু করে ৫০০ গিগাবাইট পর্যন্ত ক্লাউড স্টোরেজ ব্যবহার করা যায়। আর ব্যবসায়িক প্রয়োজনে এর স্টোরেজ আকৃতির কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। অফিশিয়াল ব্যবহারের জন্য এর বিশেষ একটি সুবিধা হলো এতে রয়েছে ‘সেন্ট্রাল ম্যানেজমেন্ট টুলস’। এই টুলস ব্যবহার করে কোম্পানি কপি ডটকমের স্টোরেজে তাদের ব্যবহারকারীদের সকল বিষয় নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। ব্যবসায়িক কাজের জন্যও যদি অ্যাকাউন্টের পরিমাণ ৫ বা তার কম হয়, তাহলে কপি ডটকমে ক্লাউড স্টোরেজ ব্যবহার করা যাবে বিনামূল্যেই। এর বেশি ব্যবহারকারী হলে তখন অর্থ খরচ করতে হবে। কম্পিউটারের পাশাপাশি মোবাইল প্ল্যাটফর্মেও সমানভাবে কাজ করতে সক্ষম কপি ডটকম। এর ওয়েব ঠিকানা www.copy.com।
গুগল ড্রাইভ
টেক জায়ান্ট গুগলের অনলাইন বা ক্লাউড স্টোরেজ সেবার নাম গুগল ড্রাইভ। ২০১২ সালে এটি যাত্রা শুরু করলেও এর মধ্যেই এটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। লিনাক্স ছাড়া বাকি সব প্ল্যাটফর্মেই কাজ করতে সক্ষম গুগল ড্রাইভ। বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে তথ্যের সিনক্রোনাইজেশনের কাজটিও এটি করে থাকে। যেকোনো গুগল অ্যাকাউন্ট থাকলেই গুগল ড্রাইভে উপভোগ করা যায় ১৫ গিগাবাইট ক্লাউড স্টোরেজ। বিজনেস অ্যাকাউন্টের জন্য গুগলের পেইড অ্যাপস ব্যবহার করলে এতে পাওয়া যায় ৩০ গিগাবাইট স্টোরেজ। সম্প্রতি গুগল তাদের এই ক্লাউড স্টোরেজের খরচে বিশাল ছাড়ের ঘোষণা দিয়েছে। এতে প্রতি মাসে মাত্র ১০ ডলার ব্যবহার করেই ১ টেরাবাইট স্টোরেজ উপভোগ করা যাবে। বিজনেস স্টোরেজের ক্ষেত্রে মাসে সাড়ে ৭ ডলারে ৫০ গিগাবাইট এবং ৮৯ ডলারে ১ টেরাবাইট স্টোরেজ পাওয়া যাবে। গুগল ড্রাইভের একটি বড় সুবিধা হলো এতে যেকোনো ধরনের ডক্যুমেন্টকে ক্লাউডেই খোলা ও সম্পাদনা করা যায়, যেকোনো ডক্যুমেন্টকে সহজেই শেয়ার করা যায়। একাধিক ব্যক্তি মিলে একসাথে কোনো ডক্যুমেন্ট সম্পাদনাও করা যায় এতে। আর সেবাটি গুগলের হওয়ার এর নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও নেই কোনো প্রশ্ন। মোবাইল প্ল্যাটফর্মেও গুগল ড্রাইভের কর্মদক্ষতার ঘাটতি নেই। গুগল ড্রাইভের ঠিকানা https://drive.google.com।
মাইক্রোসফট ওয়ানড্রাইভ
স্কাইড্রাইভ নামে মাইক্রোসফট ক্লাউড সেবার যাত্রা শুরু করলেও স্কাই কর্পোরেশনের কাছে মামলায় হেরে স্কাইড্রাইভ নামটি বদলে দিতে হয় মাইক্রোসফটকে। তাদের ক্লাউড সেবার নতুন নাম ওয়ানড্রাইভ। গ্রাহক পর্যায়ে এতে রয়েছে ৭ গিগাবাইট ফ্রি স্টোরেজ। অফিস ৩৬৫ সাবস্ক্রিপশন নিলে বাড়তি ২০ গিগাবাইট স্টোরেজ মেলে এই সেবায়। অর্থের বিনিময়ে বাড়তি ক্লাউড স্টোরেজ নেওয়ার সুবিধাও রয়েছে। ওয়ানড্রাইভের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর সাথে অফিস অনলাইনের সংযুক্তি। এই সংযুক্তির ফলে যেকোনো ডিভাইস থেকে শুধু ওয়েব ব্রাউজার ব্যবহার করেই নতুন যেকোনো অফিস ফাইল তৈরি করা, পুরোনো অফিস ফাইল সম্পদনা ও সংরক্ষণ করা যায়। অ্যান্ড্রয়েডসহ আইপ্যাডেও ওয়ানড্রাইভের অফিস অনলাইন সুবিধা গ্রহণ করা যায়। ফলে যেকোনো অফিস ডক্যুমেন্ট নিয়ে যাদের কাজ করতে হয়, তাদের জন্য ওয়ানড্রাইভ হতে পারে অন্যতম প্রধান একটি পছন্দ। ব্যবসায়িক কাজের জন্যও ওয়ানড্রাইভের এই সংস্করণ ব্যবহার করা যায়। ওয়ানড্রাইভের ঠিকানা https://onedrive.com।
ওয়ানড্রাইভ ফর বিজনেস
এটিও মাইক্রোসফটের ক্লাউড স্টোরেজ সেবা হলেও একে ব্যক্তি পর্যায়ের ওয়ানড্রাইভের চাইতে আলাদা সেবা হিসেবেই গণ্য করে থাকে মাইক্রোসফট। বছরে ২৫ ডলারে ৫০ গিগাবাইট, ৫০ ডলারে ১০০ গিগাবাইট এবং ১০০ ডলারে ২০০ গিগাবাইট স্টোরেজ এখানে ব্যবহার করা যায়। এর বাইরেও প্রতি গিগাবাইট স্টোরেজ ব্যবহার করা যাবে ২০ সেন্টে। ওয়ানড্রাইভের সব সুবিধা ছাড়াও অডিটিং ও রিপোর্টিং, অ্যাডভান্সড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ফর গ্র্যানুলার কন্ট্রোল, সিনক্রোনাইজেশন এবং স্ট্যান্ডার্ড কমপ্লায়েন্স তৈরির মতো সব ফিচার রয়েছে ওয়ানড্রাইভ ফর বিজনেসে। আবার অফিস ৩৬৫ সাবস্ক্রিপশনের সুবিধাও রয়েছে। ওয়ানড্রাইভ ফর বিজনেসের ওয়েব ঠিকানা https://onedrive.com/business।
স্পাইডারওক
২০০৭ সাল থেকেই ক্লাউড স্টোরেজ সেবা প্রদান করে আসছে স্পাইডারওক। শুরু থেকেই এটি মূলত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্লাউড স্টোরেজ সেবা প্রদান করে আসছে। তবে ব্যক্তিগত কাজের জন্য ব্যবহার করতে চাইলে বিনামূল্যে ২ গিগাবাইট ফ্রি স্টোরেজ পাওয়া যাবে এতে। ব্যবসায়িক ব্যবহারের জন্য বছরে ১০০ ডলারেই ব্যবহার করা যাবে ১০০ গিগাবাইট ক্লাউড স্টোরেজ। এন্টারপ্রাইজ পর্যায়ে এটি আরও স্বল্পমূল্যে সেবা প্রদান করে থাকে। স্পাইডারওকের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ফিচার হলো এর ‘জিরো নলেজ’ প্রাইভেসি ডিজাইন। এর অর্থ হলো স্পাইডারওকের পক্ষ থেকে কখনই এর কোনো গ্রাহকের পাসওয়ার্ড দেখা হয় না। গ্রাহক ব্যবহূত ‘এনক্রিপশন কি’-ও কখনও দেখে না স্পাইডারওক। গ্রাহকের এনক্রিপশন করা ফাইলগুলোই কেবল আদান-প্রদান করে থাকে এই প্ল্যাটফর্ম। ফলে স্পাইডারওকের কোনো কর্মীও এখানকার কোনো ফাইলের মেটাডাটা দেখতে পারে না। এই প্ল্যাটফর্মের আরও একটি সুবিধা হলো এটি গ্রাহকের নিজস্ব সার্ভারেও তথ্য রাখতে দেয়। নিজস্ব সার্ভারের অথেনটিকেশন এবং অ্যাকসেস টুলসও ব্যবহার করা যাবে। স্পাইডারওকের ঠিকানা https://spideroak.com।
উয়ালা
অনলাইন স্টোরেজে তথ্যের সুরক্ষা নিয়ে যারা একটু বেশিই চিন্তিত, তাদের জন্য আরেকটি ভালো সেবা হতে পারে উয়ালা। এটি ‘এন্ড টু এন্ড এনক্রিপশন’ পদ্ধতি ব্যবহার করে বলে এতে রক্ষিত কোনো তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ নেই। গ্রাহকের অথরাইজেশন ছাড়া উয়ালার কর্মীরাও কোনো তথ্যে প্রবেশ করতে পারে না। আর উয়ালায় ব্যবহূত পাসওয়ার্ড কেবল গ্রাহকের কম্পিউটারেই রক্ষিত থাকে। উয়ালার অনলাইন সার্ভিসেও এই পাসওয়ার্ড থাকে না কোনোভাবেই। ব্যক্তি পর্যায়ে ৫ গিগাবাইট বিনামূল্যে ব্যবহার করা যাবে উয়ালায়। এর বাইরে মাসে ৫ ডলারে ২০ গিগাবাইট, ১০ ডলারে ৫০ গিগাবাইট এবং ১৫ ডলারে ১০০ গিগাবাইট পর্যন্ত স্টোরেজ ব্যবহার করা যাবে। ব্যবসায়ের জন্য প্রয়োজনে আরও বেশি স্টোরেজ ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। মোবাইল ডিভাইসেও সিনক্রোনাইজ করে নিতে পারে উয়ালা। এর ওয়েব ঠিকানা https://wuala.com।
