হন্ডুরাস দেশটা কোথায়?
হন্ডুরাস কী বিশ্বকাপ খেলে? ওদের ফুটবল দলের ক্যাপ্টেনের নাম কী? হন্ডুরাসের ফুটবল স্টাইলটা কী?
কয়েক দিন আগেও এসব প্রশ্নের জবাব না জানলে কোনো ক্ষতি ছিল না। কিন্তু এখন যে আর সে উপায় নেই! হন্ডুরাস দেশটি সম্পর্কে, ফুটবল দলটি সম্পর্কে কিছু না কিছু জানাটা এখন আমাদের কর্তব্যে পরিণত হয়ে গেছে। কারণ, হন্ডুরাস এখন আর বিশ্বকাপের বাকী ৩১ দলের মতো একটি দল নয়; তারা এখন আমাদের বন্ধু—ফুটবলীয় বন্ধু!
না, ফুটবল ফেডারেশন বা কোনো প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে এই দেশটির সঙ্গে আমাদের ফুটবলীয় মিত্রতা তৈরি হয়নি। কোনো আনুষ্ঠানিকতার ভেতর দিয়েও তৈরি হয়নি এই দুই দেশের মৈত্রীবন্ধন। স্রেফ কিছু ফুটবল পাগল তরুণ তৈরি করে ফেলেছেন দুই দেশের বিস্ময়কর এক ভালোবাসার সম্পর্ক।
ফেসবুকে ‘উই আর ক্রেজি ফ্যান অব হন্ডুরাস টিম ফ্রম বাংলাদেশ’ নামে একটি ইভেন্টের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের একদল তরুণ তৈরি করে ফেলেছেন পৃথিবীর দুই প্রান্তের দুটি দেশের ফুটবল ভক্তদের মধ্যে অভূতপূর্ব এক সম্পর্ক। সম্পর্কটা আর শুধু ফেসবুকের মধ্যে আটকে নেই। বাংলাদেশে নিজেদের ফুটবলের ভক্ত আবিষ্কার করতে পেরে মুগ্ধ হন্ডুরাসবাসী নানা মাধ্যমেই তাদের আবেগ প্রকাশ করছেন। এমনকি বাংলাদেশের এই তরুণদের নিয়ে হন্ডুরাসের শীর্ষস্থানীয় একটি দৈনিকে প্রতিবেদনও ছাপা হয়ে গেছে। সবমিলিয়ে দু’দিন আগেও যাদের পরস্পরের সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না, সেই বাংলাদেশ আর হন্ডুরাস এখন এক বন্ধনে আটকে গেছে—ফুটবলীয় ভালোবাসার বন্ধন!
পুরো ব্যাপারটা জানতে গেলে একটু পিছিয়ে যেতে হবে।
বাংলাদেশে এই ‘হন্ডুরাসপ্রেম’টা তৈরির কারণ সেই আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল! হ্যাঁ, ঘটনা সত্যি। মূলত দেশজুড়ে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল ভক্তদের প্রবল প্রতাপ থেকে মুক্তি পেতে এবং একটু মজার সঙ্গে বিশ্বকাপের সময়টা পার করতে এই ইভেন্টটা খুলেছিলেন এ এন ফয়সাল আহমেদ ও তার বন্ধুরা। নামও দিয়েছিলেন সেরকম, ‘আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল গোনার টাইম নাই... আমরা হন্ডুরাসের পাগলা সাপোর্টার’।
এই শুরুর সময়ের কথাটা বলছিলেন রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রকৌশল বিভাগের ছাত্র ফয়সাল, ‘আসলে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের সমর্থক বন্ধুদের আচরণ দেখে খুব হতাশ ছিলাম। যে ভাষায় তারা পরস্পরকে আক্রমণ করতেন, তাতে ফুটবল বিশ্বকাপ উপভোগ কতোটা করা যায়, তা নিয়ে সন্দেহ ছিল। পরে কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে আলাপ করলাম—নতুন একটা দেশের সমর্থন করলে কেমন হয়? যে দেশের ফুটবল মোটামুটি ভালো, তেমন পরিচিতি নেই, কিন্তু আবেগ আছে। এভাবেই আমরা হন্ডুরাসকে খুঁজে পেলাম। মনে হল, এই দলটার পাশে থাকা যায়।’
ফয়সালের সঙ্গে একই চিন্তা থেকে তার আরও কয়েকজন বন্ধু, যেমন—আশিকুর রহমান অমিত, সাব্বির আহমেদ, কল্পতরুও একমত হলেন এই সমর্থনের ব্যাপারে। ব্যাস, খুলে ফেলা হল ইভেন্টটা। সেই সঙ্গে বাংলা নামের পাশে ইংরেজিতেও লিখে দিলেন—We're crazy fans of Honduras football team from Bangladesh!
ব্যাস! এই ইংরেজি নামই ঘটনাটা ঘটিয়ে ফেললো। হন্ডুরাসবাসী পেয়ে গেলেন এই ইভেন্টের খবর। এমন কিছু সমর্থক তাদের নিজেদের মহাদেশেই নেই, সেখানে একেবারে বিপরীত গোলার্ধের নাম না জানা একটি দেশে দলের সমর্থকগোষ্ঠী খুঁজে পেয়ে আপ্লুত হয়ে তারা দলে দলে যোগ দিতে থাকলেন ইভেন্টে। সেখানে বলতে থাকলেন আবেগী সব কথাবার্তা। প্রবাসী এক হন্ডুরাসের নাগরিক লিখেছেন, তার জীবন ধন্য হয়ে গেছে দেশের বাইরে থেকে দলের জন্য এমন সমর্থন পেয়ে। দারিও কানো নোলাসকো নামে একজন লিখেছেন, তিনি বাংলাদেশ নামের দেশটাকেই ভালোবেসে ফেলেছেন। এই ভালোবাসা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গত তিন-চার দিন ধরে বাড়তেই থাকলো। অবস্থা এমন দাঁড়ালো যে ইভেন্টে এসে হন্ডুরাসের লোকজন গুগল ট্রান্সেলেটের সাহায্য নিয়ে বাংলায় শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ জানাতে থাকলেন। আবার বাংলাদেশিরা একই উপায়ে হন্ডুরাসের ভাষা স্প্যানিশে ভালোবাসা বিনিময় করছিলেন।
এই পুরো আলোচনাটা ফেসবুক ছাপিয়ে হন্ডুরাসের ফুটবল ভক্তদের বাস্তব জীবনেও পৌঁছে গেল। আর এখানেই সবচেয়ে নাটকীয় ব্যাপারটা ঘটল। হন্ডুরাসের শীর্ষ একটি দৈনিক এল হেরাল্ডো বিশাল এক প্রতিবেদন ছেপে দিলো এই ইভেন্ট নিয়ে। সেখানে বাংলাদেশ থেকে আসা এই বিস্ময়কর ভালোবাসা, সমর্থন, ফয়সালের কথাবার্তা তো ছিলই। তার চেয়ে বেশি অংশ জুড়ে ছিল বাংলাদেশের পরিচিতি।
হ্যাঁ, এই ব্যাপারটাই এখন এই ইভেন্টের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আপনি যদি ইভেন্টে এখন ঢোকেন, দেখতে পাবেন কিছুক্ষণ বাদে বাদেই হন্ডুরাসের কেউ না কেউ বাংলাদেশ সম্পর্কে আরও কিছু জানতে চেয়ে প্রশ্ন করছেন। আর এই সুযোগটা নিচ্ছেন বাংলাদেশের তরুণরা। তারা হন্ডুরাসের ফুটবল ভক্তদের জানাচ্ছেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, কক্সবাজারের বৃহত্তম সমুদ্র সৈকত এবং সুন্দরবনের গল্প। ফলে এই ইভেন্টটা এখন বিশ্বকাপ, ফুটবল ছাপিয়ে বাংলাদেশের শুভেচ্ছা দূতের এক ভূমিকা পালন করতে শুরু করে দিয়েছে।
এই প্রাণের জায়গাটায়ই সবচেয়ে জোর দিলেন ফয়সাল, ‘বিশ্বকাপ তো শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু আমরা এই প্লাটফর্মটা নষ্ট করতে চাই না। বাংলাদেশের সম্পর্কে পৃথিবীর বিপরীত পাশের কিছু মানুষকে হলেও বিস্তারিত জানানোর এই যে সুযোগ, সেটা আমরা ধরে রাখতে চাই। এই ইভেন্ট তো এখন আমার একার নয়, এটা এখন পুরো বাংলাদেশের ইভেন্ট। সবাই মিলেই এখান থেকে আমরা বাংলাদেশের নাম পৌঁছে দেব বিশ্বের অন্য প্রান্তে।’
ফয়সালরা ভবিষ্যতে কী করবেন, তা সময় বলবে। তবে বাংলাদেশের নাম যে হন্ডুরাসের সাধারণ সমর্থকদের কাছ থেকে আস্তে আস্তে খোদ ফুটবল দলে পৌঁছে যেতে শুরু করেছে! গতকালই ওই ইভেন্টে হন্ডুরাসের এক ভদ্রলোক বললেন, তারা তাদের জাতীয় দলকে বাংলাদেশের ভালোবাসার এই বার্তা পৌঁছে দেবেন; অনুরোধ করবেন দলটি যেন এবারের বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম গোলটা বাংলাদেশকে উত্সর্গ করে!
আর কী চাই!
