নিঝুম দ্বীপ নাম নিলেই গা ছম ছম করে। সরকারিভাবে এই দ্বীপের নাম চর ওসমান। দে-ছুট ভ্রমণপিয়াসীদের এবারের ভ্রমণ ছিল নিঝুম দ্বীপে। সঙ্গী জসিম, লিটন, মানিক, আলাল, সায়েম, আ. রহমান ও মোস্তাক। বিকাল পাঁচটায় সদরঘাট থেকে লঞ্চ যাত্রা শুরু করে পরের দিন সকাল নয়টায় গিয়ে পৌঁছালাম নোয়াখালি জেলার হাতিয়া উপজেলার অন্তর্গত ইউনিয়ন চর তমুরুদ্দি। এই দীর্ঘ লঞ্চ ভ্রমণে আমাদেরকে আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করেছেন পানামা লঞ্চের তত্ত্বাবধানকারী শাহিন ও সোহাগ। চর তমুরুদ্দি গিয়ে এবার জোয়ারের জন্য অপেক্ষা। ততক্ষণে দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের চর তমরুদ্দি ঘুরে দেখা প্রায় শেষ। কাঙ্ক্ষিত জোয়ার এল। ইঞ্জিন চালিত বোটে করে ছুটছি এবার নিঝুম দ্বীপে। আহা কী মজা মেঘনার বুকে! টানা সাড়ে তিন ঘণ্টা প্রমত্তা মেঘনা নদী পারি দিয়ে প্রায় সন্ধ্যায় পৌঁছলাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি স্বপ্নের সেই নিঝুম দ্বীপ। অবকাশ পর্যটন প্রা. লি.-এর চেয়ারম্যান শিব-লুল আযম কোরাইশির সহযোগিতার আগে থেকেই নিঝুম রিসোর্ট বুকিং করা ছিল। রাত হয়ে যাওয়ায় সেদিন আশপাশ ঘুরে শহীদের হোটেলে গরম গরম ইলিশ ভাজা দিয়ে খাবার খেয়ে রিসোর্টে ফিরে এলাম। রিসোর্টের পরিবেশ বেশ চমত্কার। মেঘহীন তারা ভরা আকাশ, চারদিক নিস্তব্ধ, শুধু জেগে আছে দে-ছুট বাহিনী। উদ্দেশ্য রাতের সৌন্দর্য উপভোগ করা। জোনাকি পোকার মিটিমিটি আলো হাই ভোল্টেজের বাতির নিচে বাস করা আমাদের মতো মানুষের মনে এক অন্যরকম অনুভূতির জন্ম দেয়। সম্মিলিত কণ্ঠে গাইলাম ‘সেই তারা ভরা রাতে, আমি পারিনি বোঝাতে তোমাকে আমার মনের কথা’। শ্রুতিমধুর এই গানটি দিয়ে শেষ হলো রাতের আড্ডা। নিঝুম রিসোর্টের বারান্দায় রাতের এই আড্ডা অম্লান স্মৃতি হয়ে থাকবে। পরের দিন খুব ভোরে বের হয়ে গেলাম দ্বীপের বন্দর টিলা ঘুরতে। পায়ে হেঁটে গ্রামের মেঠো পথ পারি দিয়ে পৌঁছলাম বন্দর টিলা, নীরব নিস্তব্ধ কেওড়া বন। চারপাশ জুড়ে নৈঃশব্দ। এরমাঝে কেওড়া ফলের মাটিতে পড়ার টুপটাপ শব্দ। নিঝুম নামের সার্থকতা সম্ভবত এ কারণেই। জোয়ারের পানি নেমে যাওয়ার পর ম্যানগ্রোভগুলোকে অদ্ভুত সুন্দর লাগছিল। এবার দ্বীপের চোখ জুড়ানো নিঃসর্গ সুতার পুলের দিকে যাত্রা। ইতোমধ্যে রাতে বারবিকিউ করার জন্য পথেই একটি খাসি কেনা হলো। দ্বীপের বাসিন্দা ১৩-১৪ বছরের ছেলে রিয়াজ আমাদের গাইড। বয়সে ছোট হলেও গাইড হিসেবে সে দারুণ অভিজ্ঞ। ছোট ডিঙ্গি নৌকায় করে মোক্তাইরার খাল দিয়ে যাচ্ছি, দুপাশের নৈসর্গিক দৃশ্য তা শুধু চোখে দেখেই উপভোগ করা সম্ভব। গাইড খালের মাথায় ডিঙ্গি ভিড়ালো। কেওড়া গাছ, অগণিত ম্যানগ্রোভ, চেনা-অচেনা পাখির কলকাকলী সব মিলিয়ে অন্য এক পরিবেশ। বনের কিছু ভিতরে গেলেই ঝাঁকে ঝাঁকে চিত্রা হরিণের পালের দুরন্ত উপস্থিতি। ক্যামেরা তাক করার আগেই লাপাত্তা হয়ে যায় তারা। ১৯৭৪ সালে তত্কালীন বন প্রতিমন্ত্রী বন বিভাগের মাধ্যমে প্রথমে ৭টি হরিণ, পরবর্তীতে আরও ১০টি হরিণ অবমুক্ত করেছিলে। সেই থেকে এখন প্রায় ২৭,০০০ হরিণের আবাস। এই বনে শিয়াল কুকুর ছাড়া হিংস্র কোনো জন্তু নেই, তাই নির্ভয়ে বনের ভিতর ঘোরা যায়। বন্ধুদের কাছে জায়গাটি তথা নিঝুম দ্বীপ আকর্ষণীয় মনে হওয়ায় আমি বিশেষভাবে আনন্দিত। কারণ ভ্রমণের আয়োজন ও স্থান নির্ধারণ আমাকেই করতে হয়। নিঝুম দ্বীপের আয়তন প্রায় দশ হাজার একর। জনসংখ্যা প্রায় ত্রিশ হাজার। দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অতুলনীয়। দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর এবং পূর্ব ও পশ্চিমে মেঘনা নদী দিয়ে ঘেরা এই দ্বীপ। এই দ্বীপে বাস করে বিরল প্রজাতির পানি কাটা পাখি। সরকার ইচ্ছে করলে যোগাযোগের ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়ে নিঝুম দ্বীপকে ভ্রমণপিপাসুদের জন্য অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তর করতে পারে। এর রয়েছে দেশ ও বিদেশের ভ্রমণপিপাসুদের আকৃষ্ট করার মতো নয়ন জুড়ানো নিসর্গের ছোঁয়া।
যোগাযোগ :ঢাকার সদর ঘাট টার্মিনাল থেকে টিপু ও পানামা একদিন অন্তর অন্তর বিকাল পাঁচটায় হাতিয়ার চর তমুরুদ্দির উদ্দেশ্য ছেড়ে যায়। ভাড়া ডাবল সিটের কেবিন ১৭০০ টাকা। ডেকে মাত্র ২৫০ টাকা। সড়ক পথেও যাওয়া যায়, তবে নৌপথে আরামদায়ক। চর তমুরুদ্দি থেকে ট্রলারে (স্থানীয় ভাষায় টেম্পু) যেতে হবে নিঝুম দ্বীপ। ভাড়া রির্জাভ ৩০০০ টাকা। রাতে থাকার জন্য সরকারি কিংবা বেসরকারি তেমন কোনো হোটেল-মোটেল নেই। তবে অবকাশ পর্যটন লি. পরিচালনায় উপজেলা ডাকবাংলো নিঝুম রিসোর্ট নামে পরিচিত সেখানেই পর্যটকদের রাত্রি যাপন নিরাপদ। ভাড়া ডাবল বেড ১,৫০০ টাকা। রিসোর্টে বারবিকিউয়ের দারুণ সু-ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া মসজিদ বোর্ডিং আছে, ভাড়া জনপ্রতি ১০০ টাকা। ইলিশ ভাজার স্বাদ নেওয়ার জন্য শহিদের ভাতের হোটেল ছাড়াও আরও কয়েকটি খাবার হোটেল আছে। দ্বীপে বেড়ানোর জন্য পাবেন ১৪-১৫ বছরের গাইড। বয়সে ছোট হলেও সেবাদানে অভিজ্ঞ ও বিশ্বস্ত। ওদের চার্জ সারাদিনের খাবার দেওয়াসহ ২০০ টাকা। সব মিলিয়ে নিঝুম দ্বীপ ভ্রমণে জনপ্রতি ৫,০০০ টাকা হলেই যথেষ্ট। তবে খরচ নির্ভর করে থাকা, খাওয়া এবং যাতায়াতের উপর। ভ্রমণপিপাসু বন্ধুরা তবে আর দেরি কেন? হাতে চারদিন সময় নিয়ে দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের মতো আপনারাও ছুটে যেতে পারেন প্রকৃতির অপার দান নিঝুম দ্বীপে।
