মো. আমিরুজ্জামান
সুুরের বাঁশিওয়ালা ভবেশ। পরনে ফতুয়া আর ধুতি। বিক্রি করেন বাঁশের বাঁশি। সারাদিন এখানে সেখানে বাঁশি বাজিয়ে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করেন। কেউ কেনেন, কেউবা সুরের জালে ডুবে থাকেন। প্রাণ সখিরে ওই শোন কদম্ব তলায় বংশী বাজায় কে, তরলা বাঁশির ছিদ্র গোটা ৬টা, বাঁশি কতই কথা কয়।—এমনই পাগল করা সুর যাঁর বাঁশিতে ওঠে তাঁর নাম ভবেশ। বয়স সত্তরের কাছাকাছি। ক্লান্তিহীন পথিকের বেশে দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে হ্যামিলনের বাঁশিওলার মতো কাঁধে ঝোলা আর মুখে আঞ্চলিক গানের অকৃত্রিম সুর বাঁশিতে তুলে অবিরত হাঁটছেন। গ্রামের মেঠোপথ আর শহরের ব্যস্ততম বাজার কিংবা মহল্লার গলিতে বাঁশের বাঁশির মন্ত্রমুগ্ধ সুরের মূর্ছনায় বিগলিত প্রেমিকরা অনেকেই বাঁশি কিনছেন এ পথশিল্পীর কাছে। এভাবে বাঁশি বিক্রির আয় দিয়ে ৪ সদস্যের সংসার চালাচ্ছেন ভবেশ। এতে তারকাখ্যাতি না মিললেও জীবিকা চলায় খুশি তিনি। তবে এ পথশিল্পীর দাবি, প্রত্যন্ত অঞ্চলের মেধাবীরা যেন এ দেশের সংস্কৃৃতি অঙ্গনে সুযোগ পায়। তাহলে আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের পাশে থেকে যেকোনো সুর সমৃদ্ধ হবে। পাশাপাশি সঙ্গীতাঙ্গন হবে সমৃদ্ধ।
দিনাজপুর জেলার খানসামা উপজেলার ভাবকি গ্রামের মৃত শ্যাম চরণের পুত্র ভবেশ চন্দ্র রায়। পিতার জমি-জমা থাকায় এবং একমাত্র সন্তান হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই ভবেশ ছিলেন ভবঘুরে। তাই প্রাথমিক স্কুলের গণ্ডি পেরুতে পারেননি। তত্কালীন সময়ে গ্রামের আঙিনায় বসতো গানের আসর। সেই আসরের নিয়মিত একজন দর্শক ছিলেন তিনি। পরে নিজগ্রামে হরিবাসর বা কীর্তন গানের আসর বসলে ভাড়া করা দিনাজপুরের রানীগঞ্জ মহেশপুর এলাকার দলটির গুরু কমল কান্তির হাত ধরে নিতাই দলটির সদস্য হন। আর সেই দলের গুরুর নির্দেশনায় শুরু করেন বাঁশি বাজানো। বাঁশিতে দক্ষতা বাড়লে বিভিন্ন এলাকার অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পান তিনি।
মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে বিয়ের পর সংসারী হন ভবেশ। ভবঘুুরে সন্তানে আস্থা না থাকায় পিতা সব সম্পত্তি বিক্রি করে দেন। এতে পরিবারের চাহিদা মেটাতে বেকায়দায় পড়ে যান ভবেশ। নিজের বাঁশি বাজানো বিদ্যাটুকু কাজে লাগিয়ে শুরু করেন বাঁশি বানিয়ে বিক্রির ব্যবসা। আর এভাবে দীর্ঘ ৩ যুগ ধরে এ বাঁশির ভ্রাম্যমাণ ব্যবসা করে সুখ স্বাচ্ছন্দ্যে জীবিকানির্বাহ করছেন তিনি।
ভবেশ বলেন, ‘দিনাজপুরের বীরগঞ্জ ও কাহারোল এলাকা থেকে ২০ থেকে ২৫ টাকা দরে একটি মুলি বাঁশ কিনে তা থেকে ৬ কিংবা ৮টি বাঁশি তৈরি করি। এক্ষেত্রে পরিশ্রম কম। শুধু লোহার রড গরম করে ছিদ্র করলেই হয়। ছোট মোহন বাঁশি কিংবা বড় ঘাড় বাঁশিগুলো অতি যত্নের সাথে বানাতে হয়। ১৫ টাকা থেকে শুরু করে ছোটগুলো ৩০ টাকা, আর বড় মোহন বাঁশিগুলো ২ থেকে ৫শ’ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। এতে প্রতিদিন ৩ থেকে ৪শ’ টাকা আয় হয়। বাঁশি সকলে নিতে চায় না, তাই তাঁদের ভাওয়াইয়া, পল্লীগীতি, ভাটিয়ালি ছাড়াও জনপ্রিয় গানগুলো শোনানোর পর তাঁরা কেনেন।’
ভবেশের স্ত্রী মেনেকা বলেন, ‘আমরা পরিবারের সকলে মিলে বাড়িতে বাঁশি বানাই। আর উনি তারাগঞ্জ, দিনাজপুর, সৈয়দপুর, পার্বতীপুরসহ বিভিন্ন স্থানে প্রতিদিন ১ থেকে দেড়শ’ বাঁশি বিক্রি করেন। এতে সকলের ভরণ-পোষণ চলে। পাশাপাশি বাঁশির আয় দিয়েই নিজের বাস্তুভিটাসহ কিছু গবাদিপশু কিনে পালন করছি।’
তবে এতে ভবেশের পরিবার বাঁশি বিক্রি করে সুখে থাকলেও ভালো নেই ভবেশের মন।
তিনি বলেন, ‘বাঁশির সুর কখনো বিক্রি হয় না, এটি আমার আত্মার খোরাক। তাই এটি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সংস্কৃতি অঙ্গনে পরিবেশনের সুযোগ পেলে নিজেকে ধন্য মনে করতাম। তবে আমি সুযোগ না পেলেও এখনো মফস্বল এলাকাগুলোতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অনেক বাঁশি শিল্পী আছেন। তাঁরা যদি সুযোগ পায় তাহলে আধুনিক যন্ত্রের যুগে টিকে থাকবে বাঁশের বাঁশি।’
