৩ দশকে সাড়ে ৩শ নৌ-দুর্ঘটনা

আপডেট : ১৯ মে ২০১৪, ২৩:০৬
গত ৩ দশকে দেশে প্রায় সাড়ে ৩শ’ নৌ-দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটেছে ৬ সহস াধিক যাত্রীর। নিখোঁজ যাত্রীর সংখ্যা আরো কয়েক হাজার। ১৯৮৪ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ২৮৮টি নৌ-দুর্ঘটনায় মারা গেছে আড়াই হাজারের বেশি মানুষ। এতে আহত ও নিখোঁজের সংখ্যা ৩ হাজারের বেশি। গত ১৪ বছরে আরো দুর্ঘটনা ঘটেছে প্রায় একশ। নৌ-দুর্ঘটনার কারণ নির্ণয়ে সব সময়েই তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও তার রিপোর্ট কখনোই আলোর মুখ দেখেনি। দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের কখনোই শাস্তি পেতে হয়নি। বরং নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই দুর্ঘটনাকবলিত লঞ্চের নাম বদল করে পুনরায় যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে। একই লঞ্চ বার বার দুর্ঘটনাকবলিত হয়। প্রাণ হারায় শত শত মানুষ। নৌ-দুর্ঘটনার বেশিরভাগই চালকের অবহেলা ও অনভিজ্ঞতা, নৌপথে প্রতিযোগিতা এবং বিরূপ আবহাওয়ার কারণে ঘটে থাকে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে লঞ্চ মালিকরা তাদের ইচ্ছেমতো নৌপথ ব্যবহার করছেন। বিশাল নৌযান তৈরির অনুমতি দিচ্ছে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর। অথচ এসব নৌযান দুর্ঘটনার পর উদ্ধারের জন্য নেই আধুনিক জলযান। ২৯ বছর পর ‘নির্ভীক’ ও ‘প্রত্যয়’ নামে দু’টি আধুনিক উদ্ধারকারী জলযান সংগ্রহ করা হয়। তবে এ দু’টি জলযানের উদ্ধার ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সর্বশেষ নৌ-দুর্ঘটনায় নিমজ্জিত ‘এমভি মিরাজ’ নামের ছোট লঞ্চটি উদ্ধারই সময় লেগেছে প্রায় ৪০ ঘন্টা। ৩৬৫ কোটি টাকা খরচ করে কোরিয়ার ডকইয়ার্ডে নির্মাণ করা এ উদ্ধারকারী জলযান ‘প্রত্যয়’ ও ‘নির্ভীক’ একযোগে ‘রুস্তম’ ও ‘হামজা’র মত অভিযান চালাতে পারে না। ‘এমভি মিরাজ’ উদ্ধার অভিযানে প্রত্যয়কে সহায়তা করেছিল সংস্থার অপর জাহাজ ‘দুর্বার’ ও ‘দুরন্ত’। উদ্ধার অভিযান বিলম্ব হলে ক্ষতি বেড়ে যায়। ‘এমভি মিরাজ’ দুর্ঘটনার পর উদ্ধার অভিযানে প্রায় ৪০ ঘন্টা সময় লাগার কারণে সেখানেও স্বজনহারা মানুষ দফায় দফায় বিক্ষোভ করেছেন। সেই পুরনো আমলের হামজা-রুস্তমের মতই উদ্ধার অভিযানে দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টি হওয়ায় মানুষের মধ্যে ক্ষোভ সঞ্চার হয়। উদ্ধারকারী এ জলযান ছোট নৌযান উদ্ধার করতে গিয়ে যেভাবে হিমশিম খেয়েছে তাতে বড় ধরনের নৌ-দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকারী জলযানগুলো কতটা সাফল্য পাবে তা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান শামসুদ্দোহা খন্দকার জানিয়েছেন, ‘এমভি মিরাজ’ যেখানে নিমজ্জিত হয়েছিল সেখান থেকে প্রায় ১৫ গজ দূরে ভেসে গিয়েছিল। পাশেই গভীর খাদ থাকায় নদীর তলদেশে জাহাজটি শনাক্ত করে উদ্ধার করতে কিছুটা বেশি সময় লেগেছে। সংস্থার চেয়ারম্যান জানান, ৩০ ঘন্টায় নিমজ্জিত লঞ্চটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। দায়ী ব্যক্তিকে শাস্তি পেতে হয় না বিগত দিনের দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা গেছে, দুর্ঘটনার শতকরা ২৫ দশমিক ৪৫ ভাগ ঘটেছে চালকদের অবহেলার কারণে। এ তথ্য নৌ-পরিবহন বিভাগ সূত্রের। দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও কিছুদিন পর কমিটির কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়ে। গত ৩ দশকে নৌ-দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এমন কোন নজির বিআইডব্লিউটিএ’র কাছে নেই। চলতি বছর এখনো ভরা মৌসুম শুরু হয়নি। ইতিমধ্যে গত ২ মে পটুয়াখালী নিমজ্জিত হয় ‘এমএল সাটিল’। এ দুর্ঘটনায় ১৭ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। নিখোঁজ রয়েছে আরো ৩ জন। একই লঞ্চ গত ৩০ জানুয়ারি দুর্ঘটনাকবলিত হলে প্রাণ হারায় ৩ জন। তখন লঞ্চটির নাম ছিল এম এল সাথিল। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এ লঞ্চটি ইতিপূর্বে আরো ৩ বার নিমজ্জিত হয়েছিল। বার বার নাম পরিবর্তন করে বিআইডব্লিউটিএ-কে ম্যানেজ করে পটুয়াখালীর বিভিন্ন রুটে যাত্রী পরিবহন করে আসছে। সর্বশেষ এমভি মিরাজ দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা অর্ধশত ছাড়িয়ে গেছে। নৌ-পরিবহন সূত্রের তথ্যানুযায়ী, নৌ-দুর্ঘটনার শতকরা ৩৭ দশমিক ৪২ ভাগ ঘটে অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাইর কারণে। শতকরা ২২-৭২ ভাগের জন্য দায়ী নৌপথে প্রতিযোগিতা ও সংঘর্ষ। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে দুর্ঘটনা ঘটে শতকরা ৯ দশমিক ৭৪ ভাগ। যান্ত্রিক ত্রুটির জন্য ৫ দশমিক ৪৯ ভাগ এবং অন্যান্য কারণে ৮ দশমিক ৭৪ ভাগ নৌ- দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। সরকারি হিসেবের চেয়ে বেসরকারি হিসেবে মৃত্যুর সংখ্যা আরো অনেক বেশি। ইতিপূর্বে ঝড়ের কবলে পড়ে লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটলেও এখন নাব্যতা সংকটের কারণে একই চ্যানেলে একাধিক নৌযান ঢুকে দুর্ঘটনায় পতিত হচ্ছে।