ঈদের ছুটিতে জুরাছড়ি

আপডেট : ২৬ মে ২০১৯, ১৮:২৩

মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম

 

‘ধ্বংস নয় রক্ষা, কংক্রিট নয়, প্রকৃতি। আসুন আমরা আমাদের নিজেদের স্বার্থেই প্রকৃতি রক্ষা করি।’—এই শ্লোগান ধারণ করেই ট্রলারে চেপে ছুটে গিয়েছিলাম রাঙ্গামাটি জেলার গহীনের সৌন্দর্য জুরাছড়ি। সাধারণ পর্যটকরা সাধারণত ওইদিকে তেমন একটা যান না। জুরাছড়ি রাঙ্গামাটি জেলার অত্যন্ত দুর্গম একটি উপজেলা। অধিকাংশ ভ্রমণপিপাসুর নিকট এর নয়ন জুড়ানো সৌন্দর্য রয়েছে অজানা। এছাড়া কাপ্তাইয়ের নীলাভ থৈ থৈ পানিতে নৌ-ভ্রমণের মজাই আলাদা।

রাতের গাড়িতে চড়ে পৌঁছে যাই ভোর ৪টা ৩৫ মিনিটে। ফোন পেয়ে গাইড হারুন আর ট্রলার মালিক যেন বিছানা থেকে লাফিয়ে ওঠেন। দলে আমরা ১৪ জন। রিজার্ভ বাজার থেকে নাশতা পর্ব শেষেই উঠি গিয়ে ট্রলারে। চলতি ৩ দিন এই ট্রলারই হবে আমাদের বাড়িঘর। গরু মাংস, মোরগ, বাজার-সদাই সবই আগে থেকে রেডি। আল্লাহর নাম নিয়ে সকাল ৮টায় ট্রলার ছাড়ে রিজার্ভ বাজার ঘাট থেকে। দে-ছুটে চান্স পাওয়া নতুনদের উচ্ছ্বাস ছিল যেন একটু বেশিই বেশি। সবুজে মোড়ানো পাহাড় আর কাপ্তাই লেকের নীল পানি সঙ্গী করেই ট্রলার এগিয়ে যায় প্রাকৃতিক স্বর্গ পানে। যতই এগিয়ে যাই ততোই সামনের পাহাড়গুলো যেন দূরে সরে যায়। সেলফির বদৌলতে দূরের সবুজ বনায়নকে মনে হচ্ছে হাতের মুঠোয়!

কখনো কখনো চারপাশের মায়াময় প্রকৃতির ঘোরে আছন্ন হয়ে পড়ি, টনক ফিরে যখন কোনো এক চেংড়া পোলা অতি উচ্ছ্বাসে চলতি ট্রলার থেকেই ঝাঁপিয়ে পড়ে পানিতে। জুরাছড়ি যাওয়ার পথে নৈসর্গিক দৃশ্যের মাঝে ছোট ছোট দ্বীপে মানুষের বসত দেখে উচ্ছ্বাসে সবাই ছাউনিতে গিয়ে বসি। দুপুর গড়িয়ে প্রায় বিকেল, নিবেদিত প্রাণ তরুণদের পরিবেশনায় চলছে অনবরত খাবারের ধুম আর সুইট বয়’র কারিশমায় ১৩ মিশালি আইটেম মিশানো লিগার চায়ে চুমুক। আরো ছিল বাড়তি আনন্দ পেতে মাঝে মধ্যেই হেরে গলায় গান আর নাদুস-নুদুস দেহের আদিকালের নৃত্য। পড়ন্ত বিকেলে যেন আমরা নিজেরাই হারিয়ে যাই অসম্ভব সৌন্দর্যের মাঝে। মাঝিও ঠিক পথ চিনে উঠতে পারছিল না। অনেকেই চেঁচামেচি করলেও আমি থাকি নিশ্চুপ, ভাবি এইতো মোক্ষম সুযোগ! আহ কী মজা! ওর ভুলে না হয়ে আমরা ঘুরে দেখি আরো কিছুটা মায়াবিনী পানিপথ। বর্ষায় পাহাড়ের সৌন্দর্যই যেন অন্যরকম, আর শরতে প্রকৃতি নিজেকে মেলে ধরে ভিন্ন আমেজে। জুরাছড়ি যাওয়ার পুরোটা পথ এমন সৌন্দর্যের অবগাহন যে, যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজের মাখামাখি। কখনো কখনো মনে হয়েছিল নীল আসমানটা যেন নেমে আসছে দে-ছুটের দামালদের সাথে দোস্তি পাতাতে। শেষ বিকেলে গিয়ে পৌঁছাই বড়তলী ঘাটে। জাল পাতার কারণে ট্রলার আর সামনে এগুবে না, অগত্যা নেমে পড়ি।

ভাড়াখাটা বাইকে ছুটি থানা ভবনে। পথের দু-পাশে পাহাড়ের সারি মাঝে আঁকাবাঁকা পিচঢালা পথ কখনো মনে হবে এই বুঝি পথ ভুল করে হারিয়ে যাচ্ছি ঘন জঙ্গলের মাঝে। সে এক অসাধারণ ভালোলাগা প্রতিটি মুহূর্ত। দু-চোখে দেখার সুযোগ না হলে শুধু অনুভবে কারো বোঝার সাধ্য নেই জুরাছড়ির নয়নাভিরাম সৌন্দর্য। থানা ভবনে এস আই জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে সম্মুখীন হই ভিন্ন এক রোমাঞ্চকর পরিস্থিতির। শুরু হয় রাতযাপনের নতুন কাহিনি। সেই রাতের টানটান উত্তেজনা, মেঘের কোলে ঘুমানো আর রুদ্ধশ্বাসের অন্যরকম ভালোলাগার কাহিনি আজ না হয় তুলে রাখি আরেক দিনের জন্য। 

কীভাবে যাবেন

 

ঢাকা কমালাপুর ও গাবতলী থেকে রাতে বিভিন্ন পরিবহনের বাস ছেড়ে যায় রাঙ্গামাটি। ভাড়া নন এসি ৬২০ টাকা। ট্রলার ৩ দিনের জন্য নেবে ১০ থেকে ১১ হাজার টাকা। লঞ্চযোগেও যেতে পারেন রিজার্ভ বাজার থেকে। সকাল ৭টা ৩০ মিনিট থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত। ভাড়া জনপ্রতি ১৬০ থেকে ২০০ টাকা।

 

থাকা-খাওয়া

 

রাতে ট্রলারেই থাকতে হবে এমন প্রস্তুতি নিয়েই উঠতে হবে। আগেই বাজার-সদাই করে ট্রলারে উঠতে হবে। রান্নার আয়োজন ট্রলারেই সারতে হবে।

ছবি:দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ