সম্প্রতি ভারতে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল দেশটির ষষ্ঠদশ জাতীয় নির্বাচন, যাতে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। তবে এই নির্বাচনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল সোস্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইনের ব্যাপক ব্যবহার। আর সোস্যাল মিডিয়াতে নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী করার মাধ্যমেই নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি এত বড় জয় তুলে নিতে সমর্থ হয়েছে বলে জানাচ্ছেন বিশ্লেষকরা। এই নির্বাচনে সোস্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন নিয়ে জানাচ্ছেন মোজাহেদুল ইসলাম
বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়ে গেল দেশটির ষষ্ঠদশ লোকসভা নির্বাচন। আর এই নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ী হয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। নির্বাচনে বিজেপির পক্ষে জনমত তৈরি হওয়ায় যে বিষয়গুলো সবচেয়ে মূল ভূমিকা পালন করেছে বলে বিশ্লেষকরা জানাচ্ছেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো সোস্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন। ফেসবুক, টুইটারের মতো জনপ্রিয় সব সোস্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে সরব প্রচারণা এই নির্বচনে অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ধরা দিয়েছে। সোস্যাল মিডিয়াতে বিজেপি এবং নরেন্দ্র মোদীর পক্ষে প্রচারণা ছাড়িয়ে গিয়েছে অন্য সকল রাজনৈতিক দল এবং ব্যক্তিত্বকে। ভারতীয় জাতীয় নির্বাচনে সোস্যাল মিডিয়ায় প্রচারণা বা সোস্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন এই প্রথমবারের মতো ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করল।
সোস্যাল মিডিয়া প্রচারণায় ভারতীয় নির্বাচন
ভারতের ১৭০ মিলিয়ন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর মধ্যে ১০০ মিলিয়নই নিয়মিত সক্রিয়ভাবে ফেসবুক ব্যবহার করে থাকে। এদের বেশিরভাগই বয়সে তরুণ। ভারতে এর আগের কোনো নির্বাচনেই এত বেশিসংখ্যক প্রযুক্তি ব্যবহারকারী দেশটিতে ছিল না। এর আগে গত কয়েকবছরে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে আরব বসন্তের সময় এবং বাংলাদেশেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গে কার্যকর ভূমিকা পালন করে ফেসবুক। ভারতের নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর থেকে ফেসবুকে তরুণদের মধ্যে নির্বাচন উঠে আসে আলোচনায়। এ বছরে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার ঠিক পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ভারতে ফেসবুকে ‘ইলেকশন’ বা ‘নির্বাচন’ শব্দটির ব্যবহার বেড়েছে প্রায় ৫৬১%। ভারতীয় সংসদ ‘লোকসভা’র ব্যবহারও প্রায় আড়াই গুণ হয়ে যায় এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই। আর এর পর থেকে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট আলোচনা ফেসবুকে ছিল নিয়মিতভাবেই।
ফেসবুকের পাশাপাশি টুইটারও এখন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের অন্যতম হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর থেকেই টুইটারেও অন্যতম ট্রেন্ডে পরিণত হয় ভারতীয় নির্বাচন। এ সময়ে ভারতে টুইটারের সবচেয়ে জনপ্রিয় হ্যাশট্যাগগুলোর মধ্যে ছিল ‘#রেজাল্ট ২০১৪’, ‘#পিএমনমো’, ‘#ইলেকশন ২০১৪’, ‘#রেসটু২৭২’। বিজেপির এবারের নির্বাচনী স্লোগান ‘আব কি বার মোদী সরকার’ টুইটটিও টুইটারের অন্যতম জনপ্রিয় একটি টুইটে পরিণত হয়। চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ভারতীয় টুইটারে নির্বাচন সংক্রান্ত টুইট হয়েছে ৫৮ মিলিয়নেরও বেশি। এর মধ্যে ১১.৮৫ মিলিয়ন টুইট সরাসরি করা হয়েছে নরেন্দ্র মোদীর অফিশিয়াল টুইটার অ্যাকাউন্টে।
নির্বাচনের হাওয়া লাগে গুগল ইন্ডিয়ার গায়েও। নির্বাচনের দিনে তারা নিজেদের লোগোকে বদলে দেয় ভারতীয় নির্বাচনের একটি ডুডলে। ভোট গণনায় গুগল লাইভ ভোট কাউন্ট প্রদান করে। এর বাইরে নির্বাচনে হোয়াটসঅ্যাপকে নির্বাচনের খবর প্রচারণার জন্য ব্যবহার করেছে রাজনৈতিক দলগুলো। গুগলের সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম গুগল প্লাসের হ্যাংআউট ফিচার ব্যবহার করেও রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন স্থানের সাধারণ মানুষের সাথে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে যুক্ত হয়েছেন এই নির্বাচনে।
ফেসবুক-টুইটারে মোদীর জয়জয়কার
ফেসবুকে তরুণদের এই আগ্রহ ও প্রবণতাকে ভারতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্য থেকে প্রথমেই চিহ্নিত করতে সমর্থ হয় বিজেপি এবং বিশেষভাবে বললে নরেন্দ্র মোদী। ফলে ফেসবুক প্রচারণাতেও জোর দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেন তিনি। দলীয়ভাবেই সার্বিক প্রচারণার অংশ হিসেবে ফেসবুককেও অন্তর্ভুক্ত করে বিজেপি। বিজেপির পক্ষ থেকে ফেসবুকে ব্যাপক প্রচারণা এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে সহজেই আকৃষ্ট করতে সমর্থ হয়। বিজেপির পাশাপাশি ভারতের অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো প্রচলিত প্রচারণার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে সরব হয়ে ওঠে। গত কয়েকমাসে ফেসবুকে নরেন্দ্র মোদীর ফ্যানের সংখ্যা বেড়েছে বিপুল পরিমাণে। ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসে যেখানে মোদীর ফ্যান ছিল ৮ মিলিয়ন, চলতি বছরের মার্চের শুরুতেই তা ১১ মিলিয়ন অতিক্রম করে। নির্বাচন শুরু হতে হতে তার ফ্যান সংখ্যা দাঁড়ায় ১৪.৩ মিলিয়নে। এর ফলে ফেসবুকে বিশ্বব্যাপী যত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব রয়েছেন, তার মধ্যে এখন কেবল মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাই জনপ্রিয়তায় এগিয়ে রয়েছেন নরেন্দ্র মোদীর চাইতে।
বিজেপির ফেসবুকের প্রচারণায় প্রতিনিয়তই দলীয় বিভিন্ন খবর এবং ছবি উঠে এসেছে। এসব খবর এবং ছবিতে যেমন বিপুল পরিমাণ ‘লাইক’ পড়েছে, তেমনি এগুলো শেয়ারও করেছে প্রচুর ফেসবুক ব্যবহারকারী। ফেসবুকে বিজেপির অফিশিয়াল প্রচারণার সাথে ‘ইন্ডিয়া ২৭২+’ নামের একটি গ্রুপও কাজ করেছে। ভারতীয় নির্বাচনে ২৭২কে বলা হয় ম্যাজিক ফিগার। এই নির্বাচনে ২৭২টি আসন লাভ করলে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা যায়। ‘ইন্ডিয়া ২৭২+’ প্রচারণাও ভোটারদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলতে সমর্থ হয়েছে বলেই জানিয়েছেন ভারতীয়সহ আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা।
ফেসবুকের মতো টুইটারেও নরেন্দ্র মোদী এবং বিজেপির জনপ্রিয়তা ছিল প্রশ্নাতীত। নরেন্দ্র মোদীর অফিশিয়াল টুইটার অ্যকাউন্টটিই ছিল টুইটারে গত কয়েকমাসে ভারতে অন্যতম সক্রিয় টুইটার অ্যাকাউন্ট। টুইটার ইন্ডিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়, কেবল চলতি মে মাসের ১৬ তারিখের পর থেকেই নরেন্দ্র মোদীকে লক্ষ্য করে টুইট করা হয়েছে ৭ লাখের বেশি। আর ওই একদিনেই মোদীর অ্যাকাউন্টে ফলোয়ার বেড়েছে ১ লাখের বেশি। তার টুইটার অ্যকাউন্টে ফলোয়ারের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে ১.১৪ মিলিয়ন। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার বিজয়ের সংবাদ জানিয়েছে মোদীর অ্যাকাউন্ট থেকে অফিশিয়াল টুইট করা হয়, তা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি রিটুইট এবং ফেভারিট করা একটি টুইট।
সোস্যাল মিডিয়ার জয়
এবারের নির্বাচনে এই প্রথমবারের মতো সোস্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন প্রভাব বিস্তার করেছে ব্যাপকভাবে। প্রযুক্তির বিভিন্ন উপকরণে তরুণদের আগ্রহ বরাবরই বেশি হলেও এই নির্বাচনে সোস্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রচারণা দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে ভারতের প্রায় সব বয়সের মানুষেরই। ভারতের নির্বাচন পর্যবেক্ষক এবং বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের এই নির্বাচনের অন্যতম মূল নিয়ামক হয়ে উঠেছিল সোস্যাল মিডিয়াগুলো। আন্তর্জাতিক মহল থেকেও একই কথা বলা হচ্ছে। বিশ্বের বড় বড় সব পত্রিকাগুলোও এই নির্বাচনকে স্বীকৃতি দিয়েছে ভারতের প্রথম ‘সোস্যাল ইলেকশন’ হিসেবে।
এই নির্বাচনে বিপুল জয়ে নরেন্দ্র মোদী নিজে এক বক্তব্যে বলেন, ‘‘আমাদের দলীয় প্রচারণা, দল এবং ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজেও সোস্যাল মিডিয়া থেকে ব্যাপকভাবে সহায়তা পেয়েছি। তথ্য প্রচার ও প্রবাহে এগুলো সরাসরি কাজ করছে এবং স্থানীয় বিভিন্ন বিষয়ে জনমত জানার জন্য এই মাধ্যমগুলো কোনো ধরনের পক্ষপাত ছাড়াই কাজ করে যাচ্ছে।’ ভবিষ্যতে সোস্যাল মিডিয়ার ক্ষমতায়নের জন্য মোদী সরকার কাজ করবে বলেও জানান তিনি।
