পানির নিচে চলবে রোবট!

আপডেট : ২০ মে ২০১৪, ২২:২২
নদীমাতৃক বাংলাদেশে নৌপথের দিকে সকলের নজর অনেকটাই কম। নৌপথে প্রচুর পরিমাণে দুর্ঘটনাও নৈমিত্তিক। এসব দুর্ঘটনায় উদ্ধার কাজ পরিচালনা করার জন্য উপযোগী খুব বেশি কার্যকরী ডিভাইস আমাদের দেশে নেই বললেই চলে। অথচ দেশের বাইরে রিমোটলি অপারেটেড আন্ডারওয়াটার ভেহিকল (আরওভি), অটোমেটেড আন্ডারওয়াটার ভেহিকল (এইউভি) প্রভৃতি ডিভাইস নিয়ে প্রচুর কাজ হয়ে থাকে যেগুলো পানির নিচে বিভিন্ন ধরনের কাজের জন্য অত্যন্ত কার্যকরী। এ ধরনের প্রফেশনাল ডিভাইস কিনতে গেলে প্রচুর খরচও রয়েছে। সরকারিভাবেও তাই এই ধরনের ডিভাইস কেনা সম্ভব হয়ে ওঠে না। কম খরচে আমাদের দেশের জন্য উপযোগী এ ধরনের ডিভাইস কীভাবে বানানো যায়, সেই চিন্তা থেকেই কাজ শুরু করেন আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের (এআইইউবি) চার শিক্ষার্থী। পানির নিচে চলতে সক্ষম ‘টেক-ডুবুরি’ নামের স্বয়ংক্রিয় রোবট আলোর মুখ দেখে এই চার শিক্ষার্থীর হাত ধরেই। আবু ফাত্তাহ, প্রসূন বিশ্বাস, সজীব দাশ এবং মিরাজ মুস্তাকিম—এই চার তরুণের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়েছে দেশের এই প্রথম পানির নিচে চলমান রোবট। এআইইউবি’র ট্রিপলই বিভাগের শিক্ষার্থী এই চার তরুণ। তৃতীয় বর্ষেই তাদের মাথায় আসে এমন একটি রোবটের কথা। এর মধ্যে অনেকেই ড্রোন এবং রোবটিক্সের অন্যান্য ক্ষেত্রে কাজ শুরু করেছে। কিন্তু পানির নিচে এগুলোকে নিয়ে কীভাবে কাজ করানো যায়, তা নিয়ে দেশে কোনো কাজ হয়নি। ফাইনাল ইয়ারে এসে যখন থিসিস প্রকল্প নিয়ে কাজ করার সময় আসল, তখন এই চার তরুণ তাদের এই প্রকল্পটিকেই বেছে নেন। তাদের সুপারভাইজার ড. কামরুল হাসানের সাথে কথা বলে এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন তারা। আর তারপর থেকেই কাজ শুরু। কাজ করতে গিয়ে নানা ধরনের সীমাবদ্ধতায় পড়তে হয় এই গ্রুপের সদস্যদের। বিশেষ করে এই রোবটের বডি তৈরি করতে গিয়ে পড়েন বিরাট সমস্যায়। শুরুতে ধাতব বডি তৈরি করতে চাইলেও তাকে কোনোভাবেই পানিরোধী করতে পারছিলেন না। কিন্তু পানিরোধী না করা গেলে তো আর একে পানির নিচে ব্যবহার করা যাবে না। শেষ পর্যন্ত ধোলাইখালে যোগাযোগ করে পিভিসি’র মাধ্যমে তৈরি করা হয় এই রোবটের বডি। এমন আরও অনেক ধরনের সীমাবদ্ধতাতে অতিক্রম করেই তৈরি করা হয় রোবটটি। এই রোবটের নির্মাণ প্রসঙ্গে আবু ফাত্তাহ বলেন, ‘বিদেশে এই ধরনের একটি প্রজেক্টের জন্য সাধারণত ১৫০০ থেকে ২০০০ ডলার বাজেট বরাদ্দ থাকে। কিন্তু আমাদের কোনো বাজেট বরাদ্দ ছিল না। আমাদের নিজেদের পকেটের টাকা খরচ করে কাজ করতে হয়েছে। তাছাড়া আমাদের নিজেদের দেশে ব্যবহারের উপযোগী করে একে গড়ে তোলার জন্যও এর খরচ যতটাসম্ভব কম রাখার চেষ্টা ছিল আমাদের। শেষ পর্যন্ত এর পেছনে আমাদের ব্যয় করতে হয়েছে ৪০ হাজার টাকা। প্রাথমিক তৈরিতে অবশ্য খরচ অনেক বেশি লেগেছে, কারণ এর পেছনে আমাদের অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয়েছে। তবে এখন আমাদের এমন একটি রোবট বানিয়ে দিতে বললে সেটা ৪০ হাজার টাকার মধ্যেই সম্ভব।’ গ্রুপের সদস্যরা জানান এর মাধ্যমে নানা ধরনের কাজই করা সম্ভব। তেল ও গ্যাস শিল্পে, উদ্ধার কাজে, পানির নিচে নানা ধরনের পর্যবেক্ষণে এর ব্যবহার সম্ভব। এতে রয়েছে বেশ কয়েকটি সেন্সর এবং ক্যামেরা। ফলে পানির নিচ থেকে ছবিও তুলে পাঠাতে পারবে এটি। তাছাড়া সেন্সর ব্যবহার করে পানির নিচে তাপমাত্রা পরিমাপসহ আরও বেশকিছু রিডিং নেওয়াও সম্ভব। চাইলে এতে বাড়তি রোবটিক হাত লাগিয়ে নিলে পানির নিচ থেকে বিভিন্ন ধরনের স্যাম্পল সংগ্রহ করাও সম্ভব হবে বলে জানান তারা। তাদের মতে, একে নানা ধরনের কাজেই ব্যবহার করা সম্ভব। তবে এটি এখনও একটি প্রাথমিক পর্যায়ের রোবট হিসেবেই কাজ করবে। প্রফেশনাল ধরনের ডিভাইস তৈরি করতে চাইলে এর মৌলিক কাঠামো ব্যবহার করেই তাতে প্রচুর বৈচিত্র্যময় ফিচার যুক্ত করা সম্ভব। তবে তার জন্য প্রয়োজন বিনিয়োগ। এই তরুণরা জানান, তারা দেশের জন্য উপযোগী নানা ধরনের কাজ করতে চান। তার জন্য সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে তাদের। মেধার অভাব নেই আমাদের দেশে। দরকার তাদের সদ্ব্যাবহার করা। কথাপ্রসঙ্গে তাদের একজন বলেন, ‘আমাদের দেশে যে লিফট ব্যবহার করা হয়ে থাকে, সেগুলো সবই বাইরে থেকে আমদানি করা। অথচ চাইলে এগুলো আমরা দেশেই তৈরি করতে পারি। প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ আর সুবিধা দিলে আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরাই অনেক কম খরচে এমন লিফট তৈরি করে দিতে পারে। শুধু দেশের শিক্ষার্থীদের উপর বিশ্বাস রাখতে হবে এবং তাদের সুযোগ দিতে হবে।’ এই তরুণরা আত্মবিশ্বাসী তারা দেশের জন্য অনেক বড় কিছু করতে পারবে। আপাতত এই গ্রুপের দুইজন চাকরিতে যোগ দিলেও দুইজন চেষ্টা করছেন উচ্চশিক্ষা অর্জন করতে দেশের বাইরে যাওয়ার। বিশেষ করে এই টেক-ডুবুরিকে আরও উন্নত করতেও তাদের প্রয়োজন উচ্চশিক্ষা। সেটি অর্জন করতে পারলেই হয়ত তারা আরও ভালো কিছু দেখাতে পারবেন। তরিকুর রহমান সজীব