পৃথিবীর সবচেয়ে আলোড়িত ঘটনা মেরাজ

আপডেট : ২২ মে ২০১৪, ২০:৪৮
‘কুন ফা ইয়াকুন’ তথা মহান আল্লাহ্র- ‘ইচ্ছা বা চাওয়া ও হওয়া’ একই সূত্রে গাঁথা। এরই অনুপম নিদর্শন মহান রাব্বুল আ’লামিন এবং রাহমাতুললিল আ’লামিনের মধ্যে একান্ত সাক্ষাত্ ও সংলাপ। পবিত্র কুরআনে এ ঘটনাটিকে ‘ইসরা’ বলা হলেও হাদীসের আলোচনায় তা পরিচিত ‘মেরাজ’ হিসেবে এবং তা বহুল প্রচলিত ইসলামি পরিভাষা। প্রিয়নবী (স.) এর জীবনের সবচেয়ে আলোচিত আলোড়িত, আলোকিত অবাক বিস্ময়কর ঘটনা মেরাজ। মেরাজ আরবি শব্দ, অর্থ সোপান, সিড়ি বা উর্ধ্ব গমন ইত্যাদি। প্রিয়নবী (স.) এর নিমেষে ‘মাসিজদুল হারাম’ থেকে ‘মাসিজদুল আক্সা’ হয়ে উর্ধ্বাকাশে স্বশরীরে জাগ্রতাবস্থায় ভ্রমন, মহান আল্লাহর নৈকট্যলাভ, সাক্ষাত্ ও সংলাপকে মেরাজ বলে। ৬২০ খ্রিঃ এর ২৭ রজব রাতে বেহেশিত বাহন ‘বুরাকে’র সাহায্যে মেরাজের ঘটনায় প্রিয়নবী (স.) জান্নাত-জাহান্নাম পরিদর্শনসহ আল্লাহ্র দেওয়া বিশেষ মর্যাদায় অভিষিক্ত হন। মেরাজের ঘটনা প্রবাহ ভক্তিবাদীদের জন্য শিক্ষণীয় আলেখ্য। নবুওয়্যাতের দশম বার্ষিকীতে বা হিজরতের এক বছর আগে মেরাজ সংগঠিত হয়। এ সময় স্বজনহারার বেদনায় প্রিয়নবী (স.) ব্যাকুল ও বেদনা-বিধুর। প্রিয়তমা স্ত্রী খাদিজা (রা.) ও চাচা আবু তালেবের মৃত্যুতে প্রিয়নবী (স.) তখন অনেকটাই আশ্রয়হীন বা অভিভাবকশূন্য আর ইসলাম প্রচারের শঙ্কায় স্থবির ও অস্থির। তখনই তিনি মহাপ্রভুর ডাকে ‘আরশে আজীমে’ উপনীত হন এবং এতে ইসলাম লাভ করে নতুন গতি ও নির্দেশনা। মেরাজে প্রিয়নবী (স.) নুরের রাজ্যে প্রবেশ করেন এবং সত্তর হাজার নুরের পর্দা অপসারিত হয়— তখন মহান রাব্বুল আ’লামিন ও রাহ্মাতুলিলল আ’লামিনের সাক্ষাত্ হয়। মহান আল্লাহ্র সঙ্গে প্রিয়নবী (স.) এর সংলাপের ‘স্মারকভাষা’ নামাযে পঠীত “আত্তাহিয়্যাতু...” যা মহান আল্লাহ্র প্রশংসা ও প্রিয়নবী (স.) এর প্রতি প্রশান্তি-প্রসস্তির সমন্বিত উচ্চারণ। মেরাজের মাধ্যমে প্রিয়নবী (স.) উম্মতের জন্য উপহার হিসেবে নিয়ে আসেন নামায— “নামায মু’মিনের জন্য মেরাজ স্বরূপ”। মেরাজে ফলে নতুন দিকনির্দেশনা, নতুন উপলব্ধিতে ইসলাম প্রচারে গতি জড়তার অবসান হয়। এতে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে যায়। এ ঘটনাকে বিনাবাক্য ব্যয়ে সমর্থন করায় আবুবকর (রা.) ‘সিদ্দিক’ বা ‘মহা সত্যবাদী’ উপাধি লাভ করেন। মহান আল্লাহ্র সান্নিধ্য ও গুপ্তজ্ঞান আর রহস্যময়তায় মেরাজ হলো প্রিয়নবী (স.) এর অনন্য সাধারণ মু’জিজা। আবার তা কিন্তু গতিবিদ্যা ও মহাকাশ গবেষণার পথিকৃত। প্রিয়নবী (স.) এর মেরাজ স্বশরীরে জাগ্রত অবস্থায় হয়ে ছিল— এ জন্যই এত বিস্ময় ও তত্ত্বগত বিতর্ক। অথচ আলকুরআনের অসংখ্য আয়াত মেরাজ স্বশরীরে হওয়ার স্বপক্ষে প্রমাণ। সূরা বানী ইসরাইলের শুরুতে মহান আল্লাহ্ বলেন “সেই মহিমান্বত সত্ত্বার জন্যই সব প্রশংসা ও পবিত্রতা যিনি তার বান্দাকে রজনীতে মাসিজদুল হারাম থেকে মাসিজদুল আক্সা পর্যন্ত পরিভ্রমন করিয়েছেন”। আয়াতে বলা হয়েছে “যেন আমার নিদর্শনসমূহ দেখাই”। সুতরাং আল্লাহ্ দেখিয়েছেন আর নবীজী স্বচক্ষে-স্বশরীরে তা দেখেছেন। সূরা নজমের ০৯—১৪ নম্বর আয়াত স্বশরীরে মেরাজে স্বপক্ষে জোড়াল প্রমাণ “তাঁরা তীর ধনুকের চেয়েও কাছাকাছি হয়ে ছিলেন...তা হয়ে ছিল ‘সিদ্রাতুল মুন্তাহা’য়”। সত্যকথা হলো ‘সিদ্রাতুল মুন্তাহা’ সপ্তম আকাশে অবস্থিত। এছাড়াও অসংখ্য সাহাবীর নির্ভরযোগ্য বর্ণনায় প্রমাণিত যে, মেরাজ স্বপ্নযোগে নয় বরং স্বশরীরেই হয়ে ছিল। মি’রজের বাহনের নাম ‘বুরাক’ যা আরবি ‘বারকুন’ শব্দ থেকে বিকশিত, অর্থ বিদ্যুত্। এতেই বোঝা যায় বুরাকের গতি ছিল বিদ্যুতের চেয়ে বেশি। আর আলোর গতি সেকেন্ডে ১৮৬০০০ মাইল। পার্থিব ও অপার্থিব সময়ের পার্থক্য বোঝাতে আইনস্টাইন বলেছেন— “মনে করুন একটি ফাঁপা চোঙের ভেতর একটা মানুষ পুরে আলোকের বিশ সহস্রাংশের একভাগ গতিতে উর্ধ্বে ছুড়ে দেওয়া হলো। এক বছর চলবার পর চোঙটি (চোঙ্গা) কোন তারকার আকর্ষণে পড়ে এবং ধমকেতুর মত সে যদি তাকে একবার ঘুরিয়ে এনে পুনরায় সে দিকে পৃথিবীতে নামিয়ে দেয় তবে লোকটি চোঙটি হতে নেমে দেখবে তার বয়স মাত্র দুই বছর বেড়েছে কিন্তু ইত্যবসরে পৃথিবীর দুইশত বত্সর অতিবাহিত হয়েছে...সেই অপার্থিব জগতে সময় বহে না, মহাকর্ষ নীচের দিকে টেনে নামায় না” (Easy lesson of Einstein )। (সংক্ষেপিত) লেখক : অধ্যাপক, ইস. স্টাডিজ বিভাগ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, গাজীপুর