স ং ক টে ক ং গ্রে স
শিফারুল শেখ
১৯৪৭ সালের স্বাধীনতার পর প্রথম লোকসভা নির্বাচনে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস ৪৮৯টি আসনের মধ্যে একাই ৩৬৪টি এবং পপুলার ভোটের ৪৫ ভাগ ভোট পেয়েছিল দলটি। ১৯৭১ সালেও ভূমিধস জয়, ১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধী আততায়ীর হাতে নিহত হওয়ার পর রাজীব গান্ধীর কংগ্রেস ৪১৫টি আসন পেয়েছিল। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের কাছ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ইন্দিরা গান্ধী দুর্গা উপাধি পেয়েছিলেন। সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্বেও কংগ্রেস ভারত শাসন করেছে। আজ সেই নেহেরু-গান্ধী পরিবারের উত্তরসূরি রাহুলের নেতৃত্বের ব্যর্থতায় সমালোচনার ঝড় উঠেছে। প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে রাজনীতির মাঠে নামানোর পরও নরেন্দ মোদির ভাবমূর্তিকে সামান্যতম টলানো যায়নি। বরং ২০১৪ সালের চেয়ে বেড়েছে। বেড়েছে মোদির দল বিজেপির আসন সংখ্যাও। এমন পরিস্থিতিতে সংকটে পড়েছে নেহেরু-গান্ধী পরিবার এবং তাদের দল কংগ্রেস পড়েছে মহাবিপাকে।
মোদির কাছে নতি স্বীকার গান্ধী পরিবারের!: কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট রাহুল গান্ধী ভারতের প্রভাবশালী নেহেরু-গান্ধী পরিবারের উত্তরাধিকারী। স্বাধীন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের একেবারে কেন্দ স্থলে অবস্থান এই পরিবারটির। রাহুল গান্ধীর প্রপিতামহ জওহরলাল নেহেরু ছিলেন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। তার দাদি ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। আর পিতা রাজীব গান্ধী ছিলেন ভারতের তরুণতম প্রধানমন্ত্রী। রাহুল সবচেয়ে বেশি সমালোচনার মুখে পড়েছেন উত্তরপ্রদেশের আমেথির আসনটি বিজেপির স্মৃতি ইরানির কাছে হারিয়ে। এই আসন থেকে ইন্দিরা, রাজীব ও সোনিয়া সবাই জিতেছিলেন। এমনকি রাহুল নিজেও গত ১৫ বছর ধরে ওই আসনে জিতে আসছিলেন। তাই আমেথিতে রাহুলের হেরে যাওয়া বিরাট অপমান।
কংগ্রেস নেতারা হারের জন্য সরাসরি রাহুলকে দোষ না দিলেও আড়ালে স্বীকার করছেন, মোদির জনসম্মোহনী ব্যক্তিত্বের কাছে হেরে গেছেন রাহুল। তাদের মতে, কংগ্রেসের সামনে বড় বাধা ‘ব্র্যান্ড মোদি’। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদি তার অঙ্গীকার পূরণ করতে ব্যর্থ হলেও মানুষ তার প্রতিই আস্থা রেখেছে। সমালোচকরা বলছেন, রাহুল গান্ধীর আকর্ষণী শক্তি নেই, লোকজনের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে পারেন না, দিকভ্রান্ত, প্রায়ই রাজনৈতিক ভুল করেন। মোদি অনেকবার বলেছেন, রাহুল গান্ধী এ অবস্থানে নিজের যোগ্যতায় নয়, পরিবারের কারণে এসেছেন।
নেহেরু-গান্ধী পরিবার থেকে ভারত তিনজন প্রধানমন্ত্রী পেয়েছে। কিন্তু সেই পরিবারের ঐতিহ্য এখন কিছুটা হলেও ম্লান হয়েছে। এই যুগে ভারতের উচ্চাভিলাষী তরুণদের কাছে জওহরলাল নেহেরু ও ইন্দিরা গান্ধী আর প্রাসঙ্গিক নন, তাদের অবদান অনেক দূর ইতিহাস মাত্র। বর্তমান প্রজন্মের কাছে বরং কংগ্রেসের ২০০৪-২০১৪ শাসনামলের বিতর্ক-দুর্নীতিই মুখ্য বিষয়।
কংগ্রেস কী পূর্বের শক্তি ফিরে পাবে?: কংগ্রেসের নেতৃত্ব মূলত গড়ে উঠেছে পারিবারিক ঐতিহ্যে। ফলে এখানে নতুন নেতৃত্ব নেই বললেই চলে। দেশের মানুষ নেহেরু-গান্ধী পরিবারের বাইরের কাউকে মানতেও পারে না। বাইরের কেউ নেতৃত্বে আসলে দলের মধ্যে বিশৃঙ্খলাও সৃষ্টির আশঙ্কা আছে। তাই রাহুল গান্ধী যতোই ব্যর্থ হোন না কেন তাকে বাদ দিয়ে দল চালানো খুব সহজ হবে না বলে কংগ্রেস নেতাদের অভিমত। নেতারা বলছেন, রাহুল ব্যর্থ না সফল তার চেয়ে বড় প্রশ্ন, তিনি চলে গেলে দলের হালটা ধরবেন কে? এক হতে পারেন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। কিন্তু তিনি কখনোই ভাইকে হটিয়ে এই পদে বসবেন না। ফলে প্রশ্ন উঠেছে তাহলে কংগ্রেসের অবস্থা দিনে দিনে আরো শোচনীয় হবে? নির্বাচনের ফল যতোই খারাপ হোক, রাহুলের পাশে কংগ্রেস নেতারা। কারণ কেবল রাহুল নয়, অনেকেই তো হেরেছেন। তাইতো রাহুল পদত্যাগের প্রস্তাব দিলেও দল সেটি প্রত্যাখ্যান করেছে।
আশাবাদীদের মতে, ১৯৮৪ সালে বর্তমানে একাই ৩০৩ আসন পাওয়া বিজেপি মাত্র দুটি আসন পেয়েছিল। তারা যদি ঘুরে দাঁড়াতে পারে তাহলে কংগ্রেস (বর্তমানে ৫৪২ আসনের মধ্যে ৫২ আসন পাওয়া) কেন পারবে না। কেউ কেউ বলছেন, রাহুলের দরকার একজন অমিত শাহ যিনি কৌশলের মাধ্যমে দলকে এগিয়ে নিয়ে যান এবং নির্বাচনী প্রচারণা চালান। রাহুলও ফলাফল পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ভীত কিংবা হতাশ হওয়ার কিছু নেই, এখনো অনেক জনগণ আমাদের সঙ্গে আছেন। তাদের সঙ্গে নিয়েই আবার ঘুরে দাঁড়াতে হবে।
