অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘটের দ্বিতীয় দিন গতকাল সোমবারও রাজশাহী বিভাগের ৮ জেলার সঙ্গে সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। বিভাগীয় পরিবহন (বাস-ট্রাক) মালিক-শ্রমিক ঐক্যপরিষদ ৬ দফা দাবিতে গত রবিবার ভোর ৬টা থেকে এই ধর্মঘট শুরু করে। পরিবহন ধর্মঘটের কারণে বিভাগজুড়ে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। ধর্মঘট চলাকালে গাড়ি বের করায় রাজশাহী শহরে শ্রমিকরা একটি ভটভটি ও একটি পাওয়ার ট্রলিতে অগ্নিসংযোগ করে। তারা আরও অন্তত ১০টি ভটভটি, একটি ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান ভাংচুর করে। এদিকে সাত দফা দাবিতে আজ থেকে বৃহত্তর ময়মনসিংহের জেলাগুলোসহ আরো আট জেলায় পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে ঢাকা বিভাগীয় উত্তরাঞ্চলীয় মালিক-শ্রমিক ঐক্যপরিষদ।
রাজশাহী অফিস জানায়, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গতকাল বিকাল সাড়ে ৩টায় রাজশাহী জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে বিভাগীয় কমিশনার হেলালুদ্দীন আহমদের সভাপতিত্বে ধর্মঘটরত বিভাগীয় পরিবহন নেতৃবৃন্দের সঙ্গে প্রশাসনের জরুরি বৈঠক হয়। সন্ধ্যায় বৈঠক থেকে বেরিয়ে বিভাগীয় পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্যপরিষদের আহবায়ক অধ্যাপক মনজুর রহমান পিটার ইত্তেফাককে বলেন, ধর্মঘট চলবে। বৈঠকে প্রশাসনের কর্মকর্তারা মালিক-শ্রমিকদের ৬ দফা বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছেন। জবাবে আমরা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বলেছি, আপনারা আগে ৬ দফা বাস্তবায়ন করুন, তারপর আমরা নিজেরা বসে চলমান ধর্মঘট প্রত্যাহার করবো।’
অন্যদিকে রাজশাহীর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরা বৈঠকে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের ৬ দফা বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছি। সে লক্ষ্যে রাজশাহীসহ বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ইতোমধ্যে কাজও শুরু হয়ে গেছে। বিশেষ করে প্রধান দাবি, নছিমন, করিমন, ভটভটিসহ সকল অবৈধ যান চলাচল বন্ধের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বৈঠক শেষে পরিবহন মালিক-শ্রমিক নেতৃবৃন্দ কোনো ঘোষণা না দিলেও আমরা আশা করছি, তারা অতিদ্রুত পরিবহন ধর্মঘট প্রত্যাহারের মত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবেন।’ তবে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত চলমান পরিবহন ধর্মঘট অবসানের কোন সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন রাজশাহী জেলা পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি কামাল হোসেন রবি।
জানা গেছে, পরিবহন ধর্মঘটের কারণে সোমবার দ্বিতীয় দিনের মত রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও জয়পুরহাট জেলার সঙ্গে সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। ধর্মঘটের সঙ্গে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি, স্বায়ত্বশাসিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের যানবাহন যুক্ত হওয়ায় জনদুর্ভোগের পাশাপাশি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। এছাড়া পরিবহন সংকটে চরম দুর্ভোগে পড়েন রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন রুটের সাধারণ যাত্রীরা। তবে ট্রেন চলাচল করলেও অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে টিকেট পাওয়া যাচ্ছে না।
রংপুর বিভাগের আট জেলার পরিবহন চলাচলে বাধা
রংপুর প্রতিনিধি জানান, পরিবহন ধর্মঘটের কারণে রংপুর বিভাগ থেকে ঢাকাগামী কোন বাস চলাচল করতে পারছে না। বিভাগীয় মোটর শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আকতার হোসেন বাদল জানান, রাজশাহী বিভাগের ৮ জেলায় ধর্মঘটের কারণে রংপুর বিভাগের ৮ জেলার ঢাকাগামী পরিবহনগুলো বগুড়ার উপর দিয়ে যেতে বাধা দেয়া হচ্ছে। এর ফলে এখানকার কোন পরিবহন ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়নি। জেলাগুলো হলো: রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও ও নীলফামারী। তিনি আরো জানান, রাজশাহী মোটর শ্রমিকরা তাদের দাবিসমূহ আদায়ে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে, আমরা নই।
এদিকে বাস না পাওয়ায় ট্রেনের ওপর চাপ পড়েছে শতগুণ। গতকাল সোমবার রংপুর রেলস্টেশনে ট্রেনের টিকিট না পেয়ে যাত্রীদের সাথে কালোবাজারে টিকিট বিক্রেতাদের সাথে হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। কর্তৃপক্ষ যাত্রীদের চাপ সামলাতে না পেরে টিকিট কাউন্টার বন্ধ করে দিয়েছে।
রেলস্টেশনের ভারপ্রাপ্ত সুপার মোজাম্মেল হোসেন জানান, টিকিট যা ছিল তা সকালেই বিক্রি হয়ে গেছে। টিকিট নেই এই বিষয়টি যাত্রীরা বুঝতে চায় না। তাই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে।
আরো ৮ জেলায় আজ থেকে পরিবহন ধর্মঘট
ময়মনসিংহ প্রতিনিধি জানান, ঢাকা বিভাগীয় উত্তরাঞ্চলীয় মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের আহ্বানে আজ মঙ্গলবার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ৮ জেলায় পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দেয়া হয়েছে। গতকাল সোমবার বিকালে ময়মনসিংহ জেলা মোটর মালিক সমিতির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে উত্তরাঞ্চলীয় মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক মো. আমিনুল হক শামীম এ ঘোষণা দেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, জামালপুর, শেরপুর, কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল, গাজীপুর ও ঢাকা উত্তরাঞ্চল এ ধর্মঘটের আওতায় থাকবে। সংবাদ সম্মেলনে নেত্রকোনা জেলা প্রশাসককে প্রত্যাহার, মহাসড়কে রেজিস্ট্রেশন বিহীন অবৈধ যানবাহন চলাচল বন্ধ, পুলিশি চাঁদাবাজি, মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের চুক্তি বাস্তবায়নসহ ৭ দফা দাবি জানানো হয়।
এ সময় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সহসভাপতি ছাদিকুর রহমান হিরু, মহাখালী মালিক সমিতির সভাপতি হাজী আবুল কালাম, ময়মনসিংহ মালিক সমিতির সভাপতি মমতাজ উদ্দিনসহ ৮ জেলার মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
