বিভিন্ন তদ্বিরের জোরে গ্রামের কলেজ শূন্য করে রাজধানী ও বিভাগীয় শহরের কলেজগুলোতে বদলি বা সংযুক্তি (শিক্ষা অধিদপ্তরের নির্দেশে কোন কলেজে যুক্ত থাকা) নিয়ে চলে আসছেন শিক্ষকরা। মূলত শহরে থাকার জন্যই তারা এই কাজ করছেন। এ কারণে গ্রামের কলেজগুলোতে শিক্ষকের অভাবে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মক ভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দেশের সরকারি কলেজের এই চিত্রে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন অধ্যক্ষ-শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
জানা গেছে, রাজধানীর ইডেন কলেজে শিক্ষকের পদ আছে ২১৭টি। কলেজেটিতে এখনো শিক্ষকের ২২টি পদ অফিসিয়ালি শূন্য থাকলেও বাস্তবে কলেজটিতে শিক্ষক রয়েছেন প্রায় তিনশ। ২২টি বিষয় থাকা এই কলেজের প্রায় প্রতিটি বিভাগেই রয়েছেন অতিরিক্ত শিক্ষক। এই অতিরিক্ত শিক্ষকরা রয়েছেন ‘সংযুক্তি’ হয়ে। কেউ টাকা খরচ করে, কেউ রাজনৈতিক বিবেচনায়, কেউ বা শিক্ষা অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের স্বজন হওয়ার জোরে শুধু রাজধানীতে থাকার আশায় এভাবে এই কলেজে এসে ভিড় করেছেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ইডেন কলেজে প্রায়শই যোগ দিচ্ছেন নতুন নতুন শিক্ষক। ‘সংযুক্তি’ নিয়ে এইসব শিক্ষক কলেজে বদলি হয়ে আসছেন; কিন্তু গ্রামের কলেজ শূন্য করে পদের বাইরে এভাবে শিক্ষক থাকার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কলেজের প্রাক্তন এক অধ্যক্ষ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা চাই না গ্রামের কলেজ শূন্য করে শিক্ষকরা এখানে থাকবে। গ্রামে কোন কোন বিষয়ে শিক্ষকই থাকে না। সেখানে শিক্ষার্থী ও অধ্যক্ষরা বিপাকে পড়েন। সরকারের উচিত এ বিষয়ে নজর দেয়া।
বর্তমান অধ্যক্ষ অধ্যাপক হোসনে আরা বলেন, প্রতিদিন নতুন শিক্ষক আসছেন, আবার যাচ্ছেনও। এই হিসাব রাখাও কঠিন। ইডেনে এত সংখ্যক শিক্ষক থাকার পরও গত মার্চে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে একজন অধ্যাপককে (ব্যবস্থাপনা) বদলি এবং নারায়ণগঞ্জের তোলারাম কলেজ থেকে দর্শনের একজন সহকারী অধ্যাপককে ‘সংযুক্তি’ করে আনা হয়েছে বলে তিনি জানান।
অন্যদিকে গ্রামের চিত্র ঠিক এর উল্টো। সংশ্লিষ্টরা জানান, গ্রামের কোন একটি কলেজে হয়তো ইংরেজি বিষয়ে একজন শিক্ষক আছেন। শিক্ষা অধিদপ্তর ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় ওই শিক্ষককেই বদলি করে ঢাকায় নিয়ে আসেন। ওই শিক্ষক না থাকায় ওই কলেজে শিক্ষা কার্যক্রম কীভাবে চলবে- এ নিয়ে মোটেই ভাবেন না শিক্ষা প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিরা। শিক্ষা অধিপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পেও শিক্ষকদের সংযুক্ত করে নিয়ে এসে গ্রামের কলেজগুলো শিক্ষক শূন্য করে ফেলা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গ্রামের কয়েকটি কলেজের চিত্র পর্যালোচনা করলেই এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। সূত্র মতে, ভোলা সরকারি কলেজে শিক্ষক থাকার কথা ৮৯ জন; কিন্তু কর্মরত আছেন মাত্র ৪২ জন। অথচ শিক্ষার্থী ৬ হাজারেরও বেশি। জেলা পর্যায়ের এই কলেজটিতে ১৬টি বিষয়ে অনার্স, ১৩টি বিষয়ে মাস্টার্স, এইচএসসি ও ডিগ্রি শ্রেণি রয়েছে। মৃত্তিকা বিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর কোর্স রয়েছে; কিন্তু এই বিষয়ে মাত্র একজন প্রভাষক রয়েছেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ৪ জন শিক্ষক থাকার কথা, আছেন ১ জন। কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক পারভীন আক্তার বলেন, শিক্ষক না থাকায় বিপাকে পড়তে হয়। কিভাবে কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করবো এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।
ভোলার আর একটি কলেজ শাহবাজপুর সরকারি কলেজ। এখানে শিক্ষকের পদ ২৯টি; কিন্তু কর্মরত আছেন মাত্র ১০ জন। শিক্ষার্থীরা রসায়ন পড়ছেন। অথচ ৭ বছর ধরে এ বিষয়ে কোন শিক্ষক নেই। এছাড়া পদার্থ, গণিত, মার্কেটিং ও ইতিহাস বিষয়েও কোনো শিক্ষক নেই। অর্থনীতি ও একাউন্টিংয়ে একজন করে শিক্ষক থাকলেও অতিসম্প্রতি তারা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আদেশ বলে ‘সংযুক্তি’ নিয়ে বরিশাল বি এম কলেজে রয়েছেন। এক সময় এ প্রতিষ্ঠানটিতে সহস্রাধিক শিক্ষার্থী থাকলেও শিক্ষক না থাকায় বর্তমানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে।
পিরোজপুর জেলার ভাণ্ডারিয়া সরকারি কলেজে শিক্ষক থাকার কথা ৩৩ জন। কিন্তু ১২টি বিভাগে শিক্ষক আছেন মাত্র ১৫ জন। প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ শাহআলম হাওলাদার বলেন, দীর্ঘ চাকরি জীবনে বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন কলেজে চাকরি করেছি। প্রতিটি কলেজেই শিক্ষক সংকট দেখেছি। একই জেলার মঠবাড়িয়া সরকারি কলেজের ইংরেজি, যুক্তিবিদ্যা, ইতিহাস, ব্যবস্থাপনা, উদ্ভিদ বিজ্ঞান ও অর্থনীতিতে ৩ জন করে শিক্ষক থাকার কথা। আছেন ১ জন করে। এছাড়া পরিসংখ্যান, রসায়ন, পদার্থে একজনও শিক্ষক নেই। এলপিআরে থাকা অধ্যক্ষ প্রফেসর নির্মলেন্দু শিল বলেন, এভাবে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন। রাজধানীর একটি সরকারি কলেজের নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেখানে একটি বিভাগে ৭ জন শিক্ষক থাকার কথা, আছেন ১৪ জন। গ্রামের কলেজ থেকেই এই শিক্ষকদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
পটুয়াখালি সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষক সংকট রয়েছে। পদার্থ বিজ্ঞানে মাত্র ১ জন শিক্ষক রয়েছেন। আগামী মাসে তিনি আবার চার মাসের ‘ফাউন্ডেশন ট্রেনিং’ নেয়ার জন্য যাবেন। কলেজের অধ্যক্ষ বলেন, শিক্ষক না থাকায় নানা ভোগান্তির মধ্য দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে।
এদিকে গত ২১ মে পিরোজপুর সরকারি মহিলা কলেজ থেকে ইংরেজি বিভাগের প্রভাষককে ঢাকায় সদ্য চালু হওয়া ভাসানটেক সরকারি মহাবিদ্যালয়ে নিয়ে আসা হয়েছে। ফলে ওই কলেজের ইংরেজি বিভাগে শিক্ষা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর আগে ব্যবস্থাপনায় একজন শিক্ষক থাকলেও তাকেও মানিকগঞ্জের একটি কলেজে বদলি করে শিক্ষা অধিদপ্তর। কলেজ কর্তৃপক্ষের শত অনুরোধেও কান দেয়নি অধিদপ্তর। ফলে পিরোজপুরের ওই কলেজে ব্যবস্থাপনায় আর ক্লাস হচ্ছে না। ইসলামের ইতিহাসে একজন শিক্ষক থাকলেও কলেজে পদার্থ, উদ্ভিদ বিদ্যা ও গণিতে কোনো শিক্ষক নেই। কলেজের ২৮ জন শিক্ষকের মধ্যে ১৪ জনই নেই। কলেজের অধ্যক্ষ আলতাব হোসেন মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা অধিদপ্তরের এমন অব্যবস্থাপনায় রীতিমতো ক্ষুব্ধ। তিনি বলেন, দ্রুত যেসব বিভাগে শিক্ষক নেই সেখানে শিক্ষক না দেয়া হলে বিপাকে পড়বে শিক্ষার্থীরা।
মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর- মাউশির তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগে ২৫৭টি কলেজ রয়েছে। এর মধ্যে ২২টি সরকারি কলেজ। এর মধ্যে পিরোজপুর সরকারি মহিলা কলেজে ১১, মঠবাড়িয়া সরকারি কলেজে ১৮, ঝালকাঠি সরকারি কলেজে ১৬, সোহরাওয়ার্দী সরকারি কলেজে ১৮, স্বরূপকাঠী সরকারি কলেজে ২০, বরগুনা সরকারি কলেজে ৭, ভোলা সরকারি কলেজে ২০, ব্রজমোহন (বিএম) সরকারি কলেজে ১৬, বরিশাল সরকারি মহিলা কলেজে ১, বরিশাল সরকারি কলেজে ১০, হাতেম আলী সরকারি কলেজে ৭, বাকেরগঞ্জ সরকারি কলেজে ৮, চাখার ফজলুল হক সরকারি কলেজে ১৬, শাহ্বাজপুর সরকারি কলেজে ৬, পটুয়াখালি সরকারি কলেজে ৬ এবং গৌরনদী সরকারি কলেজে ১৫টি শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে খবর নিয়ে দেখা গেছে, শূন্য পদের সংখ্যা আরো বেশি।
মাউশির তথ্যে দেখা যায়, বরিশাল বিএম কলেজে ১৬টি পদ শূন্য রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কলেজে শিক্ষকের ৩৩টি পদ শূন্য রয়েছে। মাউশি বলছে, বরিশাল হাতেম আলী কলেজে ৭টি পদ শূন্য আছে, কিন্তু ওই কলেজে শূন্য আছে ২০টি শিক্ষকের পদ। এদিকে বরিশাল বিভাগীয় শহরের ৪টি কলেজ- বিএম কলেজ, বরিশাল মহিলা কলেজ, হাতেম আলী কলেজ ও বরিশাল সরকারি কলেজে কিছু শিক্ষক সংযুক্ত রয়েছেন বলে জানা গেছে।
