মক্কা থেকে মদীনা শরীফের হিজরতের এক বছর পূর্বে রজব মাসের ২৭ তারিখের রাতে এই মহিমান্বিত মেরাজ শরীফের ঘটনা অনুষ্ঠিত হয়। হুজুর (স.) এর জীবনের এই তাত্পর্যপূর্ণ ঘটনা সমগ্র মানবজাতির সকল ধর্মের অনুসারীদের জন্য শিক্ষণীয় ও অনন্য এক পবিত্র অনুষ্ঠান। আমরা সবাই অবগত আছি এই পবিত্র রাতে হযরত জীবরাইল (আ.) হযরত মুহাম্মদ (স.) কে বিদ্যুত্ গতিতে মক্কা নগরী থেকে জেরুজালেম শহরে মসজিদুল আক্সা নিয়ে যান, এই অলৌকিক ঘটনাকে ইস্রা বলা হয়। সেই মসজিদে পূর্ববর্তী সকল নবী ও রসূলের অংশগ্রহণে এক নামাজ পালন করা হয় এবং হুজুর (স.) সেই নামাজের ইমামতী করেন।
অতঃপর হযরত জীবরাইল (আ.) নবীকূল শিরোমনী হযরত মুহাম্মদ (স.) কে নিয়ে সাত আসমানের দিকে রওনা হন এবং সেখানে অর্থাত্ বেহেশেত তিনি আবারও পূর্ববর্তী নবী ও রসূলগণের সাক্ষাত্ পান। আলাদাভাবে তিনি বেহেশ্ত ও দোজখ পর্যবেক্ষণ করেন। মৃত্যুর পর মানবজাতির কি পরিণতি হবে তা আল্লাহ্ তায়ালা তাঁকে চাক্ষুষভাবে প্রদর্শন করান। এই মেরাজ শরীফে তাঁকে বহুবিধ অলৌকিক নিদর্শন প্রদান করা হয়। অতঃপর আল্লাহ্ পাকের সাথে হুজুর পাক (স.) এর সাক্ষাত হয়। সিদরাত গাছ পর্যন্ত হযরত জীবরাইল (আ.) তাঁকে এগিয়ে দেন, কিন্তু এরপরের বেহেশ্তী জগতে হুজুর পাক (স.) স্বয়ং একাই যান এবং মহান আল্ল¬াহর সাক্ষাত পান। আল্লাহর মহানুভবতা ও দয়ার কথা মানুষ স্মরণ করবে এই উদ্দেশেই পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের বিধান আল্লাহ্ তখন নির্দেশ দেন। মেরাজ ঘটেছিল মুহাম্মদের নবুয়্যত বা ঐশ্বিক বাণী প্রাপ্তির দশম বছরে। মেরাজের ঘটনায় দুটো অংশ ছিল: ১. আল-ইসরা বা জেরুজালেমে রাত্রভ্রমণ, এবং ২. মেরাজ বা ঊর্ধ্বারোহণ বা স্বর্গারোহণ।[১] একটি বর্ণনায় পাওয়া যায়:নবুয়্যতের দশম বছর, সাত মাস; ২৭ রজব তারিখে মুহাম্মদ, আবু তালেবের মেয়ে উম্মেহানির (রা.) এর বাড়িতে ছিলেন। আবার অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ঐ রাতে মুহাম্মদ কাবাতে ঘুমান, এবং তিনি কাবা’র ঐ অংশে ঘুমান, যেখানে কোনো ছাদ ছিল না (হাতিম)।[১]
হিন্দার বিবরণ থেকে জানা যায়, ঐ রাতে, মুহাম্মদ, রাতের প্রার্থনা সেরে ঘুমাতে যান। খুব ভোরে মুহাম্মদ ওঠে সবাইকে জাগালেন এবং প্রার্থনা সারলেন। উম্মে হানি (রা.) তাঁর সাথে প্রার্থণা সারলেন। প্রার্থনা শেষে মুহাম্মদ জানালেন, “ও উম্মেহানি, এই ঘরে আমি তোমাদের সাথে প্রার্থনা করেছি। যেমন তোমরা দেখেছ। তারপর আমি পবিত্র স্থানে গিয়েছি এবং সেখানে প্রার্থণা সেরেছি। এবং তারপর তোমাদের সাথে ভোরের প্রার্থনা সারলাম, যেমন তোমরা দেখছো।”
আনাছ (রা.) মালেক ইবনে সা’সাআ’হ (রা.) হতে বর্ণনা করেছেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লামকে যেই রাত্রে আল্লাহ তাআলা পরিভ্রমণে নিয়ে গিয়েছিলেন সেই রাত্রের ঘটনা বর্ণনায় ছাহাবীগণের সম্মুখে তিনি বলেছেন, যখন আমি কা’বা গৃহে উন্মুক্ত অংশ হাতীমে (উপনীত হলাম এবং তখনও আমি ভাঙ্গা ঘুমে ভারাক্রান্ত) ঊর্ধ্বমুখী শায়িত ছিলাম, হঠাত্ এক আগন্তক (জিব্রাঈল ফেরেশতা) আমার নিকট আসলেন (এবং আমাকে নিকটবর্তী/ জমজম কূপের সন্নিকটে নিয়া আসলেন)। অতপর আমার বক্ষে ঊর্ধ্ব সীমা হতে পেটের নিম্ন সীমা পর্যন্ত চিরে ফেললেন এবং আমার হদয় বা কল্বটাকে বাইরে করলেন। অত:পর একটি স্বর্ণপাত্র উপস্থিত করা হল, যা ঈমান (পরিপক্ব সত্যিকার জ্ঞান বর্ধক) বস্তুতে পরিপূর্ণ ছিল । আমার কল্বটাকে (জমজমের পানিতে) ধৌত করে তার ভেতরে ঐ বস্তু ভরে দেয়া হল এবং কল্বটাকে নির্ধারিত স্থানে রেখে আমার বক্ষকে ঠিকঠাক করে দেয়া হল। অতপর আমার জন্য খচ্চর হতে একটু ছোট, গাধা হতে একটু বড় শ্বেত বর্ণের একটি বাহন উপস্থিত করা হল তার নাম “বোরাক”, যার প্রতি পদক্ষেপ দৃষ্টির শেষ সীমায়। সেই বাহনের ওপর আমাকে সওয়ার করা হল। ঘটনা প্রবাহের ভেতর দিয়ে জিব্রাঈল (আ.) আমাকে নিয়ে নিকটবর্তী তথা প্রথম আসমানের দ্বারে পৌঁছিলেন এবং দরজা খুলতে বললেন। ভেতর হতে পরিচয় জিজ্ঞেসা করা হল, জিব্রাঈল স্বীয় পরিচয় প্রদান করলেন। অতপর জিজ্ঞেস করা হল, আপনার সঙ্গে কে আছেন? জিব্রাঈল বললেন, মুহাম্মদ (স.) আছেন। বলা হল, (তাঁকে নিয়ে আসবার জন্যই তো আপনাকে) তাঁর নিকট পাঠান হয়েছিল? জিব্রাঈল বললেন, হ্যাঁ এরপর আমাদের প্রতি মোবারকবাদ জানিয়ে দরজা খোলা হল। গেটের ভেতরে প্রবেশ করে তথায় আদম (আ.)-কে দেখতে পেলাম। জিব্রাঈল আমাকে তাঁর পরিচয় করিয়ে বললেন, তিনি আপনার আদি পিতা আদম (আ.), তাঁকে সালাম করুন। আমি তাঁকে সালাম করলাম। আমার সলামের উত্তরদানে আমাকে “সুযোগ্য পুত্র ও সুযোগ্য নবী” আখ্যায়িত করলেন এবং খোশ আমদেদ জানালেন। অতপর জিব্রাঈল আমাকে নিয়ে দ্বিতীয় আসমানের দ্বারে পৌঁছিলেন এবং দরজা খুলতে বললেন। এখানেও পূর্বের ন্যায় কথোপকথন হল এবং শুভেচ্ছ মোবারকবাদ জানিয়ে দরজা খোলা হল। ভেতরে প্রবেশ করে তথায় ইয়াহইয়া (আ.) ও ঈসা (আ.)-এর সাক্ষাত্ পেলাম; তাঁদের উভয়ের নানী পরস্পর ভগ্নী ছিলেন। (সংক্ষেপিত)
লেখক :তাসাউফ গবেষক
