লিবিয়ায় ভূমধ্যসাগরের তীরে জোয়ারা নামক স্থানে অবস্থিত ‘গেম ঘর’ নামক বন্দিশালায় এখনো অর্ধশতাধিক বাংলাদেশি তরুণ বন্দি। এই তথ্য জানিয়ে তাদের উদ্ধারের আবেদন জানিয়েছেন সাগরে নৌকাডুবির ঘটনায় সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া রুবেল। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় ইটালি যেতে চেয়েছিলেন তিনি। জমি বাড়িঘর বিক্রি করে দালাল ধরে লিবিয়ায় যান তিনি। সেখান থেকে অন্য অনেকের সঙ্গে দুটি নৌকাযোগে তাদের ইটালির উদ্দেশে পাঠিয়ে দেয় দালালরা। কিন্তু ইটালি আর পৌঁছাতে পারেননি তারা। একটি নৌকা ডুবে গিয়ে অন্তত ৬০ জন যাত্রী মারা যান যাদের মধ্যে অধিকাংশই বাংলাদেশি। রুবেল জানান, তিউনিশিয়া সীমান্তে যাওয়ার পর রুবেলদের নৌকাটি নষ্ট হয়ে যায়। তারপর টানা তিনদিন সাগরে ভেসে থাকেন নারী শিশুসহ ৫৭ যাত্রী। একপর্যায়ে একটি তেলবাহী জাহাজ তাদের রাবারের বোট দিয়ে সাহায্যে এগিয়ে এলেও কেউ তাদের জাহাজে তোলেনি। এক রাত ওই বোটে করে সাগরে ভাসতে হয় তাদের। পরে জেলেরা তাদের উদ্ধার করে তিউনিশিয়ার কোস্ট গার্ডের কাছে হস্তান্তর করে।
ওই নৌকার বেঁচে যাওয়া ১৫ তরুণ গত মঙ্গলবার দেশে ফিরেছেন। ভাগ্যগুণে বেঁচে যাওয়া এই ১৫ তরুণের মধ্যে সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও গ্রামের রুবেল আহমদসহ ১৩ জনই বৃহত্তর সিলেটের বাসিন্দা।
রুবেল জানান, প্রথমে বিমানে দুবাই, সেখানে ১৫ দিন রাখার পর মিসরে পাঠানো হয় তাকেসহ ১৩ জনকে । মিসর থেকে লিবিয়া এয়ারপোর্টে পৌঁছলে সেখানে ইউনিফর্ম পরা এক বাহিনী তাদের রিসিভ করে দালাল রফিকের ছেলে পারভেজের কাছে হস্তান্তর করে। পারভেজ লিবিয়াতেই থাকে এবং সে মানবপাচারকারী চক্রের সঙ্গে জড়িত। লিবিয়ার সাগর তীরে অবস্থিত সেই ‘গেম ঘরটি’ পারভেজেরই। রুবেল বলেন, দালাল পারভেজ তার গেম ঘরে বন্দি বাংলাদেশি তরুণদের যে কোনো সময় সাগরে ভাসিয়ে দিতে পারে। তাদের যতদ্রুত সম্ভব উদ্ধার এবং রুবেলসহ ফিরে আসা ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ও তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আকুল আবেদন জানান তিনি।
‘রাতে শুধু একটি বনরুটি আর পেট্রোল মেশানো খাবার পানি দিতো’
লিবিয়ার জোয়ারা নামক স্থানে সেই গেম ঘর নামক ছোট্ট কুটিরে তাদের গাদাগাদি করে রাখা হতো। প্রায় উপোষ অবস্থাতেই রাখা হতো তাদের। রাতে শুধু একটি বনরুটি ও পানির সঙ্গে পেট্রোল মিশিয়ে দিতো যাতে বেশি পানি খাওয়া না লাগে। একটি মাত্র বাথরুম। দুর্গন্ধে বমি আসত। রুবেলের ভাষায়, ‘দিন রাত ঘরে বন্দি ছিলাম। আকাশ দেখতে পারিনি মাসের পর মাস।’ পরে তাদের একটি জঙ্গলে রাখা হয় কয়েকদিন। এর পর তাদের কয়েক মাইল হাঁটিয়ে নিয়ে একটি নৌকায় ওঠায় তারা। নৌকায় উঠতে না চাইলে পারভেজ তাদের মাথায় পিস্তল ঠেকায়।
অষ্টম শ্রেণি পাস গরিব ঘরের সন্তান রুবেল জানান, গত বছর ১০ রমজান বিশ্বনাথের বাসিন্দা দালাল রফিকের সঙ্গে তার চুক্তি হয়। প্রথম দফায় সাড়ে ৫ লাখ টাকা দেওয়া হয় বাড়ির ৩ শতক জায়গা বিক্রি করে। পরে লিবিয়া পৌঁছার পর তাকে জিম্মি করে ভয় দেখিয়ে সাড়ে ৩ লাখ টাকা, পরে আরো ৫০ হাজার টাকাসহ মোট ৯ লাখ নেওয়া হয়।
