আমি পরীক্ষা দিতে বসেছি। কিছুই লিখতে পারছি না, গরমে ঘামছি। ঘড়ির কাঁটাটা টিকটিক করে চলছেই। থামার কোন নাম নেই। এমন সময় বৃষ্টি শুরু। মনে হল মেঘও আমার দশা দেখে কাঁদছে। বৃষ্টির কারণে পরীক্ষা বাতিল করা হল। আর আমি ছুটি, ছুটি, ছুটি বলে দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাত্ বিছানা থেকে মাটিতে পড়লাম। সকালের ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। স্বপ্নটা ভাঙ্গল, মুখে হাসি আর পিঠে ব্যথা নিয়ে। তাকিয়ে দেখি ভীষণ মেঘ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় খোলার এক মাসের মধ্যেই হবে পরীক্ষা। তাই বোধহয় এমন অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম। এই বৃষ্টি শুরু হল। প্রায় চার-পাঁচদিন হতে চলল গরমের ছুটি শুরু হয়েছে। এর পর থেকেই বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বৃষ্টির দিনে, ছুটির দিনে কি আর পড়তে ইচ্ছা করে। আমাদের পরীক্ষা হলেও, ছয়-সাতজন মিলে ঠিক করেছি তিনদিনের জন্য টাঙ্গাইল যাব। আমাদের বান্ধবী মোনার দেশের বাড়ি। বহু কষ্ট করে, বাসায় অনুমতি পেয়েছি বেড়াতে যাবার। আমার আরেক বান্ধবী অর্পনা ও তার বোনও যাবে। আমাদের বন্ধুদের গ্রুপে দুইজনের বাড়ি ঢাকায়। আর বাকিরা হলেই থাকে। ওদের মজা অন্যরকম। চাইলেই বেড়াতে যেতে পারে। স্বাধীনতা অনেক বেশি। তবে কষ্টও আছে। না বেড়ালে কি আর গরমের ছুটি হল। তাই আমরা গ্রীষ্মের ছুটিতে বেড়াতে যাবার চেষ্টা করি। এতদিন পরে শেষ পর্যন্ত তৃতীয় বর্ষে এসে, ছুটির পর পরীক্ষা পেলাম। এর আগে দ্বিতীয় বর্ষে থাকতে আমরা বান্দরবানের বিরিশিরীতে বেড়াতে গিয়েছি। আর প্রথম বর্ষে থাকতে প্রায় সব বন্ধুই দেশে চলে গিয়েছিল ছুটিতে। তাই আর বেড়ানো হয়নি। তাও সাভার গিয়েছিলাম আরেক বন্ধুর বাড়ি। আমাদের ছুটি আরও বেশিদিন হওয়া উচিত। এত কম ছুটিতে কি আর হয়। গরমের ছুটির দিনগুলোর কথা এভাবেই বললেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যানের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী বন্যা।
এখন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সবই ছুটি। তাই সবার মাঝেই এক ছুটি ছুটি ভাব। সারাদিন খেলা, গল্প, বেড়ানো হচ্ছেই। ভিকারুননিসা নূন স্কুলের ছাত্রী তন্নীর সাথে গল্প হচ্ছিল তার গরমের ছুটি নিয়ে। তন্নী বলে, আমাদের ছুটির পরই পরীক্ষা, বাসায় পড়ার চাপ। ছুটি কি বুঝিই না। তার মা অভিযোগের সুরে বললেন, ছুটিতে পড়বে বলে সব জমিয়ে রাখল, আর এখন সারাদিন টিভি, খেলা, কোন পড়ার নাম নেই। তন্নী এবার ক্লাস সিক্সে। তন্নী বলে উঠল, গ্রীষ্মকালের ছুটিতে কোথায় যাব বেড়াতে, গাছ থেকে পাড়ব আম; তা না খালি পড়া আর পড়া। কতদিন আমার বান্ধবী সোহাগীর সাথে কথাও হয় না। কে কী করছে তা যে জানব তার উপায়ও নেই। বললাম, সবাই মিলে কোথাও বেড়াতে যাই, তাও হল না। তাই বাবা বলেছে, আমরা এবার দেশে, গ্রামের বাড়িতে যাব। একরকম বেড়ানোর আশা নিয়েই ছুটি কাটছে তন্নীর।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআরের ছাত্রী শম্পা বলল, এবার ছুটিতে আমি আর বাড়ি যেতে পারছি না। আমার ছাত্রী স্কুলে পড়ে। ছুটি শেষ হলে ওর দ্বিতীয় সাময়িকী পরীক্ষা, তাই আর বাড়ি যেতে পারব না। আমি এবার চতুর্থ বর্ষে। এ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে অনেকগুলো গ্রীষ্মকালীন ছুটি পেলাম। গ্রীষ্মকালের ছুটিতে অনেকেই বাড়ি চলে যায়। সম্পূর্ণ ছুটি বাড়ি না থাকলেও, দশ-বারোদিনের মত থাকে। আমার ছুটিতে দেশে না গেলে একদম মন টেকে না। আমার হলটাও ফাঁকা ফাঁকা লাগে। আমাদের দেশের বাড়ি ফরিদপুর। আমি রোকেয়া হলে থাকি। তাই যারা বাড়ি যায়নি, ক্লাসের যে বন্ধুরা ঢাকায় থাকে তারা সবাই মিলে কলাভবনে আড্ডায় বসি। মনে হয়, এই গল্পের দিনগুলো যেন শেষ না হয়। আমার সাথে প্রায়ই আমার বান্ধবী এসে হলে থাকে। ও আমার সবচেয়ে কাছের বান্ধবী। আমি যখন আগের ছুটিতে দেশে গিয়েছিলাম। ওর অভাবই বেশি অনুভব করেছি। তাই ফোনে ওর সাথে গল্প চলতই। দেশে তো আর ইন্টারনেট নেই, আর পিসিও ছিল না যে মেইলে যোগাযোগ করব।
গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের ছাত্রী সোনিয়ার সাথে মেঘলা দিনে বৃষ্টির মাঝেই কথা হল। প্রচণ্ড গরমের পর প্রথম বৃষ্টিতে দেখলাম সব বান্ধবী মিলে ভিজছে। জানতে চাইলাম তাদের ছুটির মধ্যে কী পরিকল্পনা। সোনিয়া বলল, তার বাড়ি রংপুর। এই কয়দিন পর এক সপ্তাহের জন্য বাড়ি চলে যাবে। বহুদিন পর মায়ের হাতের রান্না খাবে। নিজেরা রান্না-বান্না করে, একই খাবার খেতে আর ভাল লাগে না। ওরা তিন ভাইবোন। বাড়ির কথা অনেক সময়ই খুব মনে পড়ে। নানা বিপদে নিজের পাশে কাউকে দাঁড়াবার জন্য খুঁজেও পায় না। এই যান্ত্রিক শহর ছেড়ে গ্রামে একটু পাখির ডাক শোনার জন্য মনটা পড়ে থাকে। আবার দেশে গেলে, সহপাঠী এবং রুমমেটদের কথা খুব মনে পড়ে। আর এক বছর পর তার অনার্স শেষ, তারপর তার এই দিন, আর গ্রীষ্মকালীন এই ছুটিগুলো চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
ছবি: সংগৃহীত
