আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেছেন, “লাক্বদ কানা লাকুম ফি রসূলিল্লাহি উসওয়াতুন হাসানাহ,” আমার নবী হযরত মুহাম্মদ (স.) এর জীবনে রয়েছে উত্তম আদর্শ, যারা তাঁর অনুসারী হতে চান অবশ্যই তাদের এই আদর্শ পরিপালন করে জীবন-যাপন করতে হবে। কারণ আল্লাহ অন্যত্র বলেছেন, কুল ইন কুনতুম তুহিববু নাল্লাহা ফাত্তা বিউনি ইউহবিব কুমুল্লাহ ওয়া ইয়াগফিরুলাকুম জুনুবাকুম আল্লাহু গাফুরুর রহিম” অর্থাত্ যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসতে চাও তাহলে আমার নবীর অনুসরণ করো; তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের জীবনের পূর্বের সকল গুনাহ মাফ করে দেবেন। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল ও অতীব মেহেরবান। সে কারণে রসূল (স.) এর অনুসরণে তাঁর আদর্শ অনুযায়ী দৈনন্দিন জীবন পরিচালনা করতে হলে অবশ্যই জানতে হবে তাঁর আদর্শগত নীতি নির্ধারণী বিষয়গুলো। প্রথমত: একটি বিষয় অবগত হতে হবে যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তাকে এই পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠতম পয়গম্বর করেছেন। সকল নবী রসূল এসেছিলেন তাঁর নিজ নিজ কওমের জন্য। আর মুহাম্মদ (স.) এসেছিলেন সমগ্র জাহানের জন্য। অন্যান্য নবী রসূলগণ এসেছিলেন একটি নির্ধারিত সময়ের জন্য। অর্থাত্ ইন্তেকালের সঙ্গে সঙ্গে তাদের কার্যক্রম শরীয়ত সংক্ষিপ্ত করে দেয়া হয়েছে। আর মুহাম্মদ (স.) এসেছেন কেয়ামত পর্যন্ত সকল মানবতার জন্য অর্থাত্ তিনি কেবল আরবদের নবী নন। আরবী ভাষা-ভাষীদের নবী নন। তিনি বলেছেন- “ইয়া আয়্যুহান নাছ ইন্নিরসূলিল্লাহি ইলাইকুম জামিআ” অর্থাত্ জনমন্ডলী। আমি তোমাদের সবার জন্য রসূল হিসেবে প্রেরিত হয়েছি। অন্য স্থানে বলা হয়েছে- অমা আর সালনাকা ইল্লা রহমাতাল্লীল আলামীন অর্থাত্ আমি গোটা জগত্বাসীর জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছি। এ আয়াতে “আলামীন” শব্দটির মাধ্যমে বুঝানো হয়েছে পৃথিবী ছাড়া আরো যত জগত্ রয়েছে সকল জগতের জন্য তিনি রসূল। তাঁর মত আদর্শ মহামানব এই পৃথিবীতে আর কেউ আবির্ভূত হননি। জগত্বাসীর সম্মুখে তিনি উত্তম আদর্শের অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। যখন মক্কায় তিনি দাওয়াত শুরু করলেন তখন তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষেরা বিরোধতা শুরু করল। তাকে যখন অত্যাচার-নির্যাতনে জর্জরিত করে দেয়া হচ্ছিল তখন তিনি অতিব ধৈর্যের সুমহান পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করলেন। যে বুড়ি তাঁর চলার পথে কাঁটা বিছিয়ে রাখতো একদিন পথে কাঁটা না দেখে ঐ বৃদ্ধার বাড়ি গিয়ে দেখলেন তিনি অসুস্থ। তখন তার সেবা করে তাকে সুস্থ করে তুললেন। যে তায়েফের মানুষেরা তাকে প্রচন্ড প্রহার করে রক্তাক্ত অবস্থায় মরা লাশ মনে করে মরুভূমির মধ্যে ফেলে রেখে চলে গেল সেই মানুষদের জন্য যখন জিব্রাইল (আ.) গজব প্রার্থনা করলেন; তখন রসূল (স.) বললেন-, “না জিব্রাইল, এদের ধ্বংস করো না, ওরা না বুঝে আমার ওপর অত্যাচার করেছে। হয়তো তাদের পরবর্তী প্রজন্ম আমাকে চিনবে এবং ইসলাম গ্রহণ করবে। আমি কাউকে ধ্বংস করার জন্য এই পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়নি। বরং আমি আবির্ভূত হয়েছি জগত্বাসীর জন্য রহমতস্বরূপ তাওহিদের বীজ বপন করার জন্য।” যে বেলাল ছিলেন আফ্রিকার কালো বর্ণের, দেখতে অসুন্দর একজন মানুষ, রসূল (স.) তাকে আবুবকর (রা.) এর মাধ্যমে উমাইয়া বিন খলফের নির্যাতনের শৃংখল থেকে মুক্ত করে ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন বানিয়ে মর্যাদা ও গৌরবের রাজসিংহাসনে অধিষ্ঠিত করেছিলেন। একদিন মরুভূমির মধ্যে তিনি একাকী সন্ধার নামাজ পড়ছিলেন (মেরাজের মাধ্যমে ৫ ওয়াক্ত নামাজ পাওয়ার পূর্বে দিনে দু’বার অর্থাত্ সকাল-সন্ধার নামাজই ছিল) সেই সময় আরবের একজন সন্ত্রাসী (যার নাম যোবায়ের ইবনে মোতআম) রসূলের পিছে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল নামাজ শেষ হওয়া মাত্র তাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে। সে সময় রসূল (স.) কুরআনের সূরা তুর এর শেষ অংশ “আম খুলিকু মিন গয়রি শায়্যিন আম হুমুল খলেকুন আম খলাকুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদি’ বাল লা ইউকিনুন” পাঠ করছিলেন, যার অর্থ এই যে, সৃষ্টিরাজি, এগুলো কি এমনি এমনি সৃষ্টি হয়েছে, নাকি এর কোন স্রষ্টা আছেন? আর এই যে আসমান ও জমিন এগুলো কি এমনি এমনি সৃষ্টি হয়েছে নাকি এর কোন স্রষ্টা আছেন? আর এটা শুনে যোবায়ের ইবনে মোতআমের হাত থেকে তরবারী পড়ে গেল। এবং তিনি নিস্তেজ অবস্থায় দাঁড়িয়ে রইলেন। রসূল (স.) তাকে বললেন, হে যোবায়ের ইবনে মোতআম তুমি কেনো নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছো আর তোমার তরবারী কেনো মাটিতে শায়িত? যোবায়ের বলেন, আপনার তেলাওয়াত শুনে আমার এই অবস্থা হয়েছে- আপনি আমাকে মুসলমান বানিয়ে নিন। রসূল (স.) তাকে মুসলমান করে নিলেন। তাছাড়া যে ওমর ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ছিলেন। যার সম্পর্কে রসূল (স.) বলেছেন, “ লা নাবিয়্যা মিম বাআদি লাকানা ওমর” অর্থাত্ আমার পরে কোনো নবী নাই; যদি নবী হতেন তবে ওমরকে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা নবী বানিয়ে দিতেন। সেই ওমর একদিন নাঙ্গা তরবারী নিয়ে মুহাম্মদ (স.)কে হত্যা করতে আসছিলেন। রসূল (স.) তখন দারুল আরকামে ছিলেন। তাঁর চতুষ্পার্শে তখন সাহাবী পরিবেষ্টিত ছিলো। দূর থেকে উলঙ্গ তরবারী নিয়ে ওমরকে আসতে দেখে আমির হামজা (রা.) আবু বকর (রা.) সহ সাহাবীরা দাঁড়িয়ে গেলেন এবং বললেন, হে রসূল (স.) ঐ দেখুন ওমর আসছে (সে সময় ওমরের মত ভয়ংকর লোক আরবে কমই ছিল) তার উদ্দেশ্য যদি ভালো। হয়তো ভালো; নইলে আমাদের তরবারী তাকে ক্ষমা করবে না। রসূল (স.) বললেন, আবুবকর সরে যাও, সাহাবীরা সরে যাও, চাচাজান সরে যান, ওমরকে আমার কাছে আসতে দেন। হযরত ওমর আসলেন। রসূল (স.) তার চেহারার দিকে তাকালেন। দেখলেন ওমরের চেহারায় জাহেলিয়াতের কোন চিহ্নমাত্র নাই। কুফরের লেশমাত্র নাই। উগ্রতার কোনো আলামত নাই। গোটা চেহারার মধ্যে তাওহীদের নূরগুলো যেন ঝলমল করছে। ওমর রসূলের (স.) কাছে এলেন। তরবারী রসূলের পদ মোবারকে সমর্পণ করলেন। আর বললেন, হে মুহাম্মদ (স.), এই তরবারী নিয়ে এসেছিলাম আপনাকে হত্যা করার জন্য, কিন্তু আমার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয়ে গেছে, আমি আর আপনাকে হত্যা করবো না, বরং আপনার পাহারাদার হয়ে যাবো, আমাকে মুসলমান বানিয়ে নিন। রসূল (স.) কালেমা পড়িয়ে তাকে মুসলমান বানালেন। পরবর্তী মাদানী জীবনে একটি যুদ্ধ শেষ করে রসূল গাছের ডালে তরবারী রেখে নিচে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, তখন তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে যান। সেই সময় কাফের পক্ষের একজন সৈনিক এসে গাছের ডাল থেকে তরবারী নামিয়ে তরবারীর সামনের অংশ দিয়ে আলতো করে খোঁচা দিয়ে রসূলের (স.) ঘুম ভাঙ্গালেন। চোখ খুলে রসূল (স.) দেখলেন যে, তরবারী হাতে একজন কাফের সৈনিক তাঁর সামনে দাঁড়ানো আর গাছের ডালে ঝুলানো তার তরবারীখানা নাই এবং ঐ কাফের বলছে, হে মুহম্মদ, বলুন, আমার হাত থেকে আপনাকে কে রক্ষা করবে? রসূল (স.) বললেন, আমার রব আল্লাহ আমাকে রক্ষা করবেন? কথা শুনে কাফের ভয়ে প্রকম্পিত হলো। এমতাবস্থায় তার হাত থেকে তরবারী পড়ে গেল। রসূল (স.) তখন নিজের তরবারী হাতে নিলেন এবং কাফেরকে বললেন, এখন বল, আমার হাত থেকে তোমাকে কে রক্ষা করবে? কাফের ডানে বামে সামনে পিছনে তাকিয়ে দেখলো তার সহযোগী কেউ নাই। সে বললো আমাকে রক্ষা করার কেউ নাই। রসূল (স.) বললেন, যাও তোমাকে মাফ করে দিলাম। ঐ লোকটি আর চলে যেতে পারলো না। রসূল (স.) এর এই আদর্শের কাছে নিজেকে সমর্পণ করলো এবং বললো-আমাকে মুসলমান হওয়ার সুযোগ দান করুন। রসূল (স.) তাকে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে স্থান দানে ধন্য করলেন। এমনিভাবে মক্কা বিজয়ের সময় এক বৃদ্ধা কাফের মহিলা মুহাম্মদ (স.) এর ভয়ে পালাচ্ছিলেন। বার্ধক্যের কারণে তার বোঝা বহন করতে অক্ষম হয়ে পড়েছিলেন। রসূল (স.)তার বোঝা নিজে বহন করে নিরাপদ স্থানে দিয়ে চলে আসার সময় ঐ মহিলা মুহাম্মদ (স.) এর পরিচয় জানতে পেরে মুসলমান হয়ে যান। আর একটু সামনে এসে অদিয়ে ফাতেমা নামক স্থানে রসূল (স.) তার তাঁবু স্থাপন করেন এবং রাতের বাকী সময়টুকু ঐ স্থানে অতিবাহিত করে দিনের আলোতে বীরপুরুষের মত মক্কা বিজয় করতে মনস্থির করলেন। ঐ রাতে আবু সুফিয়ান চুরি করে মুসলিম বাহিনীর অবস্থান জানতে এসে ওমরের হাতে আটক হয়ে রসূলের সম্মুখে হাজির হন। রসূল (স.) তাকে উত্তম ব্যবহার করেন। ফলে আবু সুফিয়ান মুসলমান হওয়ার সুযোগ পায়। তারপর দিনের আলোতে মক্কায় প্রবেশ করেন। তখন বিনয়ে তার মস্তক আল্লাহর কাছে নত হয়ে গিয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘লা তাসরিবু আলাইকুমুল ইয়াওম ওয়াইয়াগফিরুল্লাহু লাকুম অহুয়া আর হামার রহেমীন’ অর্থাত্ আজকের দিবসে তোমাদের প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নাই, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন এবং তোমাদের প্রতি রহম করুন, তিনি দয়াময় ও করুণাসিক্ত। সেদিন মক্কায় যারা তাকে নির্যাতন করেছিল তাদের ক্ষমা করায় তারা দলে দলে মুসলমান হয়ে গিয়েছিল। রসূলের প্রাণপ্রিয় চাচা আমীর হামজার হত্যাকারী ওহশিও বক্ষ বিদীর্ণ এবং কলিজা চর্বণকারী হিন্দাও ঐ দিন মুসলমান হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করে। আজকেও যারা রসূলের অনুসারী হতে চান তাদের অবশ্যই রসূলের এই সমস্ত আদর্শের অনুগামী হতে হবে। আল্লাহ আমাদের সেই তাওফীক দান করুন, আমীন।
লেখক :সাংবাদিক
e-mail : [email protected]
