বৃক্ষরোপণ অন্যতম একটি ইবাদত। ইসলামের দৃষ্টিতে একাজ অত্যন্ত পুণ্যময়। হযরত রসূলুল্লাহ (স.) স্বয়ং বৃক্ষরোপণ করেছেন এবং বৃক্ষরোপণ করার জন্য গুরুত্বারোপ করেছেন। বৃক্ষরাজি সবুজ শ্যামল পাতা বিস্তার করে পরিবেশকে সুন্দর রাখে, আবহাওয়াকে স্বাস্থ্যকর করে তোলে এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য অনুকূলে রাখে—যা মহিমাময় আল্লাহর অপার করুণার পরিচায়ক। ছোট্ট বীজটি হতে নির্দিষ্ট সময়ে চারা অংকুরোদগমিত হয়ে অত্যন্ত কোমল পাতা গজাতে থাকে এবং ধীরে ধীরে গাঢ় সুবজে তা ছেয়ে দেয় চারপাশকে। আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (স.) ইরশাদ করেছেন, কোন মুসলিম যদি একটি চারাগাছ রোপণ করে কিংবা বীজ বপন করে, তারপর সেই গাছ ও ফসল দ্বারা মানুষ উপকৃত হয় কিংবা পশুপাখি খায়-তাহলে এর বিনিময়ে তার আমলনামায় সাদকাহ প্রদানের সাওয়াব লেখা হয়। (মিশকাত শরীফ) হাদীস শরীফের মাধ্যমে আরো জানা যায় যে, হযরত রাসূলুল্লাহ (স.) দু’টি কবরের উপরে দু’টি খেজুরের ডালের অংশ রোপণ করে বলেছিলেন, এ দু’টো কবরে আযাব হচ্ছে-দু’টি হালকা (মুক্ত থাকা সহজ) কারণে এ আযাব হচ্ছে, একজন মানুষের গোপন তথ্য একে অন্যের নিকট লাগিয়ে ঝগড়া বাধাত আর অপরজন পেশাব করে ভালভাবে পবিত্র হতো না। যতক্ষণ পর্যন্ত পাতাগুলো সতেজ থাকবে ততক্ষণ তাদের কবরের আযাবকে আল্লাহ তা’আলা হালকা করে দেবেন। (বুখারী শরীফ)-এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, সতেজ পাতাও আল্লাহর বিশেষ রহমত লাভের অন্যতম উপলক্ষ হয়। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত আখেরাতের মঙ্গল কামনার জন্য সুবিধাজনক স্থানে বৃক্ষরোপণ করা। শূন্যস্থানসমূহকে সবুজ উদ্যানে পরিণত করা। যদ্বারা মৃত ব্যক্তিগণও উপকৃত হন। পরিবেশ ও জলবায়ুর প্রতি গভীর দৃষ্টি রাখা ও এর-অনুকূলে পরিশ্রম করার শিক্ষাও ইসলাম অত্যন্ত উত্তম রূপে প্রদান করেছে। কেননা ইসলাম মানবতার ধর্ম। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে গ্রীন হাউস ইফেক্ট বিশ্বের জন্য হুমকিস্বরূপ—তার ক্ষতিকর প্রভাব হতে মুক্ত থাকতে হলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য কাজ করতে হবে। যার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। বিখ্যাত ডাচ নৃবিজ্ঞানী ফ্রান্সিসকো ডি চাটেলের মতে, পরিবেশ দূষণ ও প্রাকৃতিক সম্পদের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে পৃথিবীর কিছু অংশে মরুময়তা এবং পানিস্বল্পতা, অন্য অংশে বন্যা ও ঝড়ের প্রকোপ বেড়ে গেছে। এসব জটিল প্রাকৃতিক সমস্যাকে সফলভাবে মোকাবিলার জন্য এখনই ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে ইসলামের শিক্ষা মেনে বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যার মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব থেকে পরিবেশকে সুন্দর ও মুক্ত রাখার জন্যও বৃক্ষরোপণের বিকল্প নেই। তাছাড়া বিদ্যমান বৃক্ষরাজিকে নির্বিচারে নিধনের মত অপরাধও সাংঘাতিক। কোন ক্ষেত্রেই তা সমীচীন নয়। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহর পবিত্র বাণী, “তিনিই লতা ও বৃক্ষউদ্যানসমূহ সৃষ্টি করেছেন এবং খেজুর বৃক্ষ বিভিন্ন স্বাদ বিশিষ্ট খাদ্যশস্য, জয়তুন ও ডালিম’ সৃষ্টি করেছেন। তারা একে অন্যের সদৃশ এবং সদৃশবিহীনও হয়ে থাকে, যখন তা ফলবান হয় তখন তার ফল আহার করবে আর ফসল উঠানোর দিন তার (যাকাত) প্রদান করবে এবং অপচয় করবে না; কারণ তিনি (আল্লাহ) অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না” (সূরা আল-আনআম: ১৪১)। অহেতুক বৃক্ষ নিধন অন্যতম একটি অপরাধ। কেননা এটিও একপ্রকার অপচয়। একাজ হতে আমাদেরকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে। নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন ও উত্তপ্ত জ্বালানি ব্যবহারের ফলে বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাছাড়া সামগ্রিক জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির জন্য গ্রীন হাউস গ্যাস বলে খ্যাত কার্বণ ডাই অক্সাইডকে দায়ী বলা হয়। মানুষের অনিয়ন্ত্রিত জীবন-যাপন, অপচয়, সম্পদ বিনষ্টকরণ জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করণ ইত্যাদির মাধ্যমে প্রাকৃতিক রূপ পরিবর্তিত হয়। মহান আল্লাহ এরশাদ করেছেন, পৃথিবীকে আমি বিস্তৃত করেছি এবং তাতে পর্বতমালা স্থাপন করেছি, আমি তাতে প্রত্যেক বস্তু উদ্ভূত করেছি পরিমিতভাবে (সূরা আল-হিজর: ১৯)। তাই এ বিষয়টি আমরা সহজেই অনুধাবন করতে পারি যে, বৃক্ষের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। বন-জঙ্গল, পাহাড়-পর্বত সবকিছুকেই আল্লাহতাআলা বিশেষ প্রয়োজনে সৃষ্টি করছেন। অপ্রয়োজনে এবং লোভের কারণে কখনই এগুলোকে নষ্ট করা উচিত নয়। এতে শরীয়াতের দৃষ্টিতে যেমনভাবে পাপী হতে হয়, তেমনিভাবে পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতির জন্যও দায়ী হতে হয় যা মানবতার পরিপন্থী এবং যে কোন ধর্মের বিচারেও অন্যায়। পক্ষান্তরে পরিবেশ সংরক্ষণে বৃক্ষরোপণ যেমন উপকারী, মানব সমাজেও তা সম্মানজনক ও সেবামূলক হিসেবে বিবেচিত—আবার মহান আল্লাহর অনন্ত সন্তুষ্টি লাভেরও অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত। আমরা দোআ করি আল্লাহতা’য়ালা আমাদের সকলকে এ গুরুত্বপূর্ণ সত্যটি অনুধাবনের শক্তি দিন—যাতে আমরাও তাঁর প্রিয় হতে পারি। তা হল :“বৃক্ষ নিধন নয় বরং পরিচর্যা করতে হবে, উত্তম পরিবেশ গড়তে, বৃক্ষরোপণ করতে হবে।”
লেখক : খতিব, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ, সাবেক অধ্যক্ষ, সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়া ঢাকা
