বাজেট বক্তৃতায় সম্ভাবনাময় আগামীর পথ নির্দেশনা দিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। অশিতিপর অর্থমন্ত্রী গতকাল উপস্থাপন করলেন তার জীবনের অষ্টম ও বর্তমান মেয়াদে শুরু হওয়া সরকারের প্রথম বাজেট। এবারো তিনি শোনালেন সম্ভাবনার কথা। বাজেট বক্তৃতায় তিনি বলেন, আমার বিশ্বাস আগামী অর্থ বছরের প্রাস্তাবিত বাজেট আমাদের করণীয় কাজগুলো সম্পন্ন করার উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ পথনির্দেশ হিসেবে কাজ করবে। তিনি বলেন, আমি কর্মব্যস্ত আশি বছর অতিক্রম করেছি। অর্জন ও ব্যর্থতার দোলাচলে আমার যথেষ্ট অভিজ্ঞতা রয়েছে। তবে আমি কখনো আশাবাদ ব্যক্ত করতে এবং রাখতে কার্পণ্য করিনি। আমি আগেও বলেছি যে কালো মেঘের আড়ালে আমি সোনালী রেখা দেখতে পাই। বাংলাদেশের অপরিমেয় সম্ভাবনায় এদেশের তরুণদের মতো আমিও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি; অর্থনীতির চালিকা শক্তি হবে উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষ জনশক্তি আর উচ্চতর প্রবৃদ্ধি।
‘অগ্রগতির ধারাবাহিকতা সম্ভাবনাময় আগামীর পথে বাংলাদেশ’ শিরোনামে এবারের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী যেমন আগামীর পথ নির্দেশনা দিলেন; তেমনি অর্থনীতির স্বার্থে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার দিকেও গুরুত্বারোপ করেছেন। প্রারম্ভিক বক্তব্যে তিনি বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথমবার একটি নির্বাচিত সরকার পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পালন শেষে আবারো পূর্ণ মেয়াদে নির্বাচিত হয়েছে। জনগণের এ রায় আমাদের সরকারের ওপর তাদের বিপুল আস্থারই এক অনন্য নজির। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা না থাকা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি সর্বদলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করেন। তিনি বলেন, অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে একটি বড় রাজনৈতিক দল এই নির্বাচনকে অহেতুক বয়কট করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করার চেষ্টা করে। আমরা মনেকরি সরকারের এ ধারাবাহিকতা দেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে উচ্চতর এক সোপানে নিয়ে যাবে। বাজেট বক্তৃতার শুরুতে তিনি বিনম্র চিত্তে স্মরণ করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার-বিরোধী অগণতান্ত্রিক উগ্র সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী শক্তির হাতে নিহত অগণিত শহীদদের স্বরণ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, এই আত্মত্যাগ সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের পথে আমাদের অগ্রযাত্রায় চিরন্তন অনুপ্রেরণার উত্স হয়ে থাকবে।
তিনি বলেন, রূপকল্প ২০২১ কে সামনে রেখে ২০০৯ সালে উন্নয়নের যে অভিযাত্রা শুরু করেছিলাম এ মেয়াদেও তা অব্যাহত থাকবে। গত মেয়াদে আমাদের মূল লক্ষ্য ছিলো অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুদৃঢ় ভিত রচনা করা। অর্থমন্ত্রী বলেন, বিগত মেয়াদের শেষদিকে নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা দেশের অর্থনীতিকে অনেকখানি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে জানুয়ারি পর্যন্ত মোট ৪৫ দিন হরতাল পালন করা হয়েছে। এবারের হরতাল-অবরোধ ১২ বা ২৪ ঘন্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, কোন কোন সময়ে এর কার্যকাল ছিলো সপ্তাহব্যাপী। এর ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়, বন্দরের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে এবং পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে কেনা-বেচা নেমে আসে প্রায় শূন্যের কোটায়। আর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে সরকারের রাজস্ব সংগ্রহের ওপর। এবারের হরতাল-অবরোধের আরেটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংসের মহোত্সব। অর্থমন্ত্রী দাবি করেন, নির্বাচনোত্তর সময়ে অর্থনীতি অতিদ্রুত তার গতি ফিরে পেয়েছে। গত মেয়াদে অর্জনের ফিরিস্তি সংসদে তুলে ধরে তিনি বলেন, সরকারের অন্যতম প্রধান সাফল্য হলো দক্ষতার সাথে বিশ্বমন্দার অভিঘাত মোকাবিলা করা। অন্যদিকে জাতির পিতা ও তার পরিবারবর্গের হত্যার বিচারের রায় কার্যকর, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকাজ সম্পন্নকরণ এবং একজনের ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়েছে। সেসাথে জীবনমান উন্নয়ন, জ্বালানি খাতেও এসেছে উল্লেখযোগ্য সাফল্য। বিভিন্ন খাতের সাফল্য উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী আরো বলেন, এ মেয়াদে আমাদের আর্থ-সামাজিক অর্জনকে সুসংহত করতে চাই এবং পূর্বমেয়াদে গৃহীত দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে দ্রুত অগ্রসর হতে চাই। তিনি বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় এবং জাতীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সকল স্তরে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চাই। এলক্ষ্যে স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ আমাদের অন্যতম নির্বাচনী অঙ্গীকার। সর্বস্তরে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে অধিকতর শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল করার লক্ষ্যে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে।
অর্থমন্ত্রী দাবি করেন, চলতি অর্থ বছরের শুরুতে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৭.২ শতাংশ নির্ধারণ করা হলেও ধারাবাহিক নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চলতে থাকায় অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ফলে এ লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে না। তবে আগামী অর্থ বছরে রপ্তানি, বিনিয়োগ ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। সর্বোপরি অনুকূল আবহাওয়া ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলে ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে ৭.৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। অন্যদিকে রপ্তানি ও আমদানি ব্যয় দুটোই প্রায় ১৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেতে পারে।
তিনি বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটের মূল লক্ষ্য হবে বর্তমানে অনুসৃত রাজস্ব ও মুদ্রা নীতি-কৌশলের ধারাবাহিকতা রক্ষা ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। সেই সাথে চলমান সংস্কার কার্যক্রমের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণ কার্যক্রমকে আরো জোরদার করা হবে।
তিনি বলেন, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা অভিঘাতে আমাদের এগিয়ে চলার পথ নির্বিঘ্ন ছিল না। তা সত্ত্বেও আমরা জনগণের কাছে দেয়া প্রতিশ্রুতি পূরণের প্রত্যয় থেকে কখনো সরে দাঁড়াইনি। আমাদের কার্যক্রম এবং অর্থায়ন পরিকল্পনা উচ্চাভিলাষী কিন্তু আমরা প্রমাণ করেছি যে, উচ্চাভিলাষী কার্যক্রম আমরা বাস্তবায়ন করতে পারি। সংশোধিত বাজেটের ৬৯ শতাংশ বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি।
তিনি বলেন, অপরিমেয় সম্ভাবনার স্বার্থে আমরা চাই একটি অসাম্প্রদায়িক এবং গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র। বাংলাদেশের জনগণও প্রতিটি কঠিন সময়ে এ আদর্শে বিশ্বাস রেখে এগিয়ে গেছেন এবং সাফল্য অর্জন করেছেন। এবারো তার কোন হেরফের হবে বলে আমি মনে করি না। সে বিশ্বাসে অটুট থেকে আমি আহ্বান জানাবো আমাদের দেশের সব রাজনৈতিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশের উন্নয়ন এবং মঙ্গলের স্বার্থে সব রকম সহিংসতা থেকে বিরত থাকতে। প্রতিবাদ ও সমালোচনা অবশ্যই হবে, কিন্তু সেজন্য কোন সহিংস পথ অবলম্বন করা চলবে না। একটি জাগ্রত ও উদ্বৃদ্ধ জাতি কোনমতেই হত্যা এবং ভাংচুরের রাস্তা সহ্য করবে না।
তিনি বলেন, আমরা বঙ্গবন্ধুর সৈনিক, এদেশের মাটি আর মানুষের প্রতি বঙ্গবন্ধুর অকৃত্রিম ভালোবাসার উত্তরাধিকারী। সেই উত্তরাধিকারের শক্তি নিয়ে দৃঢ়চিত্তে বলতে চাই বরাবরের মত জনগণের সুখে-দুঃখে আমরা তাদের পাশে থাকবো। প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর সকল অপতত্পরতা নস্যাত্ করে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে যাবো এক সম্ভাবনাময় আগামীর পথে। উত্তর প্রজন্মের জন্য রেখে যাব এমন এক দেশ, যেখানে থাকবে না দরিদ্র আর বৈষম্য, অনৈক্যের অপছায়া আর অপশাসনের নিষ্পেষণ।
