চ্যালেঞ্জিং টার্গেট

আপডেট : ০৫ জুন ২০১৪, ২৩:২৭
রাজনৈতিক সংঘাতে চলতি অর্থবছরে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ না হওয়ায় আগামী বছরে তা পুষিয়ে নিতে নানা পদক্ষেপ গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত তার বাজেট বক্তৃতায়। গতকাল বৃহস্পতিবার তিনি জাতীয় সংসদে ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব উত্থাপন করেন। বিশাল ব্যয়ভার নিয়ে আশাবাদী অর্থমন্ত্রী দেশকে এগিয়ে নিতে উচ্চাভিলাষী বাজেট বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেছেন, অব্যাহত সংস্কারের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণ কার্যক্রম জোরদার করার প্রয়াসও অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি করখাতে কিছু প্রণোদনা, কর্পোরেট কর হার কমানোসহ কিছু সুবিধার কথা বলেছেন। বলেছেন শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে সুদের হার কমানোর কথা। সরকারিভাবে ভৌত অবকাঠামোখাতে অর্থায়নের ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি। যাতে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা বিনিয়োগের পরিবেশ ও অবকাঠামো সুবিধাদি পায়। চলমান সংস্কার অব্যাহত রাখারও অঙ্গীকার করেছেন তিনি। এসব ‘ভাল’ কাজ করতে গিয়ে সার্বিকভাবে ব্যয়ভার বাড়িয়ে তুলেছেন। ফলে, চ্যালেঞ্জিং টার্গেট বাস্তবায়নের দায় তার কাঁধে রয়েই গেল। অর্থমন্ত্রী আগামী বছরের জন্য মোট ২ লাখ ৫০ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্য স্থির করেছেন। এই ব্যয় করতে গিয়ে আয়ের লক্ষ্যও তাকে বাড়াতে হয়েছে। আয়ের লক্ষ্য স্থির করেছেন ১ লাখ ৮২ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা। সামগ্রিকভাবে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে ৬৭ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা। অবকাঠামো যেমন বিদ্যুত্-জ্বালানি, ভৌত অবকাঠামো প্রভৃতি খাতে ব্যয়ও বেড়েছে। অগ্রাধিকার হিসাবে পদ্মা সেতু খাতে ৮ হাজার ১শ’ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাবে বিনিয়োগ বৃদ্ধির তীব্র আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে। ব্যবসা-ব্যয় হ্রাসের জন্য বিভিন্ন প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে তিনি ব্যক্তিখাতে ঋণপ্রবাহ বাড়িয়ে সুদের হার কমানোর পদক্ষেপ নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ, রফতানি বাড়াতে কিছু খাতে অতিরিক্ত প্রণোদনার কথা বলেছেন। অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসৃজন, সামাজিক সুরক্ষা খাতে বিদ্যমান সুবিধাদি আগামীতেও অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। এসব সুবিধাদি নিশ্চিত করতে রাজস্ব আয়ের চাপ বাড়িয়েছেন তিনি। বেশকিছু খাতে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট আরোপ, উেস করারোপ করা হয়েছে। কিছু খাতে প্যাকেজ ভ্যাট সুবিধা চালু থাকলেও আগামী বছর থেকে প্রমাণ হারে অর্থাত্ ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব করেছেন তিনি। পাশাপাশি পরোক্ষ করনির্ভরতাও বাড়িয়েছেন। ফলে, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের চাপ সাধারণ জনগণের ওপর যথারীতি থাকছেই। বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের অব্যাহত চাপের মুখে সংরক্ষণবাদী নীতি থেকে সরে আসার প্রক্রিয়ায় ঢালাওভাবে ৭৭০টি পণ্যের ওপর আরোপিত সম্পূরক শুল্কহারে পরিবর্তন করা হয়েছে। সম্পূরক শুল্ক হার কমিয়ে ফেলায় দেশীয় শিল্পের প্রতিযোগিতাসক্ষমতা অর্জন জরুরি হয়ে দাঁড়াবে। বাজেটে আয়ের প্রাক্কলন আগামী বছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্ব আয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ১ লাখ ৮২ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা। এরমধ্যে এনবিআরসূত্রে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭২০ কোটি টাকা, এনবিআর বহির্ভূত কর খাত থেকে ৫ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা আয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে। কর বহির্ভূত খাত থেকে আরো ২৭ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা আহরণের লক্ষ্য স্থির করেছেন অর্থমন্ত্রী। তবে চলতি বছরে রাজস্ব আয় কাঙ্ক্ষিত না হওয়ার পেছনে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাবকে দায়ী করা হয়েছে। আগামী বছরে এই আয় বাড়লেও লক্ষ্য অর্জনের চ্যালেঞ্জ থাকছে। উন্নয়ন বরাদ্দ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাবরের মতই অবকাঠামো, শিক্ষা ও সামাজিক খাতে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আঞ্চলিক সমতার বিষয়টিও এবারে গুরুত্ব পেয়েছে অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায়। মোট ৮০ হাজার ৩১৫ কোটি টাকার এডিপির মধ্যে মানবসম্পদ খাতে ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ, সার্বিক কৃষিখাতে ২৫ দশমিক ৮ শতাংশ, বিদ্যুত্ জ্বালানি খাতে ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ, যোগাযোগ খাতে ২৩ দশমিক ৩ শতাংশ এবং অন্যান্য খাতে সোয়া ১২ শতাংশ বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। ঘাটতি অর্থায়ন ঘাটতি অর্থায়নের জন্য বরাবরই অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উত্স থেকে প্রাপ্তির আশা করেছেন অর্থমন্ত্রী। মোট জাতীয় আয়ের ৫ শতাংশ ঘাটতি মেটাতে গিয়ে বৈদেশিক উত্স থেকে ২৪ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা প্রত্যাশা করেছেন। যদিও চলতি বছরে বৈদেশিক উত্স থেকে কাঙ্ক্ষিত সাহায্য মেলেনি। একইভাবে অভ্যন্তরীণ উত্স থেকে ৪৩ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা সংগ্রহের আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তিনি। এই টাকার মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে নেয়া হবে ৩১ হাজার ২২১ কোটি টাকা। সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য খাত থেকে আসবে ১২ হাজার ৫৬ কোটি টাকা। ঘাটতি অর্থায়নের জন্য সাধারণত এই তিনটি উত্স থেকে আশা করা হলে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকেই বেশি ঋণ নিতে হয় সরকারকে। এই ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে যায়। চলতি বছরেও তাই হয়েছে। সংশোধিত বাজেট চলতি অর্থবছরে (২০১৩-২০১৪) মূল বাজেটে সর্বমোট সরকারি ব্যয়ের প্রাক্কলন ছিল ২ লাখ ২২ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা। যা সংশোধিত বাজেটে ৬ হাজার ২৬৯ কোটি টাকা হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১৬ হাজার ২২২ কোটি টাকা। প্রকল্প সাহায্য হ্রাস পাওয়ায় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বরাদ্দ কিছুটা হ্রাস পেয়ে ৬০ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। সব মিলিয়ে সংশোধিত এডিপি’র আকার দাঁড়িয়েছে ৬৩ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা। ২০১৩-১৪ অর্থবছরের মূল বাজেটে সার্বিক রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিলো ১ লাখ ৬৭ হাজার ৪৫৯ কোটি টাকা যা সংশোধিত বাজেটে ১০ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা হ্রাস করে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৬৭১ কোটি টাকা ধার্য করা হয়েছে। অন্যদিকে মূল বাজেটে প্রাক্কলিত ঘাটতি ধরা হয়েছিল জিডিপি’র ৪.৬ শতাংশ। সংশোধিত বাজেটে তা সামান্য বৃদ্ধি পেয়ে ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এ ঘাটতির মধ্যে বৈদেশিক উত্স থেকে জিডিপি’র ১.৬ শতাংশ এবং অভ্যন্তরীণ উত্স থেকে জিডিপি’র ২.৫ শতাংশের সংস্থান করা হবে। উপসংহার অর্থমন্ত্রী তার বক্তৃতায় আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, ‘বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ বাস্তবতার নিরিখে যে বাজেট কাঠামোটি আগামী অর্থবছরে বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছি তা যেমন প্রবৃদ্ধি সহায়ক হবে, তেমনি মূল্যস্ফীতিকে সংযত রাখবে। জনগণ এতে তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন দেখবেন।’ অর্থমন্ত্রীর এই বক্তৃতা যেন শুধু কথার কথাই না হয়।