পাথর টেনে জীবন চলে ওদের

আপডেট : ০৬ জুন ২০১৪, ২২:৫৩
তাদের পরনে শাড়ি, কেউ কেউ মাথায় একটা টুপি দিয়ে ্পলিথিন আটকে রেখেছেন। পানিতে যেন না ভিজে যান। কিন্তু বাস্তবতা হল তারা সকলেই কাদামাটি আর পানিতে ভিজে একাকার। তারপরও মাথায় ঝুড়িতে এক থেকে দুই ফুট পরিমাণ পাথর বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিদিন ভেজা গায়েই ওদের পাথর টানতে হয়, ওরা সিলেটের ভোলাগঞ্জের পাথর শ্রমিক। ভোলাগঞ্জ সীমান্তে ধলাই নদীর তীরে গড়ে উঠেছে এই পাথর শিল্প। স্থানীয়রা বলেন, ‘পাথরের কোয়ারি’। এই কোয়ারিতে কাজ করেন অধিকাংশই নারী শ্রমিক। পারিশ্রমিকে বৈষম্য না থাকলেও তারা শ্রমিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। নারী শ্রমিকরা জানান, প্রায় প্রতিদিনই গা ব্যথ্যা আর জ্বর নিয়েই তাদের কাজ করতে হয়। প্রায়ই যেতে হয় ডাক্তারের কাছে। মহাজনরা তাদের কাজের পারিশ্রমিক দেন। অন্য সুবিধাগুলো দেখার মতো পরিস্থিতি এখানে নেই। ভোলাগঞ্জের ১০নং পাথর কোয়ারিতে প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার শ্রমিক কাজ করেন বলে জানালেন কোয়ারি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান বশির এন্টারপ্রাইজের ম্যানেজার নান্টু সিংহ। তিনি বলেন, শ্রমিকদের দুই -তৃতীয়াংশই নারী। শ্রমিকরা সকাল ৭টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত নৌকা থেকে পাথর তোলা, ট্রাকে তোলা, পাথর ক্রাশ করা, পাথরের সাথে পানি মেশানো, বিভিন্ন আকারের পাথর আলাদা করাসহ নানা রকম কাজ করে। এই কাজে তাদের সাথে নারীদের কোন পার্থক্য নেই বলে জানান পুরুষ পাথর শ্রমিক সাদেক মিয়া। প্রতিদিন তিনি যে পরিমাণ পাথর টানতে পারেন, আর যে পরিমাণ আয় করেন তার সমপরিমাণ কাজ আর আয় করেন আয়শা আক্তার, আসমা বেগমসহ অন্য নারী শ্রমিকেরা। কোয়ারির অদূরে বউ বাজারে থাকেন আয়শা আক্তার। আয়শা প্রায় নয় বছর ধরে পাথর টানেন। তার সারা শরীর ভেজা, কপালে বলিরেখা, তামাটে গায়ের রঙ। আয়শার কথা বলার ফুরসত নেই। কারণ কথা বললেই সময় নষ্ট। তারপরও কয়েকবার প্রশ্ন করলে তিনি জানান, সকালে ভাত খেয়ে দুপুরের ভাত নিয়ে নদীতে চলে আসেন। নদীর মাঝখানে বোমা মেশিন কিংবা শ্যালো মেশিন ব্যবহার করে মাটি সরিয়ে পাথর তোলা হয়। নদীর মাঝখান থেকে বিশেষ নৌকা (বারকি নাও) ভরে পাথর আসে। সেই নাও খালি করেন তিনি। একটি নাও খালি করে ৮০ টাকা পান। একটি বারকিতে থাকে ৮০-৯০ ফুট পাথর। প্রতিদিন তার আয় হয় চার থেকে পাঁচ’শ টাকা। আয়শার সহকর্মী রোকসানা, জাহানারাসহ আরও কয়েকজন নারী শ্রমিক জানান, তারা সারাদিন কাজের মধ্যে কোন ‘প্রাকৃতিক কাজ’ করেন না। কারণ এই এলাকায় কোন টয়লেট নেই। খুব অসুবিধা হলে মহাজনদের টয়লেটে যান, তবে সেটা খুবই দুরূহ বিষয়। এ কথার সত্যতা স্বীকার করেন ম্যনেজার নান্টুসহ অন্য শ্রমিকরা। এদিকে বিশাল এই এলাকা জুড়ে নেই কোন স্কুল বা মাদ্রাসা। তাই এই শ্রমিকদের সন্তানেরা বঞ্চিত শিক্ষার আলো থেকেও। অনেক শ্রমিক মনে করেন, অন্য কাজের চেয়ে একাজে পারিশ্রমিক বেশি। তাই অনেকে অল্প দিনে বেশি আয়ের আশায় ছেলে-মেয়েকে অন্যত্র পড়াশুনার জন্য রেখে আসেন। কিন্তু জাহানারা জানান, আয় বেশি হলেও নিত্যজ্বর আর গা ব্যথার ওষুধ কিনে তিনি কুলাতে পারেন না। তিনি আরো জানান, বর্ষার কয়েক মাস এই কাজের ‘অফ সিজন’। তখন তাদের বসেই থাকতে হয়। তবে বর্ষা শেষ হলেই শুরু হয় সরগরম পাথরের কারবার।