রাজধানীতে ‘বিশুদ্ধ’ পানির দূষিত বাণিজ্য জমে উঠেছে। পানি সংকটকে পুঁজি করে বোতল ও জারে করে বিশুদ্ধ পানির নামে ভেজাল ও নিম্নমানের পানি বিক্রি হচ্ছে অবাধে। এতে সাধারন মানুষ প্রতারিত হচ্ছেন। এসব ভেজাল পানি পান করে অনেকেই স্বাস্থ্য সমস্যায় পড়ছেন। অন্যদিকে লাভবান হচ্ছে সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র। তারা রাজধানীতে প্রতিদিন ভেজাল পানি সরবরাহ করে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। তাই পানি নিয়ে এই বাণিজ্য রোধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
পানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত ইত্তেফাককে বলেন, পানির মূল উত্স নষ্ট হওয়ায় পানি সংকট দিন দিন ঘণীভূত হচ্ছে। জার ও বোতলজাত পানিতে ছেয়ে গেছে পুরো শহর। পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই সরবরাহকৃত এসব পানিতে আর্সেনিক থাকারও আশংকা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এতে করে জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়েছে।
বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস এন্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউশন-বিএসটিআই এর দেয়া তথ্য মতে, রাজধানীতে প্রতিদিন নানা ব্র্যান্ডের বোতলজাত পানি বিক্রি হয় প্রায় পাঁচ কোটি লিটার। জারজাত পানি ও অন্যান্য মাধ্যমে পূরণ হয় আরো প্রায় ১৫ কোটি লিটার পানির চাহিদা। নগরীর কয়েক লাখ মানুষই এ পানির ক্রেতা। কিন্তু নিরাপদ ও সুস্থ থাকতে বেশি দামে ক্রেতারা এ পানি কিনলেও অনুসন্ধানে মিলেছে ভয়াবহ চিত্র।
শৌচাগারের পানি জারে:সরেজমিনে দেখা গেছে, পুরান ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারের কাছে নাজিমুদ্দিন রোডের একটি বাসার শৌচাগারের পানির কল থেকে জারে ঢুকিয়েই পানি বাজারজাত করছে ‘পদ্মা মিনারেল ওয়াটার’ নামের একটি কোম্পানি। একই চিত্র লক্ষ্য করা গেছে সদরঘাট টার্মিনাল এলাকায়। সেখানে রাতের আঁধারে ওয়াসার লাইনের পানি চুরি করে বোতলজাত করে মিনারেল ওয়াটার হিসাবে নানা কোম্পানির মোড়কে বাজারজাত করা হচ্ছে। এসব দূষিত পানি টাকা দিয়ে কিনে পান করছেন লঞ্চযাত্রী ও সাধারণ মানুষ। এছাড়া রাজধানীর কামরাঙ্গীর চর, লালবাগ, নবাবগঞ্জ, সুত্রাপুর ও পাশের কেরানীগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের একাধিক নকল মিনারেল ওয়াটার কারখানা রয়েছে বলে বিএসটিআই সূত্রে জানা গেছে।
কামরাঙ্গীর চরের সুলতানগঞ্জ এলাকায় দেখা গেল, শেওলাযুক্ত একটি টিউবওয়েল থেকে ভেতরের একটি কক্ষে পানির তিনটি সংযোগ টানা। ভেতরের ওই কক্ষে থরে থরে সাজানো মিনারেল ওয়াটারের জার। টিউবওয়েলের পানি এসব জারে ঢুকিয়ে তা মিনারেল ওয়াটার নামে বাজারজাত করছেন আলমগীর হোসেন নামে এক ব্যক্তি। তিনি জানান, বিএসটিআই এর কোন অনুমোদন তার নেই। তবে ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্স রয়েছে। স্থানীয়রা জানান, এই কারখানায় একাধিকবার অভিযান হয়েছে। জেল-জরিমানা সত্ত্বেও অবৈধ পানি ব্যবসা বন্ধ হয়নি। পুলিশসহ বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায় করে থাকে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে বিএসটিআই কর্তৃপক্ষ গত ৩ মাসে সীলগালা করেছে এ ধরনের একাধিক কারখানা। জরিমানা আদায়সহ বাতিল করেছে আরো অর্ধশতাধিক কোম্পানির রেজিস্ট্রেশন। নকল ও ভেজাল পানি বোতলজাতকারীদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলাও করেছে। তবুও বন্ধ হচ্ছে না ভেজাল পানির এই রমরমা ব্যবসা। দেখা গেছে, ভ্রাম্যমাণ আদালত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে দণ্ড দিলেও তারা ভিন্ন নামে বাজারে মিনারেল ওয়াটারের জমজমাট ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।
জানা গেছে, বিএসটিআই পানি বাজারজাতের জন্য রাজধানীতে দেড় শতাধিক প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দিলেও কার্যক্রম চালাচ্ছে সহস্রাধিক প্রতিষ্ঠান। মিনারেল ওয়াটার উত্পাদন ও বাজারজাতের আগে নিজস্ব ল্যাবরেটরী, সুরক্ষিত সেপটিক ট্যাংক, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কেমিস্ট, শ্রমিকদের সুস্থতা, নিয়মিত টেস্টিং রিপোর্ট দেয়াসহ বিএসটিআইএর ১৯টি অত্যাবশ্যকীয় শর্ত থাকলেও তা মানছে না কেউই। একইভাবে নিবন্ধিত কারখানাগুলো পরিদর্শন ও বাজারজাতকৃত পানির নমুনা নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার কথা থাকলেও বিএসটিআই তা যথাযথভাবে পালন করছে না বলে অভিযোগ আছে।
এ ব্যাপারে বিএসটিআই’র উপ-পরিচালক মো. সেলিম রেজা ইত্তেফাককে বলেন, ঢাকা ওয়াসার পানিতে দুর্গন্ধ ও পানি সংকটকে পুঁজি করে শহরময় সহস্রাধিক পানি বিক্রয় কোম্পানি গড়ে উঠেছে। যাদের অধিকাংশেরই বিএসটিআই সনদ নেই। ইতিমধ্যে বাতিল করা হয়েছে এমন ৫৭টি কোম্পানির রেজিষ্ট্রেশন। জেল-জরিমানা আদায়সহ গত এক বছরে মামলা হয়েছে সহস্রাধিক। তারপরও ভেজাল পানির দাপট থামছে না। এ ব্যাপারে জনগণকে সচেতন হবার আহবান জানান তিনি। তবে বিএসটিআই সঠিক ভাবে দায়িত্ব পালন করছে কি না-সে ব্যাপারে তিনি কোন মন্তব্য করেননি।
বাড়ছে রোগ-ব্যাধি: এদিকে এসব দূষিত পানি পান করে রাজধানীতে অনেকেই টাইফয়েড, ডায়রিয়া, আমাশয়, জন্ডিসসহ পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এমনকি শিশুদের মৃত্যু পর্যন্ত হচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিদিন গড়ে পাঁচ শতাধিক রোগী আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র (আইসিডিডিআরবি) হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। এদের মধ্যে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশই ডায়রিয়া বা কলেরার রোগী। আবার ভর্তি হওয়া রোগীদের ৪০ শতাংশই শিশু। এ ব্যাপারে দেশের বিশিষ্ট চিকিত্সক অধ্যাপক ডা. এম মুজিবুল হক ইত্তেফাককে বলেন, নকল, ভেজাল ও দূষিত পানি পানের কারণে রাজধানীতে ডায়রিয়ার তীব্রতা বেড়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে শিশুদের সংখ্যাই বেশি বলে তিনি জানান।
অন্যদিকে ভেজাল পানি ব্যবসায়ীদের এমন দৌরাত্ম্যের কারণে শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করেও লাভের মুখ দেখছে না ঢাকা ওয়াসার বিশুদ্ধ পানি উত্পাদনকারী প্রকল্প ‘শান্তি মিনারেল ড্রিংকিং ওয়াটার’। এ বিষয়ে ওয়াসার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইত্তেফাককে বলেন, ‘শান্তি’ শুরুতে একটি লাভজনক প্রকল্প ছিল। তবে নকল ও ভেজাল কোম্পানির দাপট ও ওয়াসার কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার কারণে প্রকল্পটি বর্তমানে মুখ থুবড়ে পড়েছে।
রাজধানীতে দূষিত পানির ব্যবসা প্রসঙ্গে ঢাকা ওয়াসার চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রহমতুল্লাহ ইত্তেফাককে বলেন, গ্রীষ্মকালে নগরীতে পানির চাহিদা তুলনামূলক বাড়ে। এই সংকটকে পুঁজি করে একাধিক পানি উত্পাদনকারী কোম্পানি গজিয়ে উঠেছে। এদের অনেকেই ওয়াসার পানি চুরি করে বোতল ও জারে ভর্তি করে তা মিনারেল ওয়াটার নামে বাজারজাত করছে। এ ব্যাপারে তিনি বিএসটিআইসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে এগিয়ে আসার আহবান জানান। এছাড়া শিগগিরই নগরবাসীর পানি সংকট দূর হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
