আয়করের আওতা বাড়ানোর উদ্যোগ

আপডেট : ০৭ জুন ২০১৪, ২৩:০৯
বর্ধিত কর আদায়ের লক্ষ্যে বেশকিছু খাতে নতুন আয়কর আরোপ করা হয়েছে। অন্যদিকে বিদ্যমান করের হারও বাড়ানো হয়েছে। বিত্তবানরা এক্ষেত্রে ‘টার্গেট’ হলেও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর করদাতারা স্বস্তি পান নি। বরং নতুন বেশকিছু খাতে উেস কর (চূড়ান্ত করদায় হিসেবে) আরোপ করা এবং নতুন করের হার বাড়ানোর ভার তাদের উপর পড়বে। অন্যদিকে জেলা, উপজেলা এমনকি গ্রাম পর্যায়েও করের আওতা বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব এলাকার ‘সক্ষম’ ব্যক্তিদের কর জালে আনতে বেশকিছু খাতে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর বাইরে বিত্তবানদের উপরে বিভিন্ন উপায়ে বিদ্যমান করের হার বাড়ানো হয়েছে। অবশ্য অর্থীনীতিবিদরা মনে করেন, সাধারণ মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে স্বস্তি দিয়ে বিত্তবানদের উপর বেশি হারে কর আরোপ হওয়া উচিত। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত নিজেও ধনীদের উপর বাড়তি হারে কর আরোপের যুক্তিতে বাজেট বক্তৃতায় ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য কমানোর কথা বলেছেন। আসছে অর্থ বছরে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৫৭০ কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আদায় করতে হবে আয়কর খাত থেকে। এককভাবে এই খাত থেকেই আদায় করতে হবে ৫৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। চলতি অর্থ বছরের তুলনায় এটি প্রায় ২৬ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থ বছর সাড়ে ৪৮ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও রাজনৈতিক অস্থিরতায় পরবর্তীতে লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে দেয়া হয়। তবে কমিয়েও লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে সংশয় রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে আগামী অর্থ বছরে বর্ধিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বেশ কিছু খাতে কর বাড়াতে ‘আগ্রাসী’ ভূমিকা নিয়েছে। এ লক্ষ্যে অগ্রিম আয়কর (এআইটি) হিসেবে উেস আয়করের বেশকিছু খাতে করের হার বাড়ানো হয়েছে। জমি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে গুরুত্ব বিবেচনায় প্রতি কাঠার নিবন্ধন মূল্যের উপর ১ থেকে ৪ শতাংশ হারে উেস কর আরোপের প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। এছাড়া লিজ দলিল নিবন্ধনে ৪ শতাংশ আরোপ হবে। জমি বিক্রয়ের ক্ষেত্রে নতুন করে উেস কর আরোপের মাধ্যমে বড় অঙ্কের রাজস্ব আদায় করতে চায় এনবিআর। বোতলজাত পানির ভ্যাটের উপর বাড়তি ৩ শতাংশ হারে অগ্রিম কর আরোপ করা হয়েছে। ফলে সব ধরনের বোতলজাত পানির দাম বেড়ে যাবে। একই হারে কর আরোপ করা হয়েছে ইটভাটার উপরও। স্বর্ণ, রৌপ্য ও মোবাইল ফোনসেট আমদানিকালে ৫ শতাংশ উেস কর কর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। কুইক রেন্টালে বিদ্যমান উেস কর ৪ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬ শতাংশ করা হয়েছে। মোবাইল ফোন কোম্পানির লাইসেন্স ফি, স্পেকট্রাম লাইসেন্স ফি, রেভিনিউ শেয়ারিংয়ের অর্থ পরিশোধকালে ১০ শতাংশ, জীবন বীমার পরিশোধিত প্রিমিয়ামের অতিরিক্ত মুনাফায় ৫ শতাংশ, ট্রেজারি বন্ড, ট্রেজারি বিল ও ডিবেঞ্চারের উপর ৫ শতাংশ, অনলাইন বিজ্ঞাপনের উপর ৩ শতাংশ, ভাড়ায় চালিত জল ও স্থল যান, ব্যক্তিগত যানবাহনের নিবন্ধন বা ফিটনেস নবায়নকালে, জ্বালানি তেল শোধনাগার কোম্পানি এবং তেল বিপণনকারী ডিলারের বিল পরিশোধকালে ১ থেকে ৩ শতাংশ হারে কর আরোপ হচ্ছে। এর বাইরে বিত্তবানদের উপর বাড়তি হারে কর আরোপ হচ্ছে। বছরে ৪৪ লাখ ২০ হাজার টাকার বেশি আয় করলে তাদেরকে ‘সুপার ট্যাক্স গ্রপ’-এ অন্তর্ভুক্ত করে বাড়তি হারে কর আদায় করা হবে। ২ কোটি টাকার অধিক সম্পদ রয়েছে এমন বিত্তশালীদের উপরও বাড়তি হারে কর আদায় হবে। রাজস্ব বোর্ডের হিসাবে ২ কোটি টাকার উপর সম্পদ রয়েছে দেশে এমন বিত্তশালীর সংখ্যা ৫ হাজারের কিছু বেশি। প্রতি বছর ১ কোটি টাকার উপরে কর দেয় এমন করদাতার সংখ্যা ৫০ জনের কিছু বেশি। অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারকাত মনে করেন, দেশে ১ কোটি টাকার উপর কর দেয়ার সক্ষমতা রয়েছে এমন ব্যক্তির সংখ্যা কমপক্ষে ৫০ হাজার। তাদের কাছ থেকে সঠিক উপায়ে কর আদায়ের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, তাদের কাছ থেকে কর আদায় করতে পারলে বাড়তি ৫০ হাজার কোটি টাকা আয়কর আদায় করা সম্ভব। এছাড়া পরিবেশ বিনষ্টকারী শিল্পের উপর ‘গ্রিন ট্যাক্স’ নামে তাদের প্রদত্ত ভ্যাটের বাইরে বাড়তি ১ শতাংশ হারে কর আদায় করা হবে। অন্যদিকে তামাক উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠানের উপর ‘উন্নয়ন সারচার্জ’ নামে বাড়তি কর আরোপ করা হয়েছে। বাড়িওয়ালাদের কর ফাঁকি রোধে কোন বাড়িতে মোট ২৫ হাজার টাকার বেশি বাড়ি ভাড়া আদায় হলে তা ব্যাংকের মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে। বেশকিছু খাতে টিআইএন নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অর্থাত্ টিআইএন থাকলে প্রতি বছর বাধ্যতামূলকভাবে আয়কর বিবরণী দাখিল করতে হবে। এর মাধ্যমেও বাড়তি কর আসবে বলে মনে করে এনবিআর। এক লাখ টাকার বেশি অঙ্কের কোনো চুক্তিনামা করতে টিআইএন লাগবে। টিআইএন বাধ্যতামূলক হয়েছে উপজেলা, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও। যারা আগে থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা করছেন অথচ টিআইএন নেই, তাদের লাইসেন্স নবায়নের আগেই টিআইএন নিতে হবে। কোনো টেলিফোনে আইএসডি সংযোগ নেয়া, কোম্পানির পরিচালক বা উদ্যোক্তা-পরিচালক হওয়া, নিকাহ্ রেজিস্ট্রারের সনদ নেয়া এবং কোনো বাণিজ্য-সংগঠনের সদস্যপদ নবায়ন করার জন্যও এখন টিআইএন থাকা বাধ্যতামূলক হবে। বাস, ট্রাক, প্রাইম মুভার, লরি ইত্যাদির নিবন্ধন, মালিকানা পরিবর্তন ও ফিটনেস নবায়ন, জলযানের নিবন্ধন, মালিকানা পরিবর্তন ও ফিটনেস নবায়নেও টিআইএন নম্বর থাকতে হবে। এর ফলে অধিক পরিমাণ টিআইএনধারী হবে এবং তারা করের আওতায় আসবে বলেও মনে করে এনবিআর।