চিকিত্সা বিজ্ঞানের অন্যতম হাতিয়ার হেলথ টেকনোলজিস্ট। রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার মূল দায়িত্ব তাদের উপর নির্ভরশীল। এছাড়াও প্রাথমিক চিকিত্সা সেবার ক্ষেত্রে তাদের অবদান বেশি। কিন্তু এ গুরুত্বপূর্ণ জনবল তৈরির প্রতিষ্ঠানসমূহ ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজিতে (আইএসটি) শিক্ষাদানের কোন উন্নয়ন ঘটেনি। নেই অভিজ্ঞ শিক্ষক। শিক্ষাদানের সিলেবাসসহ অন্যান্য কারিকুলাম আধুনিক যুগে এসেও পিছিয়ে আছে অনেক। আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে যার মিল নেই এবং স্বীকৃতিও নেই। এই সব প্রতিষ্ঠানের দেখভাল করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা যেন অন্ধ এবং তাদের কোনো ধ্যান ধারণাও নেই। গতকাল শনিবার হেলথ টেকনোলজি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে এই প্রতিনিধি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের কয়েক কর্মকর্তার কাছে জানতে চাইলে তারা এমন ভাব দেখান যে, ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি নামে যে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তাও তারা ভুলে গেছেন।
পরে খোঁজ-খবর নিয়ে দুই শীর্ষ কর্মকর্তা এ প্রতিনিধিকে ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি সম্পর্কে কিছু তথ্য জানান। এতে সহজেই প্রতীয়মান হয় যে হেলথ টেকনোলজি প্রতিষ্ঠানগুলো কত অবহেলিত। প্রথমে ১৯৬৩ সালে রাজধানীতে প্রথম হেলথ টেকনোলজি প্রতিষ্ঠানের শুরু। পর্যায়ক্রমে ঢাকার বাইরে আরও ৭টি হেলথ টেকনোলজি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সরকারি পর্যায়ে এ বিষয়ে ৮টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ৫১ বছরে চিকিত্সা সেবাদানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের দক্ষ জনবল তৈরির প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি প্রতিষ্ঠানগুলো নাজুক অবস্থা থেকে আজও বের হতে পারেনি। ছাত্র-ছাত্রীরা জানায়, দুর্বল কোর্স কারিকুলামের কারণে ৫১ বছর ধরে নিম্নমানের শিক্ষা গ্রহণ করে হেলথ টেকনোলজিস্ট বের হয়ে আসছে। অনভিজ্ঞ কর্মকর্তা দিয়ে এই প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনা করা হচ্ছে এবং শিক্ষাও দেয়া হচ্ছে অনভিজ্ঞ শিক্ষক দিয়ে। এর মধ্যে সম্প্রতি ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজির ৮টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২টিতে বিএসসি কোর্স চালু করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজিতে ৪টি বিষয়ে ও রাজশাহী ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজিতে ২টি বিষয়ে বিএসসি কোর্স চালু করা হয়। এই কোর্সগুলো পরিচালনা কিংবা শিক্ষাদানের জন্য অভিজ্ঞ শিক্ষক নেই। ডিপ্লোমাধারী শিক্ষক দিয়ে বিএসসি কোর্সে অধ্যয়নরত ছাত্র-ছাত্রীদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়- যা ৮ম শ্রেণির শিক্ষক দিয়ে উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষাদানের মতো। ঢাকার বাইরে অপর ৭টি ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি রয়েছে রাজশাহী, বগুড়া, রংপুর, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল ও ঝিনাইদহে। এর মধ্যে ঢাকা মহাখালীতে রয়েছে ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজির অন্যতম প্রতিষ্ঠান। সরেজমিনে এ প্রতিষ্ঠানে গিয়ে দেখা যায়, চারপাশে অস্বাস্থ্যকর নোংরা পরিবেশ। ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষাদানের নেই প্রয়োজনীয় উপকরণ। ক্লাস রুম ও হোস্টেলের সংকট বহুদিনের। অভ্যন্তরীণ পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর। এ প্রতিষ্ঠানের অধ্যাপকের পদটি সহযোগী অধ্যাপকের পদমর্যাদার শিক্ষকের। অথচ মেডিক্যাল অফিসার দিয়ে এ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের অধ্যাপাকের দায়িত্ব পালন করা হচ্ছে বহুদিন ধরে। বর্তমানে অধ্যক্ষের দায়িত্বে নিয়োজিত ডা. জালাল আহমেদ চলতি দায়িত্বে রয়েছেন। তাকে গতকাল শনিবার কয়েক দফা ফোন করেও পাওয়া যায়নি। এ অব্যবস্থাপনার ও নিম্নমানের প্রশিক্ষণের মান উন্নয়নে ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে দারুণ ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজমান। যে কোনো মুহূর্তে আন্দোলনের মাধ্যমে এর বিস্ফোরণ ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। ৮টি ইন্সটিটিউটকে আন্তর্জাতিক মান সম্পন্ন করা, অব্যবস্থাপনা নিরসনে অভিজ্ঞ শিক্ষক নিয়োগসহ ১১ দফা দাবিতে ছাত্র-ছাত্রীরা আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (মেডিক্যাল এডুকেশন) অধ্যাপক ডা. এম এ হান্নান বলেন, ইন্সটিটিউট অব হেলথ টেকনোলজির কারিকুলাম ও সিলেবাস আন্তর্জাতিক মানের করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ নিয়ে কার্যক্রম চলছে বলেও তিনি জানান। চার বছর মেয়াদী এ হেলথ টেকনোলজি কোর্সগুলো হচ্ছে ল্যাবরেটরি মেডিসিন, ডেন্টিস্ট্রি, রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং, ফিজিও থেরাপি, রেডিও থেরাপি ও সেনিটারি ইন্সপেক্টারশিপ।
প্রতি বছর সরকারিভাবে প্রশিক্ষণ নিয়ে কয়েক এসব বিষয়ে ডিপ্লোমাধারী জনবল বের হচ্ছে। স্বাস্থ্য সার্ভিসের চিকিত্সকসহ অন্যান্য বিষয়ের জনবল বৃদ্ধির জন্য সরকারি হাসপাতালসমূহে পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। নিয়োগও দেয়া হয়েছে। অথচ হেলথ টেকনোলজিস্টদের জন্য কোনো পদ সৃষ্টি করা হয়নি। শুরুতে সারাদেশে সরকারি হাসপাতালে প্রায় ৬ হাজার পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও এ বিষয়ে পদ সৃষ্টি করা হচ্ছে না। তাই চাকরির অপেক্ষায় বেকার রয়েছেন কয়েক হাজার হেলথ টেকনোলজিস্ট। এমনকি বেসরকারি হাসপাতাল ক্লিনিক ও ডায়াগনেস্টিক সেন্টারের বেশিরভাগ মালিক বছরের পর বছর ধরে আয়া সুইপার দিয়ে হেলথ টেকনোলজিস্টদের কাজ করাচ্ছেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ভুল এবং ঘটছে নানা অপ্রীতিকর ঘটনা। মার খাচ্ছেন চিকিত্সকরা। এ বিষয়গুলো দেখার কেউ নেই। ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার, ডিপ্লোমা কৃষিবিদ ও ডিপ্লোমাধারী সিনিয়র নার্সদের পদ এন্ট্রি পয়েন্টে দ্বিতীয় শ্রেণির পদমর্যাদা করা হলেও হেলথ টেকনোলজিস্টরা এটি বঞ্চিত। তাদের কোনো পদোন্নতির সুযোগ নেই। শুধু প্যাথলজি ল্যাবরেটরিতে ডিপ্লোমাধারীদের জন্য কিছু পদোন্নতির সুযোগ রয়েছে বলে হেলথ টেকনোলজিস্ট এসোসিয়েশনের নেতা সেলিম মোল্লা জানান।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. দ্বীন মোহাম্মদ নুরুল হক বলেন, হেলথ টেকনোলজিস্ট স্বাস্থ্য সার্ভিসের অতীব জরুরি দায়িত্বে নিয়োজিত। তাদের প্রশিক্ষণ এবং কারিকুলাম আন্তর্জাতিক মানের করার জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রশিক্ষণে অভিজ্ঞ জনবল ও নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বাধিক গুরুত্ব এবং অন্যান্য সমস্যা নিরসন করা হবে বলে তিনি জানান।
