নিশ্চিত হোক মায়ের অধিকার

আপডেট : ২৭ মে ২০১৯, ২১:১৩

যেকোনো নারীর চিরন্তন পরিচয় ‘মা’ এবং মা পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরতম শব্দ। মাতৃত্বের মধ্য দিয়ে বংশানুক্রম ধারা টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব বর্তায় মায়ের ওপরই। আর নারীর পূর্ণতাও আসে মাতৃত্বে। একথা অনস্বীকার্য যে, একজন মায়ের গর্ভকালীন সুস্থতাই পারে একটি সুন্দর ও সুস্থ শিশু জন্ম দিতে। তাই নিরাপদ মাতৃত্ব প্রতিটি মায়ের অধিকার। কিন্তু বাস্তবে আমাদের দেশে মাতৃত্ব আসলে কতটুকু নিরাপদ, তা পর্যালোচনার দাবি রাখে। একটি পরিসংখ্যানে জানা যায়, প্রতিবছর সারা বিশ্বে প্রায় ২১ কোটি নারী গর্ভবতী হয়, এর দুই কোটিরও বেশি গর্ভজনিত স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগেন এবং আশি লাখের জীবনাশঙ্কা দেখা দেয়। এখনো আমাদের দেশে প্রতি ১ লাখ জীবিত জন্মে ১৭২ জন নবজাতকের মৃত্যু ঘটছে। প্রসবকেন্দ্রিক মোট মাতৃমৃত্যুর ৭৩ শতাংশ ঘটছে প্রসব পরবর্তী সময়ে। আর প্রথম ২৪ ঘণ্টাতেই মারা যায় মোট মাতৃমৃত্যুর ৫৬ শতাংশ। দেশে গর্ভপাতও বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে। এখনো বাড়িতে প্রসব হচ্ছে ৫৩ শতাংশ প্রসূতির, প্রতিদিন মারা যাচ্ছে ১৫ জন প্রসূতি। গরিব, অসচ্ছল জনগণের মধ্যে জটিলতায় ভোগার আশঙ্কা বেশি। মূলত গর্ভকালীন জটিলতা, দক্ষ স্বাস্থ্যসেবার অভাব, প্রয়োজনীয় যত্ন ও পুষ্টির অভাব, পরিবারের অসচেতনতা, প্রসব পরবর্তী সেবাযত্নের অপ্রতুলতা ইত্যাদি একজন মাকে ঠেলে দিচ্ছে সীমাহীন অনিশ্চয়তা, দুর্ভোগ আর কষ্টের মুখে। সঙ্গে সঙ্গে গর্ভজাত সন্তানটিও পড়ছে ঝুঁকির মধ্যে।

প্রতিবছর ২৮ মে বিশ্বব্যাপী ‘আন্তর্জাতিক নারী স্বাস্থ্য দিবস’ হিসেবে ১৯৮৭ সাল থেকে ‘নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস’ পালিত হয়ে আসছে। মাতৃ স্বাস্থ্যের প্রতি গুরুত্ব ও এর কার্যকারিতা অনুধাবন করে ১৯৯৭ সাল থেকে বাংলাদেশেও যথাযথভাবে নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস হিসেবে পালন করা শুরু হয়। প্রতিবারই একটি করে প্রতিপাদ্য বিষয় থাকে যেমন, ‘কমাতে হলে মাতৃমৃত্যু হার, মিডওয়াইফ পাশে থাকা একান্ত দরকার’, ‘প্রতিটি জন্মই হোক পরিকল্পিত, প্রতিটি প্রসব হোক নিরাপদ’, ‘নিরাপদ প্রসব চাই, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চলো যাই’, ‘সকল প্রসূতির জন্য মানসম্মত সেবা আমাদের অঙ্গীকার’ ইত্যাদি। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো—‘মর্যাদা ও অধিকার, স্বাস্থ্য কেন্দ্রে প্রসূতি সেবায় অঙ্গীকার।’ মা ও শিশুমৃত্যু রোধ এবং তাদের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার বিষয়ে সবাইকে সচেতন করার পাশাপাশি এসব সমস্যা প্রতিরোধসহ মাতৃস্বাস্থ্য, নিরাপদ প্রসব, পুষ্টি ও স্বাস্থ্য সেবার গুণগতমান বৃদ্ধি সম্পর্কে মা, পরিবার ও সমাজের সকল স্তরে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সকলের প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করাই এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য। শিশুর জন্মদান ও মাতৃত্ব সম্পর্কিত সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা ও এগুলোর সুষ্ঠু সমাধানের বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করা এই দিবসটির অন্যতম উদ্দেশ্য। সেইসঙ্গে নিরাপদ মাতৃত্বকে নারীর অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং নবজাতকের মৃত্যুর হার কমিয়ে আনার মতো বিষয়গুলো হচ্ছে নিরাপদ মাতৃত্ব দিবসের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

নিরাপদ মাতৃত্বকে নারীর অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে মা ও নবজাতকের মৃত্যুহার কমিয়ে আনা যায়। একজন গর্ভবতী মহিলা গর্ভকালীন সেবা, নিরাপদ প্রসবের জন্য যাবতীয় সেবা এবং প্রসব পরবর্তী সেবা পাওয়ার সব অধিকার রাখেন এবং তা অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ নারীই এখনো উপরোক্ত কোনো অধিকারই ভোগ করতে পারেন না। এসব কারণে মাতৃমৃত্যুর হার কমার যে ধীরগতি, তাতে গতি সঞ্চার করা এবং সে লক্ষ্যে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। মায়ের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে প্রথম সন্তান প্রসবের পর ৩ থেকে ৪ বছর বিরতি দিয়ে পরবর্তী সন্তান নেওয়া উচিত। গর্ভবতী মায়েদের ভারী কাজ বা ভারী জিনিস বহন না করা, নিয়মিত ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া, টীকা নেওয়া, প্রসব পূর্ব বা প্রসব পরবর্তী সময়েও নিয়মিত ডাক্তার দেখানো, বাড়িতে প্রসবকালীন জটিলতা দেখা দিলে, দ্রুত ক্লিনিক ও হাসপাতালে স্থানান্তর করার যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সহানুভূতি ও সহযোগিতাও অত্যন্ত জরুরি এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নিরাপদ মাতৃত্ব দিবসে সবার মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো গেলেই নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত হবে এবং সব শ্রেণির মানুষ এই অধিকার পাবে, তাহলেই নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস পালন সার্থক হবে। নারীর জন্য নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত হোক এবং সংরক্ষিত হোক নারীর অধিকার। এই হোক নিরাপদ মাতৃত্ব দিবসের প্রত্যাশা।

n লেখক: সাবেক ডিন ও চেয়ারম্যান, মেডিসিন অনুষদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা