‘১৫ মে থেকে আমার ছুটি। বন্ধুদের সঙ্গে খেলা দেখব বলে বাড়ি যাওয়া হয়নি। টিএসসিতে সবার সঙ্গে একত্রে খেলা দেখার মজাটাই আলাদা।’ বলছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য বিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগের ছাত্রী আফরা আনাম। তার বন্ধু ইকবাল হাসান জানান, ‘হলে বন্ধুদের সঙ্গে খেলা দেখা আর বাড়িতে বসে খেলা দেখার মধ্যে অনেক ফারাক। হলে যেভাবে সবার সঙ্গে আনন্দ-উল্লাসে মেতে ওঠা যায়, বাড়িতে তা কখনোই হয়ে ওঠে না।’ এ মতের বিরোধিতা করে ইংরেজি বিভাগের ফারহানা মিতা বলেন, ‘আমি বাসায় বসেই খেলা দেখি। মা-বাবা, ভাইবোনকে সঙ্গে নিয়ে খেলা দেখাটা খুবই আনন্দের।’ তার চেয়ে এক কাঠি সরেস দর্শনের ছাত্রী ফারজানা শান্তা। তিনি বলেন, অনেক সময় আমার দল খারাপ খেললে খেলা দেখতে বিরক্তি আসে। বাসায় বসে খেলা দেখার সময় ইচ্ছে করলেই রিমোট ঘুরিয়ে অন্য চ্যানেল দেখা যায়। কিন্তু হলে সে সুযোগ নেই।’ তিনি আরো জানান, ক্যাম্পাসে খেলা দেখার আদর্শ স্থান টিএসসি। সবাই মিলে খেলা দেখার পাশাপাশি এখানে অনেক মজাও করা যায়।
কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, পছন্দের দেশ কিংবা খেলোয়াড়ের সম্ভাব্য পারফরমেন্স নিয়ে গোটা দুনিয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশে সর্বত্রই চলছে আলোচনার ঝড়। ফুটবলপ্রেমীরা উচ্ছ্বসিত বিশ্বকাপের মাতাল হাওয়ায়। এ উন্মাদনার হাওয়া লেগেছে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে উড়ছে পছন্দের দেশগুলোর নানা আকারের পতাকা, দেয়ালে দেয়ালে চলছে রঙের আঁকিবুঁকি। হলের ছাত্ররা সমর্থক সংগ্রহে যাচ্ছেন রুমে রুমে, চলছে তালিকা তৈরির কাজ। এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও চলছে পছন্দের দেশ নিয়ে ফ্যানপেইজ খোলার প্রতিযোগিতা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলের সামনে দিয়ে যেতেই চোখ আটকে যায়। প্রধান ফটককে রাঙান হয়েছে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার পতাকার রঙ্গে। গেটের ভিতরে ঢুকতেই দেখা যায় সারি সারি উড়ছে এ দুই দেশের পতাকা। তাদের মাঝে মাঝে আচমকা বাতাসে পত পত করে উড়ছে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা সগৌরবে, সবার উপরে।
জানতে চাইলে হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ফরহাদ বলেন, মুহসীন হলে এবারের বিশ্বকাপ উপলক্ষে উন্মাদনা যেন একটু বেশি। সব বন্ধুরা মিলে পছন্দের জার্সি কিনেছি। এটা আসলে অন্যরকম এক আনন্দ।
ইতোমধ্যেই বিশ্বকাপের উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়েছে গোটা বিশ্বে। বিশ্বকাপের থিম সং ‘ওলে ওলে’র তালে তালে নাচছে গোটা দুনিয়া। নিজ দলের পতাকা তৈরি থেকে শুরু করে সমর্থক সংগ্রহে উঠেপড়ে লেগেছে অনেকেই। সেই দৌড়ে পিছিয়ে নেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও।
বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে শুরু হয়েছে সমর্থক সংগ্রহের কাজ। অনেকেই রুমে রুমে গিয়ে নিজ দলের সমর্থকের তালিকা করছেন। তালিকা অনুসারে খেলার দিন তারা বিভিন্ন কার্যক্রম করবেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও চলছে নিজ দলের সমর্থনে পেইজ খোলার প্রতিযোগিতা।
এমনই উচ্ছ্বসিত ও ফুটবল পাগল ইমরান, বাপ্পি, ফারুক, হাসনাত, সাবা, সাব্বির, রিফাত, আল আমিন মোল্লা, নিশি, হাসনাত। তাদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, এবারের বিশ্বকাপের নতুন কিছু করার প্রত্যয়ে আছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরে আমাদের প্রথম বিশ্বকাপ। তাই আনন্দটাও ভিন্ন। আর এর সঙ্গে যোগ হবে বন্ধুদের সঙ্গে মিলে জায়ান্ট স্ক্রিনে ম্যাচ দেখা।
এখন বন্ধুদের মধ্যে আড্ডার প্রধান উপজীব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে অবধারিতভাবে আসন্ন ফুটবল বিশ্বকাপ। চায়ের দোকান, ক্যাম্পাস, গেস্টরুম, হলের রুমে আলোচনার বিষয় একটিই, তা হলো ফুটবল বিশ্বকাপ। আয়োজনটি শুরু হওয়ার আগেই অনেকে তার প্রিয় দলকে কথার মারপ্যাঁচে চ্যাম্পিয়ন বানানোর চেষ্টায় লিপ্ত। আর এজন্য বাকিরাও ছেড়ে কথা বলছেন না। শুরু হয়ে যাচ্ছে মধুর ঝগড়া। তাতে মেসি, রোনালদো, নেইমারকে উপর থেকে নামিয়ে একেবারে পৃথিবীর সবচেয়ে বাজে খেলোয়াড়ও বানিয়ে ফেলছে।
ফুটবল জ্বরে আক্রান্তদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকরাও শামিল আছেন। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে ফুটবল নিয়ে আলোচনা করছেন। ক্লাসের পাশাপাশি বাইরে চায়ের দোকান ও বাসা থেকে শুরু করে বড়দের সঙ্গেও আড্ডা দিচ্ছেন তারা। শিক্ষকদের গায়েও দেখা যাচ্ছে তাদের প্রিয় দলের জার্সি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের একজন তরুণ শিক্ষক বললেন, ‘আমি শিক্ষকতা পেশায় ঢোকার পর এ নিয়ে তিনটি ফুটবল বিশ্বকাপ দেখতে যাচ্ছি। এর আগে ছাত্র হিসাবে বিশ্বকাপ দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। তবে মনে হচ্ছে, এ বিশ্বকাপের উত্তেজনাটা একটু বেশি। কারণ বিশ্বকাপটি ব্রাজিলে হতে যাচ্ছে। এতে ভাল লাগছে।’
আসন্ন বিশ্বকাপ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন হলের ক্যান্টিন ও ম্যাচে ক্যান্টিন বয়দের উন্মাদনাও কম নয়। এখন বিকাল হলেই প্রিয় জার্সি গায়ে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে মাঠে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তারা।
ছবি: রেজা
