বিশ্বের সবচাইতে ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালী নারীদের একজন অপরাহ্ উইনফ্রে। তার পরিচিতি ‘দি অপরাহ্ উইনফ্রে শো’র মাধ্যমে। ২৫ বছর জনপ্রিয়তার শীর্ষে থেকে অনুষ্ঠানটি শেষ করেন তিনি। অনুষ্ঠানটির শেষ পর্বের এই বক্তৃতাটি নারীদের সফল বক্তৃতার মধ্যে অন্যতম
আমি অনেক ভেবেছি। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তে এসেছি, আমাদের তাই করা উচিত, যা আমাদের করতে ভালো লাগে। ‘দি অপরাহ্ উইনফ্রে শো’ সাধারণ মানুষের অনুষ্ঠান। এ অনুষ্ঠান সবাইকে একটাই কথা বলে-সকল মানুষেরই নিজের অবস্থান পরিবর্তনের ক্ষমতা আছে। মানুষ কেউই একা নয়। অনুষ্ঠানটির ৪৫৬১ পর্বের প্রতিটি দিনই আমার কাছে ছিল বিশেষ মুহূর্ত। অনুষ্ঠানের প্রতিটি শব্দ আমাকে রোমাঞ্চিত করেছে। অনুষ্ঠানটি যেদিন শুরু করেছিলাম, তখন আমার বয়স ছিল ৩০ এর ঘরে। সেদিন আমার কোন প্রত্যাশা ছিল না, ছিল না কোন স্বপ্ন।
চরম ব্যর্থতা দিয়ে শুরু হয়েছিল ‘দি অপরাহ্ উইনফ্রে শো’ অনুষ্ঠানটি। প্রথম দিনেই যেন বজ াঘাত। কোন দর্শক অনুষ্ঠানটি দেখেনি! এমনকি অনুষ্ঠানের বয়স যখন দুই বছর তখন রজার কিং আমাকে একজন স্টেশন ম্যানেজারের কথা বললেন। তিনি বলেছেন, অনুষ্ঠানের কৃষ্ণাঙ্গ নারীটি হাস্যকর। ওখানে একটি গোল আলু রাখলে দেখতে আরও ভালো লাগতো। কিন্তু দর্শকদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। কারণ তারাই আমার অনুষ্ঠানকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।
আজ আমি যখন পেছনে ফিরে তাকাই তখন শুধু চোখে পড়ে বিচিত্র আর জটিল সব অভিজ্ঞতা। একদিন আমাদের সাথে ছিল ক্রিস রক তো পরদিনই যুদ্ধে পা হারানো কোন সৈনিক। পরের অনুষ্ঠানেই মাদকাসক্ত কোন পরিবার। আমার অর্জনগুলো দেখলে নিজেই অবাক হই। এই অনুষ্ঠানটিই আমাকে দেখিয়েছে যে আমি যোগ্য। শত প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে নিজেকে পূর্ণ করতে আমি নিজেই যথেষ্ট।
আমি আমার শো’র জন্য ৩০ হাজারের মতো মানুষের সাথে কথা বলেছি। এঁরা সবাই আত্মস্বীকৃতি চায়। সবাই চায় নিজেকে অন্যের কাছে মূল্যবান করে উপস্থাপন করতে। এসবই আমাকে অনুষ্ঠানের মাইক্রোফোন হাতে এতো পথ হেঁটে আসতে সাহায্য করেছে। ২৫ বছর ধরে অনুষ্ঠানটি চলছে। আমাকে প্রশ্ন করা হয় সফলতার গোপন রহস্য সম্পর্কে। আমার উত্তর হল, আমি একা সফল নই, আমার সফলতার পেছনে আছে একটা অসাধারণ টিম। আমি যেমন একা নই, তেমনি একা নও তোমরা কেউই।
এই দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে নানা স্পর্শকাতর বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছি। এই আলোচনা লক্ষ লক্ষ মানুষের মনে আশা আর অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। এই সময়কালে আপনাদের মাঝে আমি খুঁজে পেয়েছি নিরাপদ আশ্রয়, তেমনি অন্যরাও যেন এমন নিরাপদ আশ্রয় পায় আপনাদের মাঝে। এই শো থেকে আপনারা যা শিখেছেন তা দিয়ে অন্যের উপকার করুন। তাদের পাশে দাঁড়ান, ভালবাসুন। বেশি না, একজন একজন করে উপকার করা শুরু করুন। দেখবেন একদিন আপনার চারপাশ পরিবর্তন হয়ে গেছে।
আমার জন্ম ১৯৫৪ সালে। একজন কৃষ্ণাঙ্গ মেয়ের জন্ম হয় মিসিসিপির একটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে। সেই কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েটি, মানে আমার স্বপ্নের পরিধি ছিল সর্বোচ্চ শিক্ষক হওয়া। আমি জীবনে বেশি ভালোবাসা পাইনি। তার মানে এই নয় যে, মা-বাবা আমাকে ভালোবাসতো না। তারা তাদের সবটুকুর বিনিময়ে আমাকে ভালোবাসা দিয়েছেন। এভাবেই হয়তো একদিন স্বপ্নের শেষ হয়ে যেত। কিন্তু এই শো আমাকে দিয়েছে নতুন জীবন। যাদের আমি কখনো দেখিনি, নাম জানি না, তাদের ভালোবাসা পেয়েছি আকণ্ঠ। আমার সফলতার পেছনে ছিল মানুষের ভালোবাসা, আমারও ছিল মানুষের প্রতি ভালোবাসা। আমরা কেউই একা নই। বিদায় বলবো না, শুধু বলবো আবার দেখা হবে।
