পাহাড়ে তিন সশস্ত্র সংগঠনের কোন্দলে পাঁচ মাসে ৩৫ খুন

আপডেট : ০৮ জুন ২০১৪, ২৩:০৩
পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর মধ্যে সশস্ত্র সংঘাতের ঘটনা বেড়েই চলেছে। অপহরণ, খুন ও চাঁদাবাজি আশংকাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষরা ভীতির মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। পাহাড়ে গত ৫ মাসে খুন হয়েছেন ৩৫ জন, অপহরণের শিকার হয়েছেন ৬০ জন। সংঘর্ষে আহত হয়েছে আরো প্রায় শতাধিক ব্যক্তি। একক আধিপত্য বিস্তারে সশস্ত্র মহড়া, হত্যা, গুপ্তহত্যা ও সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে মূলত উপজাতীয় তিনটি সশস্ত্র গ্রুপ। সর্বশেষ গত সোমবার রাতে লংগদু উপজেলাধীন আটারক ছড়ার উল্টাছড়ি এলাকা থেকে একজন উপজাতীয় গ্রাম প্রধান ও তার ভাইসহ চারজনকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। এর জন্য সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএস প্রতিপক্ষ দল সংস্কারপন্থি জেএসএসকে দায়ী করলেও দলটির পক্ষ থেকে তা অস্বীকার করা হয়েছে। অপহূতদের উদ্ধারের ব্যাপারে লংগদু থানার ওসি আবুল কালাম চৌধুরী জানিয়েছেন, তাদের উদ্ধারে কাজ করছে নিরাপত্তা বাহিনী। এছাড়া স্থানীয়ভাবেও তাদের উদ্ধার করার চেষ্টা চালাচ্ছেন জনপ্রতিনিধিরা। অপহূতদের স্বজনরা জানিয়েছেন, তাদের অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে মোবাইলে বাঘাইছড়ি উপজেলার করঙ্গাতলী এলাকায় যোগাযোগ করতে বলেছে অপহরণকারীরা। পরে কয়েকজন জনপ্রতিনিধি সেখানে গেলে সারাদিন তাদের বসিয়ে রেখে পরে আগামী রবিবার দেখা করার কথা তাদের জানায় অপহরণকারীরা। এ ব্যাপারে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর জানান, সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের শান্তি ও সমপ্রীতি রক্ষায় খুবই আন্তরিক। পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠনগুলো আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে যে ঘটনা ঘটাচ্ছে তা আমাদের সকলকে বিব্রত করছে। পাহাড়ে খুন, অপহরণ ও চাঁদাবাজি নিয়ে যে অভিযোগ আসছে তা সরকার শক্ত হাতে দমনের চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, পাহাড়ের মানুষ খুবই শান্তিপ্রিয়। এ পাহাড়ের মানুষরা কখনোই অপহরণ, খুন, চাঁদাবাজি চায় না। পাহাড়ের মুষ্টিমেয় আঞ্চলিক সংগঠন পাহাড়ের বিভিন্ন সমস্যা জিয়ে রেখেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। রাঙামাটি জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) হাবিবুর রহমান জানান, পাহাড়ে অপহরণের ঘটনা ঘটছে এখানকার আঞ্চলিক দলগুলোর চাঁদাবাজির কারণে। একক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে তারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালিত করছে। তিনি জানান, পাহাড়ে পুলিশি তত্পরতা আগের চেয়ে অনেকগুণ বেড়েছে। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সম্পাদিত পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি পাহাড়ে কাঙ্ক্ষিত শান্তি প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। চুক্তি পরবর্তী সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি, চুক্তিবিরোধী ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) ও জনসংহতি সমিতির (সংস্কার গ্রুপের) অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড আরো বাড়ে। ক্রমেই তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও মতানৈক্য বাড়ছে। জেএসএস এর সংস্কারপন্থি গ্রুপটির সহ-তথ্য ও প্রচার সম্পাদকের দায়িত্বে থাকা প্রশান্তি চাকমা জানান, আমাদের বিরুদ্ধে অপহরণ ও সশস্ত্র সংঘাতের যে অভিযোগ আনা হয়েছে, সেটা শুধুমাত্র বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা করা ছাড়া আর কিছু নয়। এমএন লারমার আদর্শে বিশ্বাসী জেএসএস কোনো ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে বিশ্বাস করে না বলেও দাবি করেন এই নেতা। অপর এক প্রশ্নের জবাবে প্রশান্তি চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘাত থেকে শুরু করে সকল সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে সন্তু লারমার সদিচ্ছাই যথেষ্ট। তার কারণে এই অঞ্চলে একের পর এক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জেএসএস’র সহতথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা বলেন, পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় এমনটা হচ্ছে। এছাড়া স্বার্থান্বেষী মহলের অপতত্পরতায় পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা হচ্ছে না বলেও অভিমত ব্যক্ত করেন তিনি। ইউপিডিএফের দায়িত্বশীল একজন নেতা জানান, পাহাড়ের এ সমস্যা একটি রাজনৈতিক সমস্যা। সংঘাতের জন্য সন্তু লারমাই দায়ী। সে সরকারের এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে। আগে সরকার তার নিজস্ব বাহিনী দিয়ে যা করত এখন সন্তু লারমাকে দিয়ে তাই করানো হচ্ছে। পাহাড়ে চাঁদাবাজির ক্ষেত্রে সর্ব প্রথম ইউপিডিএফের নাম উচ্চারিত হয়। এ ব্যাপারে ইউপিডিএফের এ মুখপাত্র বলেন, এটা সঠিক নয়।