পরিবেশ দূষণের জন্য পারস্পরিক দোষারোপ না করে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে তাদের প্রয়োজন উন্নত দেশগুলোর কাছে তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। তিনি বলেন, অতীতে বিভিন্ন বিষয়ে পারস্পরিক দোষারোপের বিষয়টি চলে আসলেও তা থেকে ফল এসেছে কম। সেজন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোকে তাদের মন মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে।
গতকাল রবিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তাদের জন্য আয়োজিত এক কর্মশালায় প্রধান অতিথি হিসেবে মন্ত্রী এ কথা বলেন।
আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, বাংলাদেশ আয়তনে ছোট হলেও বিশেষত দক্ষিণ অঞ্চলে অনেক বড় বড় চর জাগছে। এসব চরকে উন্নত করে আমরা কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কাছে অর্পণ করেছি। এসব চরের মধ্যে পারস্পরিক সংযোগ ঘটিয়ে আমরা ভূমিহীনদের থাকার ব্যবস্থা করে দিতে পারি। তিনি বলেন, পরিবেশগত পরিবর্তনের বিষয়ে বিশ্বের বড় বড় দেশগুলো আগেই সচেতন হলেও আমরা এখন বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছি। সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় আমরা যে ভীত তা নয়। নিজস্ব নির্বাচনী এলাকার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের লোকজন প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে আছে। একসময় সেখানকার অনেক লোক গোলপাতার ঘরে বসবাস করতো। এরপর তারা টিনের ঘর করেছে। এখন সেখানে পাকা ভবন আছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে সাথে মানুষের অবস্থারও পরিবর্তন হচ্ছে।
পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আরো বলেন, আমরা নানা বিষয়ে উন্নত দেশগুলোকে দোষারোপ করি। একসময় তারা আমাদের কাঁচামাল এবং সস্তা শ্রম নিয়ে পণ্য তৈরি করে তা আবার আমাদের কাছে বিক্রি করতো। আমরা তাদের কাছে ৫ শতাংশ ক্ষতিপূরণ চেয়েছি। এখন আমরা বলছি তোমরা আমাদের পরিবেশের ক্ষতি করছো। সুতরাং তোমাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এ ধরনের দোষারোপের সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় উন্নত বিশ্বসহ যারা এগিয়ে আসছে তাদের তিনি ধন্যবাদ জানান।
প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাজের মানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, হয়তো এখন আমি তাদের চিন্তাধারা বুঝে উঠতে পারি না অথবা তাদের মান আগের থেকে পড়ে গেছে। তিনি আশা করেন, কর্মশালার মাধ্যমে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দক্ষতা আরো বাড়বে।
পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়, ইউএসএইড এবং এফএও এর উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মশালায় সভাপতির বক্তব্যে মন্ত্রণালয়ের সচিব শফিকুর রহমান পাটোয়ারি বলেন, সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার ফলে বাংলাদেশ ঝুঁকির মধ্যে আছে। কিন্তু উন্নত যেসব দেশের কারণে জলবায়ুর পরিবর্তন হচ্ছে সেসব দেশকে এর ক্ষতিপূরণ দিতে হবে-যাতে বাংলাদেশ এ ক্ষয়ক্ষতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন-এফএও-এর বাংলাদেশ প্রতিনিধি মাইক রবসন, ইউএসএইড বাংলাদেশ মিশনের পরিচালক জানিনা জারুজেলেস্কি, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য উজ্জল বিকাশ দত্ত প্রমুখ।
তরুণ প্রজন্ম ভূমিকা রাখতে পারে
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেছেন, পৃথিবী সবসময়ই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগুচ্ছে। মানুষ এ পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে, উন্নতি করেছে। আজকের পৃথিবীর সমস্যা মোকাবেলা করতে আমরাও সক্ষম, যেমনিভাবে আমাদের পূর্বপুরুষরা সক্ষম হয়েছিলেন। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা মোকাবেলা করতে তরুণ প্রজন্মের বড় ভূমিকা রয়েছে। আগামীর সুন্দর সমতাপূর্ণ ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করতে আমরা চেষ্টা করছি। এ প্রচেষ্টায় বড় সাফল্য আসবে তরুণদের উদ্যোগে।
রবিবার বিকালে নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনের প্রধান মিলনায়তনে ‘এনভায়রনমেন্ট অলিম্পিয়াড, ডিবেটিং চ্যাম্পিয়নশিপ এন্ড প্রেজেন্টেশন প্রতিযোগিতা’-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
শহর ও গ্রামের উন্নয়নের তফাত তুলে ধরে তিনি বলেন, আমরা অনেক অর্জন করেছি। কিন্তু তার সাথে বৈষম্যও রয়েছে। যে বৈষম্য দূর করার জন্য আন্দোলন করেছিলাম, তা থেকেই যাচ্ছে। দেশের মানুষ নিরাপত্তা চায়, জীবিকার নিশ্চয়তা চায়, নিরাপদ জীবন চায়। পাকিস্তান আমল থেকে বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের জন্য আমরা লড়ছি। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৩ বছরেও আমরা এখনও তা নিশ্চিত করতে পারিনি।
আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেনতেন প্রকারের বিশ্ববিদ্যালয় নয়। এটি পরিবর্তনের, আন্দোলনের বিশ্ববিদ্যালয়। আমাদের অধিকার-স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রামের প্রতিষ্ঠান এ বিশ্ববিদ্যালয়। পাকিস্তান আমলে বৈষম্য দূর করতে সংগ্রাম করেছি। এখন নিরাপদ পরিবেশের জন্য সংগ্রাম করতে হবে।
অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. নজরুল ইসলাম বলেন, পরিবেশ দূষণের জন্য প্রধানত মানুষই দায়ী। বেশি দূষণ করছে উন্নত দেশ। আর বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে উন্নয়নশীল ও গরীব দেশগুলো। পরিবেশ ঝুঁকি মোকাবেলায় নগরায়ন পরিকল্পনায়ও বড় পরিবর্তন আনতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, পরিবেশ সুস্থ রাখার জন্য, প্রকৃতি সুরক্ষার জন্য যুদ্ধে নামতে, পরিবেশ যেন কেউ ধ্বংস করতে না পারে এ জন্য নিরন্তর কাজ করতে হবে।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. রইসুল আলম মণ্ডল, বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ এন্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস অনুষদের ডিন অধ্যাপক এস এম মাকসুদ কামাল, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. আব্দুর রব, ড. তৌহিদা রশিদ।
