গত ছয় বছরেও ভোটারের সব তথ্য হালনাগাদ করেনি নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বর্তমানে ৯ কোটি ১৯ লাখ ভোটার শুধু ৮ ধরনের তথ্য জানতে পারছেন। আর এই তথ্যগুলো সংশোধনের সুযোগ পেয়েছেন ১ লাখ ৬৫ হাজার ভোটার। অথচ বিপুলসংখ্যক ভোটার তাদের তথ্য সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করার ব্যাপারে কিছুই জানেন না।
২০০৮ সালে ভোটারের ২৯ ধরনের তথ্য নেয়া হলেও চলমান হালনাগাদ কার্যক্রমে তথ্য নেয়ার সংখ্যা আরো বেড়ে ৪৬-এ পৌঁছেছে। কমিশনের জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন অনুবিভাগ বলছে, ভোটারদের হাতে ‘স্মার্ট কার্ড’ তুলে দেয়ার আগেই অনলাইনে তথ্য সংশোধনের সুযোগ দেয়া হবে। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, উন্নতমানের জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির আগেই ভোটারদের যেসব তথ্যে ত্রুটি রয়েছে তা সংশোধনের ব্যবস্থা না হলে ‘স্মার্ট কার্ডের’ পরিচয়পত্রে ত্রুটিপূর্ণ তথ্যই থেকে যাবে। এ কারণে কমিশন যত দ্রুত সম্ভব ভোটারের সব তথ্য হালানাগাদ করার জন্য অনলাইন ব্যবস্থা চালুর চিন্তা-ভাবনা করছে।
২০০৮ সালে অর্থাত্ ছয় বছর আগে দেশে ছবিসহ ভোটার তালিকা এবং ভোটারদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) দেয়া শুরু হলেও এ বিষয়ে দেয়া সব তথ্য সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ হয়েছে কিনা তা ভোটাররা আজও জানতে পারেননি। শুধু জাতীয় পরিচয়পত্রে যে আটটি তথ্য রয়েছে সেগুলোই জানা গেছে এবং এ আট তথ্যের ত্রুটি সংশোধনে এখনও অনেকে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগে ভিড় করে থাকেন। জাতীয় পরিচয়পত্রের ৮ ধরনের তথ্য সংশোধনের জন্য এ পর্যন্ত আড়াই লাখ ভোটার আবেদন করলেও ১ লাখ ৬৫ হাজার ভোটার এই সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু ছয় বছর আগে দেয়া আরো ২১ ধরনের তথ্য সঠিকভাবে লেখা হয়েছে কিনা তা জানার সুযোগ নেই। ২০১২ সাল থেকে এ বিষয়ে তথ্যের সংখ্যা আরো বেড়ে ৪১-এ পৌঁছায়। গত ১৫ মে শুরু হওয়া হালনাগাদে ভোটারদের কাছ থেকে ৪৬ ধরনের তথ্য নেয়া হচ্ছে।
ইসি সচিবালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ২০০৮ সালে দেশে ছবিসহ ভোটার তালিকা তৈরি এবং একইসাথে ভোটারদের জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়ার কাজ শুরুর পর কিছুদিনের জন্য ঢাকার কয়েকটি এলাকায় অনলাইনে এ বিষয়ে সব তথ্য দেখার সুযোগ দেয়া হয়েছিল। ঘোষণা দেয়া হয়েছিল সারাদেশে পর্যায়ক্রমে এ সুযোগ দেয়া হবে এবং তথ্যে কোন ভুল থাকলে তা সংশোধনের সুযোগ পাওয়া যাবে। কিন্তু কয়েকদিন পর ভোটার বা জাতীয় পরিচয় ডেটাবেইসের নিরাপত্তাগত কারণ দেখিয়ে তা বন্ধ করে দেয়া হয়। এরপর এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন বা জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগ আর কোন উদ্যোগ নেয়নি। এর ফলে সংশ্লিষ্ট অনেকেরই ধারণা, ডেটাবেইসে ভোটারদের অনেক ভুল তথ্য থেকে যেতে পারে।
এ বিষয়ে ইসি সচিবালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, ৬ বছর আগে দেশের আট কোটি ১০ লাখ ৫৮ হাজার ৬৯৮ জন নাগরিক ভোটার হয়েছেন। তাদের ব্যক্তিগত অনেক তথ্যই এ ছয় বছরে পাল্টে গেছে। বিশেষ করে সে সময়ের তরুণ ভোটারদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, বৈবাহিক অবস্থা, পেশা-এসব তথ্য স্বাভাবিকভাবেই পাল্টে যাওয়ার কথা। অনেকের বাবা-মায়ের মৃত্যু হয়েছে, ঠিকানা বদল হয়েছে। কিন্তু এসব তথ্য হালনাগাদ করার সুযোগ কেউ পাননি।
এদিকে ত্রুটিপূর্ণ এই অবস্থার মধ্যেই বিশ্বব্যাংকের ঋণ সহায়তায় ‘আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম ফর এনহান্সড অ্যাক্সেস টু সার্ভিস’ (আইডিয়া) প্রকল্পের মাধ্যমে দেশে উন্নতমানের জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি হতে যাচ্ছে। বিষয়টি অনুধাবন করেই নির্বাচন কমিশন ও জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগ অনলাইনে ভোটারদের মাধ্যমেই ডেটাবেইস সংশোধনের ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে।
জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুজ্জামান মো. সালেহউদ্দীন ‘ইত্তেফাক’কে বলেন, এটা সত্য যে ৮টি তথ্য ছাড়া ভোটারদের প্রদত্ত বাকি তথ্যগুলো সঠিকভাবে নেয়া হয়েছিল কিনা তা তারা জানে না। এজন্য ভোটারদের স্মার্ট কার্ড দেয়ার আগে তথ্য সংশোধনের সুযোগ পাবে। এজন্য সফটওয়্যার তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে। আশা করছি চলতি মাসে অনলাইনে ভোটারদের প্রদত্ত তথ্য সংশোধন করতে পারবেন। তিনি আরো বলেন, ইতিমধ্যে কমিশন অনলাইন ব্যবস্থা চালুর জন্য নীতিগত সিদ্ধান্ত দিয়েছে।
