‘শিক্ষক অথবা শিক্ষিকা আবশ্যক’, ‘আপনি কি টিউশনি খুঁজছেন’? ‘লেডি টিউটর ওয়ান্টেড’ কিংবা ‘আপনি কি গৃহশিক্ষক খুঁজছেন’? তাহলে আজই রেজিস্ট্রেশন করুন। এমন আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পা দিয়ে প্রতারিত হচ্ছেন রাজধানীর বিভিন্ন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। টিউশনির জন্য যারাই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন তারাই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।
টিউশন মিডিয়া নামে এসব টিউশন ব্যবসায়ীরা গৃহশিক্ষক দেয়ার নামে হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অংকের টাকা। রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার বিভিন্ন মোড়ে এসব নিবন্ধনহীন টিউশনি মিডিয়ার পোস্টার লাগানো রয়েছে। এসব মিডিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করলেই পড়তে হয় বিপদে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিম্নবিত্ত ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের অসচ্ছলতাকে পুঁজি করে এক শ্রেণির প্রতারক চালিয়ে যাচ্ছে এ ব্যবসা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ, বিভিন্ন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনের তাগিদে ধরনা দেন এ সব মিডিয়ায়। আর এ সুযোগটাই লুফে নেয় প্রতারক টিউশন ব্যবসায়ীরা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাড়ি থেকে নিয়ে আসা মাসিক খরচের টাকা প্রতারক চক্রের হাতে তুলে দিয়ে বেকায়দায় পড়েন টিউশন প্রত্যাশী শিক্ষার্থীরা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, আরামবাগ, নিউমার্কেট, নীলক্ষেত, ফার্মগেট, লক্ষ্মীবাজার, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, মিরপুর, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, আজিমপুরসহ বিভিন্নস্থানে গজিয়ে উঠেছে অসংখ্য ‘টিউশন মিডিয়া’। এগুলোর আবার বাহারি নাম। শিক্ষক ডটকম, শিক্ষক ক্লাব, টিচার্স হেভেন, টিচার্স মিডিয়া, টিচার্স ব্যাংকিং মিডিয়া, টিচার্স একাডেমি, টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন, টিচার্স ফোরাম, টিচার্স ইউনিয়ন, টিচার্স ফেয়ার, টিচার্স ক্লাব ইত্যাদি নামে প্রতারক চক্র চালিয়ে যাচ্ছে এসব মিডিয়া ব্যবসা। তারা টিউশন দেয়ার কথা বলে প্রথমেই ‘নিবন্ধন ফি’র নামে সর্বনিম্ন একশ’ থেকে শুরু করে বিভিন্ন অংকের টাকা আদায় করে থাকে।
এ বিষয়ে অভিযোগ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র আবেদীন আলম বলেন, ‘আমি একশ’ টাকা দিয়ে ‘টিচার্স ইউনিয়নে’ নিবন্ধন করেছি ছয় মাস আগে। ফোন করলেই আজ দিচ্ছি কাল দিচ্ছি বলে আমাকে ঘুরাচ্ছে। মিডিয়া থেকে এখনো কোনো টিউশনি পাইনি।’ এছাড়াও মিডিয়াগুলো টিউশন জোগাড় করে দিলেও টিউশন প্রার্থীর কাছ থেকে মাসিক সম্মানীর শতকরা ৭০ থেকে ৮০ ভাগ টিউশনে যোগ দেয়ার আগেই আদায় করে থাকে। পরে টিউশনি চলে গেলেও টাকা ফেরত দেয়া হয় না। অভিযোগ রয়েছে, টিউশনি চলে যাওয়ার পিছনেও এদের হাত থাকে।
একাধিক ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শুরুর ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যেই নানা ছুতোয় ছাত্র-ছাত্রীদের অভিভাবকরা টিউটরকে বাদ দিয়ে দেন। এক্ষেত্রে প্রতারক চক্রের সঙ্গে জড়িতরাই অভিভাবক সেজে প্রার্থীদের ধোঁকা দিয়ে থাকে। শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রবিউল ইসলাম বলেন, ‘শিক্ষক ডটকম মিডিয়াকে ১ হাজার টাকা দিয়ে টিউশনিতে যোগ দিলে তিনদিনের মাথায় অভিভাবক আমাকে মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলতে বলেন। পরে মিডিয়া আমাকে ওই বাসায় যেতে নিষেধ করে। একই মিডিয়াতে আবার ১ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে অন্য একটি টিউশনিতে গেলে সেখানেও ঘটে একই ঘটনা।
শুধু ছেলেরাই নয়, প্রতারণার শিকার হচ্ছেন টিউশন প্রার্থী মেয়ে শিক্ষার্থীরাও। অনেক মিডিয়া ‘লেডি টিউটর ওয়ান্টেড’ নামে প্রচারণা চালায়। এতে আকৃষ্ট হয়ে অনেক মেয়ে শিক্ষার্থী প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। এ বিষয়ে অভিযোগ করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের তাসমিয়া রহমান বলেন, ‘শিক্ষক ডটকম মিডিয়ায় রেজিস্ট্রেশন করেও টিউশনি পাইনি।’ এ বিষয়ে জানতে চাইলে টিউশন মিডিয়ার একাধিক পরিচালক জানান, এ সব অভিযোগ ভিত্তিহীন। আমরা এ ধরনের কোনো কাজে জড়িত নই। তবে প্রতারণার বিষয়ে তারা কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
