ফুটবলের প্রাচীন ইতিহাস

আপডেট : ১০ জুন ২০১৪, ১৯:৪৩
বর্তমান বিশ্বে যত আউটডোর গেম আছে, তার মধ্যে সামগ্রিক কলা-কৌশলীর আওতায় একমাত্র ফুটবল খেলা, ৬০ মিনিটের মধ্যে (অলিম্পিকের ক্ষেত্রে ৯০ মিনিট) ফলাফল প্রদানপূর্বক ক্রিড়ামোদী মানুষের মনে আনন্দ দিয়ে থাকে। এতে তেমন একটা একঘেয়েমী নেই, বরং দর্শকরা নির্মল আনন্দের আতিশয্যে উন্মুখ হয়ে থাকে যে, এরপর কি হবে? এটি প্রকারান্তরে অন্যতম উপাদান হিসেবে আয়ু বৃদ্ধির সহায়ক, যা চিকিত্সা বিজ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু এই জনপ্রিয় ফুটবলের প্রবর্তন একদিনে হয়নি। বছরের পর বছর, সময়ের পরিক্রমার আওতায় বর্তমান অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। উল্লেখ্য যে, ক্রিকেট খেলা অনেক ক্ষেত্রে বিশ্বের মানুষের অন্তরের মধ্যে জায়গা জুড়ে থাকলেও ফুটবরের মতো অতখানি নয়। যতদূর জানা যায়, ফুটবল এবং রাগবী খেলা প্রাচীন গ্রীসের হারপাসটন (Harpaston) নামক খেলা থেকে সৃষ্টি। এক্ষেত্রে রোমানদের অবদান কম নয়। জানা যায় যে, ইংল্যান্ড ফুটবল খেলার আদিস্থান হলেও এর আদি দর্শন রোমানরাই বয়ে নিয়ে এসেছে। আর এটা সবাই অবহিত আছেন যে রাগবী রূঢ় (Brutal) খেলা হওয়ায় ফুটবলের মত সমাদৃত হয়নি এবং এটি বর্তমানে বিলুপ্তির পথে। অথচ ফুটবল সবার কাছে খুব প্রিয় এবং আনন্দঘন পরিবেশের খেলা। এদিকে ফুটবল খেলায় রাগবীর মতো অতীতে কিছুটা রূঢ় থাকলেও কালক্রমে পরিবর্তন ও পরিমার্জিত হয়ে বর্তমান অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। আর আমরা যে আধুনিক ফুটবল খেলা দেখি, তার বয়স প্রায় ৮০০শ’ বছরের। অর্থাত্ বারশ’ শতাব্দিতে ইংল্যান্ডে এর উন্মেষ ঘটে। উল্লেখ্য যে, সেই সময়ে এই লেখাটি দিনে দিনে এত জনপ্রিয় হয়ে উঠে যে, অন্যান্য কৃষ্টিগত ট্রেডিশনাল খেলাগুলো স্তিমিত হয়ে পড়ে। সেহেতু তত্কালীন সময়ে উক্ত চলমান খেলাগুলো সমুন্নত ও সংরক্ষণ করতে রাজা হেনরি I এবং হেনরি II ফুটবল খেলা বন্ধ করে দেন। কিন্তু এটা সত্য যে, যা জনসাধারণের কাছে যে খেলা অতি প্রিয়, তা কি ঠেকিয়ে রাখা যায়? সেহেতু ফুটবল খেলা তার গতিতে এগিয়ে যেতে থাকে এবং একই সাথে ক্রমে ক্রমে আরও মানসম্পন্ন হতে থাকে। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, ফুটবল ও রাগবী খেলার আদি সূত্র একই। তাই কিছু কিছু ক্ষেত্রে একে অন্যের সাথে মিল আছে এবং এই সুবাদে আঠারশ’ শতাব্দির প্রথম দিকে বড় বড় সাতটি পাবলিক বিদ্যালয়ে ফুটবল খেলা হতো। কিন্তু এর মধ্যে একটি বিদ্যালয়ে(সময়কাল ১৫৬৭ সাল) ব্যতিক্রমধর্মী ফুটবলের পন্থা অনুসরণ করে রাগবী খেলা প্রচলিত ছিল। সেই ছয়টি বিদ্যালয়ের এই ফুটবল খেলা আরো জনপ্রিয়তা পায় এবং বর্তমানের ফুটবলের সব রকম নিয়ম-কানুন ও বিধি-নিষেধ সেই সময়েরই সৃষ্টি। আর এখান থেকে ফুটবল এসোসিয়েশন (Association Football) বা সকার (Soccer) কথাটির প্রবর্তন হয়। যে যাই বলি না কেন, ফুটবল খেলার আদি সূচনাকারী দেশ (Mother country) যদি বলতে হয়, তাহলে ইংল্যান্ডকেই বুঝায়। যদিও এখন ইংল্যান্ডের সীমানা ছাড়িয়ে আপন মহিমায় সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। এদিকে এই জনপ্রিয় ফুটবল খেলাটি যুক্তরাষ্ট্রে ১৮৬০ সালের দিকে শুরু হয়। এক্ষেত্রে ওখানকার প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাটগাড়স বিশ্ববিদ্যালয় প্রশংসার দাবিদার। কেননা এই দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের টিম আন্তঃকলেজ খেলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম পদচারণার সূচনা করে। এদিকে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে যে আমাদের বাংলাদেশে কখন থেকে ফুটবল খেলা শুরু হয়। কিন্তু এই প্রেক্ষাপটে দিনক্ষণ ঠিক করে বলা সুকঠিন। তবে অনেকে বলে থাকেন যে, ব্রিটিশরা প্রথম যখন পাক-বাংলা-ভারত উপমহাদেশ শাসন শুরু করেন, তখন থেকে উপনিবেশের ছায়াতলে আরম্ভ হয়েছে। আবার কেউ বলেন যে এর আগেই অর্থাত্ খ্রিস্ট ধর্মের প্রচারের প্রাক্কালে মিশনারীর হাত ধরে এর সূচনা। মজার ব্যাপার হলো আমাদের দেশে ফুটবল খেলার জনপ্রিয়তা দেখে, কেউ কল্পনা করতে পারে না যে এটি আমাদের মাটি ও মানুষ ঘেঁষা নিজস্ব খেলা নয়। উল্লেখ্য যে, কোনো জিনিসের গ্রহণযোগ্য মৌলিক গুণ তার প্রতিষ্ঠা পাওয়া বা প্রবর্তনের প্রধান শর্ত। সে অর্থে ফুটবল খেলার মধ্যে যে প্রাণ-প্রাচুর্য, যে স্বতঃস্ফূর্ত উল্লাস, যে মনের চাহিদা, যে তাত্ক্ষণিক তীব্র প্রতিযোগিতা, তা কি নির্দিষ্ট দেশের গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখা যায়? তাই সেই প্রেক্ষাপটে ফুটবল খেলা তার আপন মহিমায় সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ার যথেষ্ট প্রাণবন্ত বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। কেননামাত্র এক ঘণ্টা বা দেড় ঘণ্টার ব্যবধানে এগারজন করে মোট বাইশ জনের টিম স্পিরিট, সাহসী উদ্যোগ, আন্তরিকতা, কৌশল ও ক্ষিপ্ততার আড়ালে সামান্য ৭২০০ বর্গ গজের পরিসরে (১২০/৬০ গজ) অনুষ্ঠিত যে মিষ্ট যুদ্ধ, (Sweet War) তা থেকে অনেক কিছু অনুসরণ করা যায়। অনেক মনীষী বলে থাকেন যে, এই বিশ্বে চলমান মুখোমুখি যুদ্ধের যতগুলো বৈশিষ্ট্য আছে তা এই খেলা থেকে নেয়া। আর এই খেলাটি পুরুষদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, মহিলারাও তাদের আঙ্গিকে নৈপুণ্য দেখিয়ে যাচ্ছে। এই পৃথিবীতে যতগুলো খেলাধুলা আছে, তার মধ্যে একমাত্র ফুটবল খেলা বলতে গেলে মানুষের রক্তের সাথে মিশে গেছে। এই ক্ষেত্রে ছোট একটি উদাহরণ দিলে পরিষ্কার হয়ে যাবে, একটি ছোট ছেলে শিশুকে বলসহ নানারকম খেলনা দিলেন। দেখবেন, সে আগে বলটি হাতে তুলে নিবে। আর এখানেই শেষ নয়, আগামীকাল ১২ জুন বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা শুরু হতে চলেছে। দেখবেন, সারা বিশ্বের প্রায় সাড়ে সাতশ’ কোটি মানুষের এক মাসব্যাপী গল্প-গুজবের প্রধান বিষয় ফুটবলকে ঘিরে অব্যাহত থাকবে। উল্লেখ্য যে, বিশ্বকাপ ফুটবল বলতে ফিফা (FIFA)কে বুঝায়। আর (FIFA- Federation International de Football Association) ফরাসি শব্দ থেকে উদ্ভূত। এই বিশ্বকাপ ফুটবল প্রতিযোগিতা ১৯৩০ সাল থেকে শুরু হয়েছে এবং প্রতি চার বছর পর পর অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে, অবশ্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে দুই বছর অনুষ্ঠিত হয়নি।