আগামীকাল থেকেই শুরু হয়ে যাচ্ছে বিশ্বকাপ ফুটবল। চার বছর পর পর আয়োজিত বিশ্বকাপ ফুটবলকে বলা হয়ে থাকে ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন দ্য আর্থ’। সময়ের সাথে সাথে ফুটবলের এই বৃহত্তম আসরেও প্রবেশ করেছে প্রযুক্তি। বিশেষ করে এবারের আসরটি প্রযুক্তি ব্যবহারের দিক থেকে তাত্পর্যপূর্ণ অবস্থান দখল করে নেবে নতুন নতুন প্রযুক্তির প্রথম ব্যবহারের মাধ্যমে। বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রযুক্তির বিভিন্ন ছোঁয়া নিয়ে লিখেছেন সানজিদা সুলতানা
গেল বিশ্বকাপের ইংল্যান্ড-জার্মানির মধ্যকার ম্যাচটির কথা ফুটবলপ্রেমীদের অনেকের মনেই ঠাঁই করে রাখবে দীর্ঘদিন ধরে। ম্যাচটিতে ইংলিশ ফুটবলাররা ১-৪ গোলে পরাজিত হয় জার্মান বাহিনীর কাছে। তবে এই ম্যাচটিতেই ঘটে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই ম্যাচেই ইংল্যান্ড ফরোয়ার্ড ফ্র্যাংক ল্যাম্পার্ড ডি-বক্সের বাইরে থেকে শট নিলে সেটি বারে লেগে গোলপোস্টের ভেতরে পড়ে ফিরে আসে। ল্যাম্পার্ডসহ ইংল্যান্ডের অন্যান্য খেলোয়াড়রা গোলের আবেদন করলেও অ্যাসিস্ট্যান্ড রেফারি তা নাকচ করে দেন। তবে টিভি রিপ্লেতে স্পষ্টই দেখা যায় যে বলটি গোল লাইন অতিক্রম করেছিল। ম্যাচের ওই পরিস্থিতিতে ইংল্যান্ড ওই গোলটি পেলে খেলার চিত্রটি বদলে যেত বলেই মনে করেন অনেক ফুটবল বিশ্লেষক।
ফুটবল মাঠে এমন ঘটনা এই প্রথম নয়। ক্লাব ফুটবল থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ম্যাচে এমন অনেক ঘটনাই এর আগে ঘটেছে। আর সে কারণেই দীর্ঘদিন ধরে ফুটবল মাঠে গোল লাইন প্রযুক্তি ব্যবহারের দাবি ছিল ফুটবল বোদ্ধা এবং দর্শকদের পক্ষ থেকে। এর বাইরেও অফসাইড, ফাউল প্রভৃতি ঘটনাও মাঠে এমনভাবে ঘটে যায়, যাতে খুব দ্রুততম সময়ে রেফারি বা তার সহকারীরা যথাযথ সিদ্ধান্তটি নিতে পারেন না। প্রযুক্তির ব্যবহার এসব ঘটনায় যথার্থ সিদ্ধান্তটি বয়ে নিয়ে আসতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তবে এতসব প্রযুক্তির ব্যবহার ফুটবলের মতো গতিশীল একটি খেলার গতিতেও বিরূপ প্রভাব রাখতে পারে বলে মনে করেন অনেকেই। তবে সিদ্ধান্তের সঠিকতার দিকে লক্ষ্য রেখেই ফুটবল মাঠেও প্রবেশ করেছে প্রযুক্তি। আর এবারের ফুটবল বিশ্বকাপেও চর্চা হবে এসব প্রযুক্তির।
গোল লাইন প্রযুক্তি
এই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে গোল লাইন প্রযুক্তির ব্যবহার হলেও আদতে এই প্রযুক্তির ব্যবহারের সাথে ইতোমধ্যেই পরিচিত হয়ে গেছেন ফুটবলপ্রেমীরা। ২০১০ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের আগ পর্যন্ত ফিফা এর বিরুদ্ধেই ছিল। তবে ওই বিশ্বকাপের পর থেকেই ফিফা গোল লাইন প্রযুক্তি ব্যবহারের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১১ সালের জুলাই মাসে ফিফা প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে গোল লাইন প্রযুক্তি ব্যবহারের অনুমোদন দেয়। আনুষ্ঠানিকভাবে ২০১২ সালে জাপানে অনুষ্ঠিত ফিফা ক্লাব ওয়ার্ল্ড কাপে এর প্রথম ব্যবহার শুরু হয়। ২০১৩ সালের কনফেডারেশন কাপেও এর ব্যবহার হয়। ক্লাব ফুটবলেও শুরু হয় এর ব্যবহার। আর এসব টুনার্মেন্টে সফলভাবে ব্যবহারের পরই ফিফা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে বিশ্বকাপে এর ব্যবহারের জন্য। আর তাতে করেই আগামীকাল থেকে শুরু হওয়া বিশ্বকাপে থাকছে এই গোল লাইন প্রযুক্তির ব্যবহার।
যেভাবে কাজ করে গোল লাইন প্রযুক্তি
গোল লাইন প্রযুক্তিকে নির্দিষ্ট একটি কোনো প্রযুক্তি মনে করার কোনো কারণ নেই। আদতে ফুটবলে গোল লাইন প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে দশটিরও বেশি প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হয়েছে। ফিফাও পরীক্ষামূলকভাবে অনেকগুলোই চালিয়ে দেখেছে মাঠে। এর মধ্যে রয়েছে কাইরোস জিএলটি সিস্টেম, গোলমাইন্ডার, গোলরেফ, হক-আই প্রভৃতি। তবে এবারের বিশ্বকাপে যে গোল লাইন প্রযুক্তি ব্যবহূত হতে যাচ্ছে, তার উদ্ভাবক জার্মান কোম্পানি গোলকন্ট্রোল। তারা তাদের এই প্রযুক্তির নাম দিয়েছে ‘ফোরডি’। প্রকৃতপক্ষেই গোল হয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করতে এই প্রযুক্তিতে ব্যবহার করা হয় মোট ১৪টি ক্যামেরা। ৭টি করে ক্যামেরা থাকে প্রতিটি গোল পোস্টের দিকে তাক করা। ক্যামেরাগুলো মূলত বসানো হয়ে থাকে স্টেডিয়ামের ছাদে। সেখান থেকেই হাই-রেজ্যুলেশনের এই ক্যামেরাগুলো গোলমুখের প্রতিটি মুহূর্তকে নিখুঁতভাবে ধারণ করে থাকে। বলের প্রতিমুহূর্তের ত্রিমাত্রিক গতিবিধি নজরদারি করতে পারে এই ক্যামেরাগুলো। ফলে বল কোনোভাবে গোল লাইন অতিক্রম করামাত্রই ক্যামেরাগুলো তা নির্ধারণ করতে পারে এবং তাকে গোল হিসেবে চিহ্নিত করে ফেলে।
এ তো গেল ক্যামেরার মাধ্যমে গোল নির্ধারণের বিষয়। কিন্তু মূল গোলটির ঘোষণা তো দিতে হয় রেফারিকেই। আর তার জন্য রেফারির হাতে থাকে বিশেষ ধরনের একটি ঘড়ি। ‘ফোরডি’ সিস্টেম কোনো গোলকে নির্ধারণ করার সাথে সাথেই এটি রেফারির সেই বিশেষ ঘড়িতে সিগন্যাল পাঠিয়ে দেয়। তাতে করে রেফারির ঘড়িতে একটি ভাইব্রেশন হয় এবং গোলের একটি সিগন্যালও ভেসে ওঠে ডিসপ্লেতে। আর পুরো ঘটনাটি ঘটে যায় এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে। ফলে গোল হয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই রেফারি গোলের বাঁশি বাজিয়ে দিতে পারেন।
ভ্যানিশিং স্প্রে
বিশ্বকাপের মাঠে আরও একটি প্রযুক্তির দেখা মিলবে প্রায় প্রতি ম্যাচেই। আর সেটি হলো ভ্যানিশিং স্প্রে। ডি-বক্সের আশেপাশে ফ্রি-কিক হলেই রক্ষণভাগের খেলোয়াড়দের নড়াচড়া একটু বেড়েই যায়। ফ্রি-কিকের সময় সাধারণত তাদের নির্দিষ্ট একটি দূরত্বেই (১০ গজ) অবস্থান নিতে হয়। তবে প্রায় সময়ই খেলোয়াড়দের এই সীমানা অতিক্রম করতে দেখা যায়। আবার ঠিক যে অবস্থান থেকে ফ্রি-কিক নেওয়ার কথা, সেই অবস্থান থেকে এগিয়ে নিয়ে ফ্রি-কিক নেওয়ার প্রবণতাও দেখা যায় খেলার মাঠে। এই ঘটনাগুলো প্রতিরোধ করতেই ভ্যানিশিং স্প্রের আশ্রয় এবারে নেবেন রেফারিরা। আর্জেন্টিনার সাংবাদিক পাবলো সিলভা মূলত এই প্রযুক্তির জনক। কোনো একটি ম্যাচে খেলতে গিয়ে তিনি দেখতে পান, প্রায় প্রতিটি ফ্রি-কিকের সময়ই রক্ষণভাগের খেলোয়াড়ররা ১০ গজের সীমা অতিক্রম করছে। একে প্রতিহত করতেই তিনি একজন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারের সাথে পরামর্শ করেন এবং ভ্যানিশিং স্প্রে তৈরি করেন। পাবলো সিলভার আগ্রহ আর প্রচেষ্টাতেই ২০০৮ সালে আর্জেন্টিনার একটি লিগে যাত্রা শুরু করে ভ্যানিশিং স্প্রে। এটি মূলত শেভিং ফোমের মতো বিশেষ এক ধরনের ফোম যা স্প্রে করার ৪৫ সেকেন্ড থেকে ২ মিনিটের মধ্যেই বেমালুম উবে যায়। ফ্রি-কিক হলেই রেফারি এই স্প্রের মাধ্যমে খেলোয়াড়দের অবস্থানের সীমানা নির্ধারণ করে দেবেন। কিছু সময় পরেই চিহ্নটি মিলিয়ে যাবে। ফলে ফ্রি-কিকের সময় আর ঝামেলা লাগবে না খেলোয়াড়দের মধ্যে।
ব্রাজুকার জাদু
প্রতি বিশ্বকাপেই ফুটবলটি নিয়ে আলোচনার ধুম পড়ে। গত বিশ্বকাপের বল জাবুলানি সেদিক থেকে ফ্লপ ছিল। বলটি নিয়ে ফুটবলাররা ছিলেন চূড়ান্ত রকম অসন্তুষ্ট। জাবুলানির নিয়ন্ত্রণে খুশি ছিলেন না কেউ। এবারের বল ব্রাজুকাতে সেই ধরনের সমস্যা হবে না বলেই দাবি করছে এর নির্মাতা অ্যাডিডাস। ভিন্ন ধরনের গঠন এবং সমরূপী ছয়টি প্যানেলে তৈরি করা হয়েছে ব্রাজুকা। এতে অ্যারোডায়নামিক্সের সূত্রগুলোকে এমনভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে যাতে করে ফুটবলাররা একে সহজেই নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পারে। তবে ব্রাজুকার সবচেয়ে বড় চমক হচ্ছে এতে বিল্ট-ইন হিসেবে রয়েছে ছয়টি এইচডি ক্যামেরা যার মাধ্যমে মাঠের প্রতিটি অংশের ৩৬০ ডিগ্রি ভিউ মিলবে সঠিকভাবে।
খেলা সম্প্রচারের নতুন রূপ
সময়ের সাথে সাথে খেলা সম্প্রচারের প্রযুক্তি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এবারের বিশ্বকাপে ফিফার অফিশিয়াল সম্প্রচারের কাজটি করবে এইচবিএস। আর তাদের সহায়তা করছে সনি। সম্প্রচারকে নিখুঁত করে তুলতে ২২৪টি এইচডি ক্যামেরা সনি স্থাপন করেছে বিশ্বকাপের ভেন্যুগুলোতে, যা এর আগের যেকোনো বারের বিশ্বকাপের চেয়ে বেশি। এর বাইরে বিবিসি ঘোষণা দিয়েছে বিশ্বকাপের খেলাগুলো তারা সম্প্রচার করবে ৪কে রেজুলেশনে। প্রচলিত এইচডি টেলিভিশনের রেজুলেশনের তুলনায় ৪কে প্রায় ৪ গুণ। এই অভূতপূর্ব রেজুলেশন এই প্রথমই দেখবে বিশ্ব।
