শিক্ষার্থী ৮০, পরীক্ষার্থী ৫শ’

আপডেট : ১০ জুন ২০১৪, ২২:৫৭
রাজধানীর মিরপুরের চিড়িয়াখানা বোটানিক্যাল হাইস্কুল। স্কুলের শিক্ষকদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, স্কুলটিতে নবম শ্রেণীতে সর্বোচ্চ ৮০ জন নিয়মিত শিক্ষার্থী ছিল। সরকারের অনুমোদন নেই এমন ১৫টি স্কুলের শিক্ষার্থীদের এস্কুল থেকে রেজিস্ট্রেশন করানো হয়। এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণও এ স্কুল থেকে করানো হয়। এ কারণে চলতি বছর অনুষ্ঠিত এসএসসি পরীক্ষার্থী হয় পাঁচ’শ। এরা এ স্কুলের শিক্ষার্থী না হয়েও এ স্কুলের পরিচয়ে পরীক্ষা দিয়েছে। এভাবে পরীক্ষা দেয়ায় উভয় স্কুলই আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে। বোর্ডের অনুমোদন না পেয়েও শিক্ষার্থী ভর্তি করা হচ্ছে, এদের কাছ থেকে ভর্তি ফি, টিউশন ফি, বাড়তি ফরম পূরণের ফি নেয়া হচ্ছে। আর যে স্কুলটির মাধ্যমে পরীক্ষা দেয়া হচ্ছে, তারা শিক্ষার্থী না পড়িয়েই শিক্ষার্থী প্রতি একটি ‘বড় অংকের’ অর্থ-সুবিধা পাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে উভয় স্কুলই তথ্য গোপন করেছে। স্কুলের প্রধান শিক্ষক নূরুল আমিনকে মোবাইলে যোগাযোগ করেও পাওয়া যায়নি। এর আগে তিনি এই প্রতিবেদককে তাদের নিজস্ব শিক্ষার্থী কত তা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন । তিনি দাবি করেছেন, যা করেছেন তা বৈধভাবেই করেছেন। প্রতিষ্ঠানের সহকারী প্রধান শিক্ষক গোলাম মোস্তফা বলেন, আমি এ বিষয়ে কিছুই বলতে পারবো না, সব বিষয়ে প্রধান শিক্ষক বলতে পারবেন। আর সহকারী শিক্ষক আনসার আলী বলেন, এ বিষয়টি অন্য কেউ ভালো বলতে পারবে না। সহকারী শিক্ষক নজরুল ইসলামও জানেন না বলে এ প্রতিনিধিকে জানিয়েছেন। স্কুলের গভর্নিং বডির নামে ‘শ’ আদক্ষরের প্রাক্তন এক সদস্য জানিয়েছেন, স্কুলের নিয়মিত শিক্ষার্থী ৬০ জন। অথচ প্রায় পাঁচ’শ শিক্ষার্থী এবার ওই স্কুলটি থেকে পরীক্ষা দিয়েছে, যা অনিয়ম। আর অনিয়ম পাকাপোক্ত করার জন্য ২০১২ সালের জুন মাসের পর আর গভর্নিং বডি নির্বাচনের কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। সাবেক এই সদস্য বলেন, জেলা শহর থেকেও অনেক শিক্ষার্থী এসে এ স্কুলে ফরম পূরণ করে। এছাড়া মনিপুরসহ অনেক স্কুল থেকে অকৃতকার্য শিক্ষার্থী বেশি টাকার বিনিময়ে এ স্কুল থেকে ফরম পূরণ করে পরীক্ষা দেয়, অথচ এ স্কুলে একদিনও ক্লাস করে না। তথ্য অনুযায়ী, মিরপুর ১০ নং সেকশনের আলহাজ্ব মধু বেপারী স্কুল, মিরপুর ১২ নং সেকশনের বিএল স্কুল, লিট্ল ফ্লাওয়ার প্রিপারেটরি স্কুল, মোহাম্মদপুরের রয়েল রেসিডেন্সিয়াল স্কুল, নিউ কেমব্রিজ স্কুল, কল্যাণপুর ল্যাবরেটরি স্কুল, মিরপুর ল্যাবরেটরি স্কুলসহ আরো বেশ কয়েকটি স্কুলের শিক্ষার্থী মিরপুরের চিড়িয়াখানা বোটানিক্যাল হাইস্কুল থেকে পরীক্ষা দিয়েছে। আলহাজ্ব মধু বেপারী স্কুলের প্রধান শিক্ষক আব্দুল মালেক জানিয়েছেন, এবার তার প্রতিষ্ঠান থেকে পরীক্ষা দিয়েছে ১৫ জন। সবাই পাস করেছে। তিনি স্বীকার করেছেন মিরপুরের চিড়িয়াখানা বোটানিক্যাল হাইস্কুল থেকে তার শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিয়েছে। আর বিএল স্কুলের প্রধান শিক্ষক জানিয়েছেন তার স্কুল থেকে ১৯ জন পরীক্ষা দিয়েছে, পাস করেছে ১৮ জন। তিনি বলেন, বোর্ড এখনও তার প্রতিষ্ঠান নবম শ্রেণী পাঠদানের অনুমোদন না দেয়ায় বাধ্য হয়ে মিরপুরের চিড়িয়াখানা বোটানিক্যাল হাইস্কুল থেকে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা করেছি। চিড়িয়াখানা বোটানিক্যাল স্কুলের মতো রাজধানীতে এমন ৫০-এর অধিক স্কুল রয়েছে, যারা এভাবে অন্য স্কুলের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। বোর্ডের অনুমোদন ছাড়াই রাজধানীতে শতাধিক স্কুল পরিচালিত হচ্ছে। এসব স্কুলে নেই শিক্ষক, ক্লাসরুম। নেই বিজ্ঞান শিক্ষার্থীদের জন্য ল্যাবরেটরি। অথচ এসব স্কুলে শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছে। নবম শ্রেণীর রেজিস্ট্রেশন ও এসএসসি পরীক্ষা দেয়ার জন্য ফরম পূরণ করানো হয় অনুমোদন আছে এমন কোন স্কুল থেকে। শিক্ষা বোর্ড বলছে, অনুমোদনহীন যে স্কুল শিক্ষার্থী ভর্তি করছে, আর যে স্কুল গোপনে ওই স্কুলের শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন ও ফরম পূরণ করছে, এ ক্ষেত্রে উভয়ই অপরাধী। একাধিক শিক্ষক জানিয়েছেন, অনেক স্কুলে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত অনুমোদন রয়েছে। পর্যাপ্ত শিক্ষক, ক্লাসরুম, ল্যাবরেটরি, লাইব্রেরি না থাকলে ওই স্কুলে নবম শ্রেণী পাঠদানের অনুমোদন দেয়া হয় না। কিন্তু স্কুলগুলো অনুমোদন ছাড়াই শিক্ষার্থী ভর্তি করে। এসব স্কুলে হয় না ক্লাস, পরীক্ষা। নেই শিক্ষক, ক্লাসরুম। প্রাইভেটনির্ভর এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা স্কুল থেকে কিছুই শিখতে পারে না। অথচ পরীক্ষা দিয়ে পাসের জোয়ারে পাস করে যায়। ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, এগুলো অনিয়ম ও অবৈধ। বোর্ড অবগত। কিন্তু এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না বোর্ড। ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের পরিদর্শক (বিদ্যালয়) শাহেদুল খবির চৌধুরী বলেন, একটি স্কুলের নিজস্ব শিক্ষার্থীদেরই পরীক্ষা দেয়ার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু অননুমোদিত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অন্য একটি স্কুলের মাধ্যমে পরীক্ষা দিচ্ছে, এমন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।