ব্রাজিলে ৬৪ বছর পর আবার বিশ্বকাপ শুরু হচ্ছে আজ বৃহস্পতিবার রাতে। এ পর্যন্ত যে ক’টি বিশ্বকাপ ফুটবল অনুষ্ঠিত হয়েছে তার মধ্যে এবারের মতো আর কোনো বিশ্বকাপ আসর এতোটা ঝামেলাপূর্ণ হয়নি। এতোটা শংকার মধ্যে মাঠে গড়ায়নি বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরটি। আর কিছুক্ষণ পরই সাও পাওলোর অ্যারিনা কোরিন্থিয়ান্স স্টেডিয়ামের মাঠে উদ্বোধনী খেলায় অংশ নিতে নামবে ব্রাজিল ও ক্রোয়েশিয়া। অথচ আয়োজকদের মধ্যে একটুও প্রশান্তি নেই। ব্রাজিল ২০০৭ সালে বিশ্বকাপ ফুটবলের ২০তম এই আসরটি আয়োজনের দায়িত্ব পেয়েছিল। কিন্তু কে জানতো ঘরের মাঠে খেলা হওয়ার আনন্দের পরিবর্তে পুরো ব্যাপারটি তীর হয়ে বিঁধবে নিজেদের বুকে। সাধারণ জনগণ নানা দাবি-দাওয়া নিয়ে এখনো রাস্তায় আন্দোলনরত। যে কোনো সময় অঘটন ঘটতে পারে এমন আশংকা উড়িয়ে দিচ্ছেন না আয়োজকরা। ব্রাজিলের ফুটবল কর্মকর্তারা ফিফার কর্মকর্তাদের আশ্বস্ত করছেন বারবার। বলছেন বাঁশি বাজার আগেই সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে। ব্রাজিল কর্মকর্তারা যাই বুলন না কেন এখন ফিফার কর্মকর্তারা আটকে থাকা বাকি কাজ সেরে নিতে নিজেরাই মাঠে নেমেছেন। স্যুট-টাই পরা মানুষগুলো দ্রুত পায়ে এগিয়ে বিভিন্ন কাজ ঠিকমতো হচ্ছে কিনা দেখে নিচ্ছেন। দর্শক কোন রাস্তা দিয়ে ঢুকবেন, কিভাবে বের হবেন, টয়লেট থেকে শুরু করে কার্পেটে মোড়ানো ভিভিআইপি বক্সগুলো চেক করে নিচ্ছেন শেষবারের মতো। এই জায়গায় ঢোকা যায় না কড়া নিরাপত্তার কারণে। তারপরও ফাঁক গলে গিয়ে দেখে প্রশ্ন উঠলো এটাই কি বিশ্বকাপ?
ব্রাজিল ফুটবলের দেশ। এখানে ফুটবল ছাড়া অন্য কিছু ভাবাই যায় না। ব্রাজিলে বিশ্বকাপ ফুটবল হলে এই খেলাটা আরো অনেক বেশি উপরে উঠবে, আরো বেশি জনপ্রিয়তা পাবে এবং এর মর্যাদাও বাড়বে। তাছাড়া দেশটি ব্রাজিল বলেই দ্বিতীয়বারের মতো দায়িত্বটি পেতে সমস্যা হয়নি। কিন্তু পুরো ব্যাপারটা যেন এখন ফিফার জন্য গলার কাঁটা হয়ে বিঁধেছে। ফিফার সাধারণ সম্পাদক জেরেম ভালচকে গত ছয় বছরে কতোবার যে ব্রাজিলে এসেছেন তার কোনো হিসাব নেই। ফরাসি এই ভদ্রলোক আগেই বলেছিলেন, বাঁশি বাজার আগে হয় তো স্টেডিয়াম প্রস্তুত হবে না। নিজে সরেজমিনে দেখছেন বিশ্বকাপ নিয়ে প্রতিবাদকারীরা কতটা সোচ্চার এবং তাদের অবস্থানের কারণে শেষ পর্যন্ত এই টুর্নামেন্ট ভেস্তে যায় কিনা, তা নিয়েও শংকায় ছিলেন এবং এখানো যে নেই সেটাও বলা যাচ্ছে না। কারণটা হয়তো আড়ালেই থাকছে। তবে আয়োজনে ত্রুটি থাকলেও এখন একথা বলা যায় খেলা মাঠে গড়াতে ব্রাজিল প্রস্তুত।
দ্য গ্রেটেষ্ট শো অন আর্থ, এর উপর শুধু ফুটবল অনুরাগীদেরই চোখই থাকবে না তামাম দুনিয়ার নজর এখন ব্রাজিলে। হোক সেটা দিন-মজুর কিংবা দেশের রাষ্ট্রপতি। চার বছর পর পর বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর বসে। খেলার দুনিয়ার মানুষগুলো এই অপেক্ষায় থাকেন ফুটবল নিয়ে যুদ্ধ আবার কবে আসবে।
বাংলাদেশের ফুটবল দর্শকরা এবার খেলা দেখবেন রাত জেগে। কিছুদিন পরই রমজান মাস। রাত জাগতে কষ্ট হবে। তারপরও ধারণা করা যায় তারা খেলা দেখার সুযোগ
খোয়াবেন না। কারণ ব্রাজিলে বিশ্বকাপ ফুটবল আর দেখা যাবে না কিনা কেউ জানে না। তাই টিভির পর্দায় কালো মানিকের দেশের বিশ্বকাপ দেখাটাও অনেক বেশি রোমাঞ্চকর।
ব্রাজিলের ১২টি স্টেডিয়ামে সব পর্ব মিলিয়ে ৬৪টি ম্যাচ হবে। ১২ জুন বাংলাদেশের সময় রাত ২টায় ব্রাজিল ক্রোয়েশিয়ার খেলা দিয়ে শুরু হবে এই ফুটবল যুদ্ধের যার শেষ ১৩ জুলাই। ফাইনালের মঞ্চে ওঠার লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত ৩২ দল এখন যার যার ভেন্যুতে পৌঁছে গেছে। ব্রাজিলের রাজধানী ব্রাসিলিয়া। কিন্তু প্রতিযোগিতার উদ্বোধন হবে সাও পাওলো শহরে। এটি অনেকটা আমাদের বান্দরবানের মতো পাহাড়ের শহর। উঁচু-নিচু পথ। রাস্তা থেকে কোরিন্থিয়ান্স স্টেডিয়ামটি আড়াই হাজার ফিট উপরে। ১৯৭৪ সালে নির্মিত স্টেডিয়ামটি ২০১০ সালে নতুনভাবে সংস্কার করার কাজ শুরু হয়। এখনও কাজ চলছে। তাড়াহুড়ো করে কাজ করতে গিয়ে মঙ্গলবার ১০ জন শ্রমিক আহত হয়েছেন। অ্যাম্বুলেন্সে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় আহদের। ৬৫ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতা থাকলেও দ্রুত কাজ করতে গিয়ে স্টিল স্ট্রাকচারের গ্যালারি দাঁড় করানো হয়েছে। যেখানে ২০ হাজার দর্শক বসতে পারবেন। বৃষ্টি হলে ভিজতে হবে।
ফুটবল দুনিয়ায় অনেক কিংবদন্তী উপহার দিয়েছে ব্রাজিল। পেলে, গ্যারিঞ্চা, জিকো, রেভেলিনো, টোষ্টাও, রোমারিও, বেবেটো, রিভালোদো, রবার্তো কার্লোস, রোনালদিনহোর মতো আরো কতো ফুটবলার উপহার দিয়েছে সেলেচাও নামে সমধিক খ্যাত ব্রাজিল ফুটবল দল। এদের পায়ের জাদুতে বাংলাদেশের অনেক ফুটবল দর্শক বিশ্বকাপের সময় পতাকা মাথায় বাঁধেন। যারা এমন সব যাদুকরী ফুটবলার উপহার দিতে পারে তারা আয়োজন করেও তাক লাগাতে পারে। এই বিশ্বাস ফুটবল-প্রিয়দের। ফুটবল দুনিয়া মাত করে রাখবে ব্রাজিল বিশ্বকাপ ফুটবল। ১৯৫০ সালে যেবার বিশ্বকাপ হয়েছিল সেটি নাকি একেবারেই সাদামাটাভাবে হয়। ৬৪ বছর পর সেই একই আকাশের নিচের আয়োজনটা যথেষ্ট আকর্ষণীয় এবং মনোমুগ্ধকরই হবে বটে। আধুনিক আয়োজন, মনোমুগ্ধকর ফুটবল লড়াই দেখার জন্য শত কোটি ফুটবল দর্শক অপেক্ষায় রয়েছেন। ফুটবলের মহা তারকারাও প্রস্তুত। ব্রাজিল জুড়ে ফুটবল উত্তেজনার পারদ চড়ছে। দর্শকদের মাতিয়ে তুলতে গতবারের কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বাদ পড়া আজেন্টাইন মেসি, সের্জিও আগুয়েরা, কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বাদ পড়া আরেক দল ব্রাজিলের নেইমার, বর্তমান চ্যাম্পিয়ন স্পেনের জাভি ইনিয়েস্তা, জার্মানির ফিলিপ লাম, টমাস মুলার, মেসুত্ ওজিল, ফিলিপ লাম, নেদারল্যান্ডসের আরিয়ান রোবেন, রবিন ফন পার্সি, পুর্তগালের রোনালদোরা এখন মুখিয়ে আছেন। অনেকের জন্য এবারের বিশ্বকাপ ফুটবল দুর্ভাগ্যের। কারণ অনেক খেলোয়াড় চোট পেয়ে শেষ মুহূর্তে বাদ পড়েছেন। তারপরও বিশ্বকাপ বলে কথা। গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ। আকর্ষণে একটুও কমতি থাকবে না।
