বিশ্বকাপের কাউন্টডাউন শেষ। এবার শুরু হলো ফাইনালের কাউন্টডাউন। বাঁশি বাজবে আজ । ব্রাজিলের নাগরিকরা মনে করেন তারাই চ্যাম্পিয়ন হবেন। নিজেরা বিশ্বকাপের ফেভারিট। বিশ্বকাপের আলোচনায় নিজেদেরকে ফেভারিট ধরে নিয়ে ফাইনালে তারা আর্জেন্টিনাকে চায়। কোচ লুই ফিলিপে স্কোলারিও বলেছেন তিনি ১৩ জুলাইয়ের ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে চান। উল্টো পথে হাঁটছেন ব্রাজিলের কিংবদন্তী ফুটবলার পেলে, তিনি ফাইনালে চান উরুগুয়েকে। বিশ্বকাপ জয়ী পেলে সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন ঘরের মাঠে উরুগুয়ের কাছে ১৯৫০ বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালে তাদের স্বপ্ন ভেঙ্গে গিয়েছিল। সেই প্রতিশোধটা নিতে চান তারা। কিন্তু পেলের চিন্তার সাথে একমত না ব্রাজিলের নতুন প্রজন্ম। বর্তমান প্রজন্ম ৫০ বিশ্বকাপের বেদনাহত ঘটনার কথা নানী-দাদীর কাছে শুনেছে। ভেঙ্গে যাওয়ার বাঁশির গল্প শোনায় আগ্রহ নেই তাদের। যারা গাড়িতে পতাকা তুলেছেন, যাদের ভেতরে ফুটবলের রক্ত টগবগ করছে, উত্তেজনায় কাঁপছেন হলুদ জার্সি গায়ে গ্যালারি মাতাবেন বলে। তারা ১৯৫০ বিশ্বকাপ ফুটবলে ঘটে যাওয়া ৬৪ বছর আগের ঘটনা নিয়ে পড়ে থাকতে রাজি না। কথা একটাই ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ। ট্রফি রেখে দিতে চান ব্রাজিলের বর্তমান প্রজন্ম এবং ভবিষ্যত্ প্রজন্ম। মেসি কিংবা রোনালদো যেন ট্রফি ছুঁতে না পারে। প্রথম বিশ্বকাপে অভিষেক হওয়া নেইমাররাই যেন ফাইনালের মঞ্চে উঠে দাঁড়ান। কিন্তু তাদের স্বপ্নটা কী পূরণ হবে। কে জিতবে বিশ্বকাপ। প্রশ্ন উঠছে। জল্পনা-কল্পনা চলছে, কেন না গত দুটি আসরে যে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল ব্রাজিলীয়ানদের।
বিশ্বকাপে ১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০, ১৯৯৪ এবং ২০০২ সালে চ্যাম্পিয়ন হওয়া ব্রাজিলের ১৯ কোটি মানুুষের স্বপ্ন একবার নিজের মাঠে চ্যাম্পিয়ন হওয়া। কোন দলগুলো ব্রাজিলের সামনে বাধা হতে পারে। কাগজ-কলম নিয়ে বসে একটা হিসাব করছে লাতিন আমেরিকার বৃৃহত্তম দেশ ব্রাজিল। তারা মনে করে আর্জেন্টিনা হতে পারে একমাত্র বাধা। প্রতিবেশী দেশ এবং চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ফুটবল দেশ আর্জেন্টিনা থেকে আসা প্রায় লাখ খানেক দর্শকও মনে করছেন ব্রাজিলের সামনে তারাই বড় শত্রু। রিয়াল মাদ্রিদকে চ্যাম্পিয়নশিপ এনে দেয়া পর্তুগালের ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো যতই ফর্মে থাকেন চোট পাওয়া খেলোয়াড় বলে একটা ভয়ে থাকবেন মাঠে। তাকে আটকাতে পারলে অনেকটাই ভোঁতা হয়ে যাবে পর্তুগীজ আক্রমণ। আর বর্তমান চ্যাম্পিয়ন স্পেনের জাভি ইনিয়েস্তাকে খেলতে দেয়া যাবে না। ব্রাজিলের পথে-ঘাটে কতো হিসাব ! ব্রাজিলের টেলিভিশনগুলোতে সারাক্ষণ এই সবই প্রচার করা হচ্ছে। মেসির দুর্বলতা কোথায়, রোনালদো কোথা থেকে আচমকা শর্ট করবেন। দিনরাত এই সব নিয়ে চলছে টকশো। ব্রাজিলের কিংবদন্তী ফুটবলাররাও টেলিভিশনের টকশোতে মতামত দিয়ে চলেছেন।
ব্রাজিলের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ ফুটবলে দুইবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। যার হাত ধরে ১৯৮৬ মেক্সিকো বিশ্বকাপ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল সেই ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা গত পাঁচটি বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালে উঠতে পারেনি। সর্বশেষ ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো ও ১৯৯০ সালের ইতালী বিশ্বকাপে ফাইনাল খেলেছে দেশটি। নব্বইয়ের পর আর বিশ্বকাপের ফাইনালের টিকিট পারেনি লা আলবিসেলেস্তে (আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের ডাক নাম)।
আর্জেন্টিনা ১৯৩০ সালে প্রথম বিশ্বকাপ ফুটবলে উরুগুয়ের বিরুদ্ধে ফাইনাল খেলে রানার্সআপ হলো অথচ সেই দেশটিই বিশ্বকাপের ১৯টি আসরে চ্যাম্পিয়ন (৭৮ ও ৮৬) হয়েছে মাত্র দুইবার। ছিয়াশি বিশ্বকাপে যে ম্যারাডোনা একাই ট্রফি এনে দিয়েছিলেন কোচ হিসেবেও ম্যারাডোনার হাতে আর্জেন্টিনা ফুটবল কর্তৃপক্ষ দল তুলে দিয়েছিল। আর্জেন্টাইনদের স্বপ্ন ছিল সঠিক হাতেই পড়েছে উত্তরসূরীরা। ব্রাজিল টিভির টকশোগুলোতে রোমারিওরা ম্যারাডোনার বিরুদ্ধে বিষোদগার করে চলেছেন। বলছেন ম্যারাডোনার সময়ই নাকি আর্জেন্টিনার সবচেয়ে খারাপ সময় কেটেছে। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা।
দক্ষিণ আমেরিকার দেশটি ১৯৩৪ সালে ইতালী বিশ্বকাপে প্রথম পর্ব থেকে বিদায় নেয়। ’৫৮ সালে সুইডেন এবং ’৬২ সালে চিলি বিশ্বকাপেও বিদায় নেয় গ্রুপ পর্ব থেকে । ১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপেও চূড়ান্ত পর্বেই উঠতে পারেনি ম্যারাডোনার পূর্বসূরিরা। ’৯০ সালে ইতালী বিশ্বকাপে ফাইনাল খেলার পর গত পাঁচটি বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনা টেলিভিশন দর্শক। ২০১১ সালে কোপা আমেরিকা ফুটবল কাপে উরুগুয়ের কাছে হারের পর কোচ আলেসান্দ্রো সাবেলা দলের সবচাইতে বড় তারকা লিওনেল মেসিকে আর্জেন্টিনার অধিনায়কের দায়িত্ব দেন। সাবেলা ভেবেছিলেন মেসি সঠিক নেতৃত্ব দিয়ে আর্জেন্টাইনদের স্বপ্ন পূরণ করবেন। তিনিও ব্যর্থ হয়েছেন। মেসির জাদুকরি ফুটবল কাতালানদের যতোটা উত্সবে ভাসিয়েছে ততটা পারেননি নিজ দেশের জন্য। এই গ্রহের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফুটবলার বলা হলেও তিনি ম্যারাডোনার হাতে পড়েও দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপ ফুটবলে ছিলেন সুপার ফ্লপ। আর্জেন্টিনা কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নেয়। বলা হয় মেসি ক্লাব ফুটবলের জন্য, দেশের ফুটবলের জন্য নয়। যারা এমন কথা বলেন তাদের মুখে কুলপ এঁটে দিতেই রিও ডি জেনিরোতে ১৫ জুন বসনিয়া হার্জেগোভিনার বিরুদ্ধে নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে নামবেন তিনি। বলা হচ্ছে ব্রাজিল দেখবে নতুন মেসিকে। আর্জেন্টাইনরা বলছেন মেসি ব্রাজিল বিশ্বকাপের জন্য অনেক কিছুই লুকিয়ে রেখেছেন।
বিশ্বকাপের ১৯টি আসরে ব্রাজিল ৫ বার, ইটালি ৪ বার, জার্মানি ৩ বার, আর্জেন্টিনা ২ বার, উরুগুয়ে ২ বার, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স এবং স্পেন ১ বার করে চ্যাম্পিয়ন হয়। ব্রাজিল আর্জেন্টিনা ফাইনাল খেলবে এমন কথা চাউর হলেও ফুটবল পণ্ডিতদের ভাবনা ফুটবল দুনিয়ায় ইউরোপের দলগুলো অনেক এগিয়ে গেছে। দেশগুলো অনেক বেশি শক্তিশালী, এবার বিশ্বকাপ ফাইনালে ইউরোপের যে কোনো একটা দলকে দেখা যেতে পারে। সেটা হতে পারে জার্মানি বা স্পেন ফাইনাল খেলতে পারে। চিলি খুব চমকে দিতে পারে। বেলজিয়ামের উপর মানুষের আশা আছে। এশিয়ার চার দল দক্ষিণ কোরিয়া, অষ্ট্রেলিয়া, জাপান, ইরানের উপর নজর থাকবে এশিয়াবাসীর। চমক দিলে অবাক হওয়ারও কিছু থাকবে না। আয়োজক হওয়ার কারণে ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ ফুটবলের বাছাই খেলতে হয়নি। কিন্তু এখন স্বাগতিকদের সামনে কঠিন পরীক্ষা। একদিকে যেমন আয়োজকদের লড়াই অন্যদিকে খেলোয়াড়দের মাঠের লড়াই। ব্রাজিল কোন্ দিক থেকে এগিয়ে থাকবে সেকথা এখনই বলা যাচ্ছে না। একথা সত্য ব্রাজিলে আন্দোলনের কারণে বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজন বিবর্ণ হয়েছে। তবে ফুটবল দুনিয়া বিশ্বাস করে মাঠে এমন কিছু ঘটবে যা দেখে বর্ণিল হয়ে উঠবে বিশ্বকাপ। এমন প্রত্যাশা ফুটবল দুনিয়ার।
