প্রশ্ন ফাঁস ঠেকাতে কঠোর আইন করতে হবে

আপডেট : ১১ জুন ২০১৪, ২২:৫২
প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে কঠোর শাস্তির বিধান রেখে আইন প্রণয়নের পরামর্শ দিয়েছেন শিক্ষাবিদরা। একই সাথে শিক্ষাবিদরা প্রশ্ন ফাঁস রোধে প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে বলেন, গতানুগতিক পদ্ধতিতে প্রশ্ন নিরাপদ রাখা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে অভিজ্ঞদের পরামর্শ নেয়া যেতে পারে। সভায় বিদ্যমান পরীক্ষার পদ্ধতির সংস্কার, গ্রেডিং পদ্ধতি পুনর্বিবেচনা, পঞ্চম শ্রেণির প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী ও জেএসসি পরীক্ষা বাতিল এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার পরামর্শ দেন তারা। সভায় শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষাবিদদের পরামর্শ অনুযায়ী শিক্ষার মানোন্নয়ন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসে সমালোচিত হচ্ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী। প্রশ্ন ফাঁসের প্রতিবাদে শিক্ষাবিদ অধ্যাপক জাফর ইকবালের শহীদ মিনারের অবস্থান তাকে আরো বিব্রত করে। এমনি প্রেক্ষাপটে শিক্ষাবিদদের সাথে বৈঠক করেন শিক্ষামন্ত্রী। বৈঠকে প্রশ্ন ফাঁসের পাশাপাশি শিক্ষার সার্বিক বিষয়ে মতামত দেন শিক্ষাবিদরা। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভা কক্ষে গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে ১০ টা থেকে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত শিক্ষামন্ত্রীর সাথে শিক্ষাবিদদের এ সভা চলে। সভায় কোন সাংবাদিককে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। সভা শেষে বেরিয়ে শিক্ষাবিদরা সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেছেন। এছাড়া সভা শেষে শিক্ষামন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে তার বক্তব্য তুলে ধরেন। সভা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান সাংবাদিকদের জানান, সভায় শিক্ষাবিদদের পক্ষ থেকে শিক্ষার মান বাড়ানো, পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, মাদ্রাসা শিক্ষা, পরীক্ষা পদ্ধতিসহ বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে আইটির (ইনফরমেশন টেকনোলজি) ব্যবহার ও অপরাধের সাজাও বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। সভায় অধ্যাপক মুহাম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, অতীতেও প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী, জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে, কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয় তা স্বীকার করেনি। আমি আমার ক্ষোভ ও কষ্টের কথা বলেছি। মন্ত্রী বলেছেন, আগামীতে যাতে আর কোন পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস না হয় সেই ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি আরো বলেন, ‘প্রশ্ন ফাঁস রোধে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে, দক্ষ মনিটরিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তারও প্রস্তাব করেছি আমি। ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন পাঠ্যবই থেকে এসব বিষয় রিভিউ করার প্রস্তাব করে বলেন, এখন পাকিস্তান আমলের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রেক্ষাপট সৃষ্টির কোন মানে নেই। তিনি শিশুদের ওপর থেকে পরীক্ষার চাপ কমাতে অষ্টম শ্রেণির জেএসসি পরীক্ষা বাতিলের প্রস্তাব করেন। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গ্রেডিং পদ্ধতি সেমিস্টারের ক্ষতি করছে। পরীক্ষা একটি বিভীষিকা উল্লেখ চিত্রশিল্পী হাশেম খান বলেছেন, এই পরীক্ষা শব্দটি বাদ দিতে হবে। ঘন ঘন পরীক্ষা নেয়ায় শিশুদের মধ্যে পরীক্ষা ভীতি সৃষ্টি হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘পঞ্চম শ্রেণির আগে কোন পরীক্ষা রাখার দরকার নেই। কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, পাবলিক পরীক্ষায় পাসের হার বাড়ছে, কিন্তু মান পড়ে যাচ্ছে। আমরা শিক্ষার্থীদের পার্কে, বাজারে দেখতে চাই না। বিশিষ্ট চিকিত্সক অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত বলেন, দেশে আর কোনো বেসরকারি মেডিক্যাল ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়ার দরকার নেই। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. শামসুজ্জামান খান সভায় বলেন, দু’তিনটি সাবজেক্ট খুলেই দেশের বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সার্টিফিকেট বিক্রি করছে, তারা ৫/৭ বছরের অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স এক বছরেই শেষ করে দিচ্ছে। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, শিক্ষার্থীদের দিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা নয়, শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের সাথে আলোচনা করে পরীক্ষা পদ্ধতির সংস্কার করতে হবে। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সভাপতি অধ্যাপক আব্দু্লাহ্ আবু সাঈদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো ফেল করা। সবাই যদি পাস করে তাহলে পরীক্ষার দরকার কী ? অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতেও বহু মেধাবী শিক্ষার্থী ফেল করে। সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, গত সাড়ে পাঁচ বছরে বিভিন্ন সময়ে দেশের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে খ্যাতিমান শিক্ষক, শিক্ষাবিদদের মতামত ও পরামর্শ গ্রহণ করা হয়েছে। এটা শিক্ষাক্ষেত্রে খুবই সহায়ক। নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর আবারও আমরা তাদের সঙ্গে বসলাম। এবার প্রাপ্ত মতামতও শিক্ষার আগামী কর্মপরিকল্পনা সমৃদ্ধ করবে, ভুল-ত্রুটি সংশোধন ও শিক্ষার গুণগতমান বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। তিনি বলেন, শিক্ষাবিদরা আমাদের কর্মকাণ্ডের প্রশংসাও করেছেন, আবার কোন কোন ক্ষেত্রে সমালোচনাও করেছেন। তিনি বলেন, ‘প্রশ্ন ফাঁস রোধে আমাদের ১৯৮০ সালের একটি আইন রয়েছে। আমরা এখন আইনটি যুগোপযোগী করতে পারি কিংবা চূড়ান্ত হওয়ার অপেক্ষায় থাকা শিক্ষা আইনে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। আলোচনা করে এ বিষয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নেব। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আমরা গুরুত্বসহকারে শিক্ষাবিদদের সব কথা শুনেছি। প্রত্যেকটি প্রস্তাবই গুরুত্বসহকারে নেয়া হয়েছে। আরো আলোচনা করে বাস্তবায়নের পথে এগুতে হবে। সভায় বিশিষ্ট নাগরিকদের মধ্যে আরো উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক রেহমান সোবহান, অধ্যাপক সালাউদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, অধ্যাপক সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, অধ্যাপক মেজবাহ উদ্দিন, অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফীন সিদ্দিক, ড. কাজী খলীকুজ্জামান আহমদ, ড. আইনুন নিশাত, অধ্যাপক আব্দুল মান্নান, অধ্যাপক মো. আব্দুল খালেক, অধ্যাপক মুস্তাফা নূর উল ইসলাম, অধ্যাপক মোহাম্মদ কায়কোবাদ, অধ্যাপক ড. একে আজাদ চৌধুরী, অধ্যাপক ড. এএমএম সফিউল্লাহ, আবুল মোমেন, এমএম আকাশ, অধ্যাপক ড. আক্তারুজ্জামান, অধ্যাপক ড. খোন্দকার সিদ্দিক-ই-রব্বানী, ড. অনুপম সেন, ড. ফারজানা ইসলাম, অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশীদ, অধ্যাপক আব্দুস সাত্তার মণ্ডল, অধ্যাপক মেহতাব খানম, অধ্যাপক ছিদ্দিকুর রহমান, অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম, ড. এনামুল হক, অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী, শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, শিল্পী মোস্তফা মনোয়ার, অধ্যাপক ড. রফিকুল হক, অধ্যাপক সালমা আখতার, অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমদ, শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী প্রমুখ।